পশ্চিম এশিয়ায় চলমান অস্থিরতার আঁচ কি এ বার লোহিত সাগরেও পড়বে? আশঙ্কা, লোহিত সাগরের নীচে বসানো ফাইবার অপটিক কেব্ল কেটে ফেলতে পারে ইরান বা ইরান-সমর্থিত কোনও সশস্ত্র গোষ্ঠী। যদিও ইরানের তরফে আনুষ্ঠানিক ভাবে বা সরাসরি লোহিত সাগরে হামলা চালানো বা ফাইবার অপটিক কেব্ল কাটার কোনও হুমকি দেওয়া হয়নি। সাম্প্রতিক পরিস্থিতি বিবেচনা করে বেশ কয়েকটি সংবাদমাধ্যমে এই বিষয়ে আশঙ্কাপ্রকাশ করা হয়েছে। উদ্বেগপ্রকাশ করা হয়েছে সমাজমাধ্যমের বিভিন্ন পোস্টেও। সত্যিই যদি এই কেব্ল কাটা হয়, তবে বিশ্বের একটা বড় অংশে ইন্টারনেট সংযোগ বিঘ্ন হতে পারে। প্রভাব পড়তে পারে ভারতেও।
বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে দাবি, ইরানের সঙ্গে আমেরিকা, ইজ়রায়েলের সংঘাত চরমে ওঠার পরই লোহিত সাগরের নীচে পাতা কেব্ল কাটা হতে পারে, সেই সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। এই সংঘাতে ইরান-সমর্থিত সশস্ত্র গোষ্ঠী হুথি যোগ দেওয়ায় সেই সম্ভাবনা আরও জোরালো হচ্ছে। গত বছর সেপ্টেম্বরে খবর ছড়িয়েছিল, লোহিত সাগরের নীচে বসানো বেশ কয়েকটি ফাইবার অপটিক কেব্ল ছিঁড়ে গিয়েছিল। যদিও এ সংক্রান্ত খবরের কোনও সত্যতা প্রকাশ্যে আসেনি। অনেক জায়গায় দাবি করা হয়েছিল, ওই কেব্লগুলিতে কাটা দাগ দেখা গিয়েছে। কী ভাবে কেব্লগুলিতে এ ধরনের কাটা দাগ এল, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছিল। হুথিরা অপটিক ফাইবার কেটে দিয়ে গাজ়ায় হামাসবিরোধী যুদ্ধ বন্ধ করতে ইজ়রায়েলের উপর চাপ সৃষ্টি করতে চাইছে বলে মনে করেছিলেন অনেকে। আবার কেউ কেউ এ-ও দাবি করেন, একটি বাণিজ্যিক জাহাজ নোঙর খুলে গিয়ে ওই কেব্লগুলির উপর পড়ে। আর তাতেই কিছু অংশ কেটে যায়।
২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে এশিয়া ও আফ্রিকার বেশ কিছু অংশে ইন্টারনেট পরিষেবা বিঘ্ন হয়েছিল। প্রভাব পড়েছিল ভারত ও পাকিস্তানে। যদিও হুথি কেব্ল ছেঁড়ার অভিযোগ অস্বীকার করেছিল। তবে ইরান যুদ্ধে হুথি যোগ দেওয়ার পরে আবার লোহিত সাগরে নীচে পাতা তার কেটে ফেলার আশঙ্কা করছেন অনেকে।
আরও পড়ুন:
গত বছর সেপ্টেম্বরে লোহিত সাগরের নীচে থাকা চারটি প্রধান কেব্লকে প্রভাবিত করেছিল, এমনই জানিয়েছিল আন্তর্জাতিক কেব্ল সুরক্ষা কমিটি। কোন চারটি কেব্ল প্রভাবিত হয়েছিল, তা-ও জানানো হয়েছিল। কমিটির দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া-পশ্চিম এশিয়া-পশ্চিম ইউরোপ ৪, ভারত-পশ্চিম এশিয়া-পশ্চিম ইউরোপ, ফ্যালকন জিসিএক্স এবং ইউরোপ ভারত গেটওয়ে কেব্লগুলি প্রভাবিত হয়। ওই কমিটি আরও জানিয়েছিল, বছরে যা কেব্ল দুর্ঘটনা ঘটে, তার ৩০ শতাংশই জাহাজের নোঙর ছিঁড়ে যাওয়ার কারণে।
লোহিত সাগরের নীচে থাকা এই কেব্লগুলি বিশ্বের বিভিন্ন পরিষেবার সঙ্গে যুক্ত। আর্থিক লেনদেন, ক্লাউড, ভিডিয়ো কল, ইমেল, এমনকি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) নেটওয়ার্ক সংক্রান্ত পরিষেবা। সেপ্টেম্বর, ২০২৫ সালের ঘটনায় প্রভাব পড়েছিল ভারতে। যদিও সে সময় ইন্টারনেট পরিষেবা পুরোপুরি বন্ধ হয়নি। তবে দেশ জুড়ে নেটওয়ার্কগুলি বিভ্রাট হয়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, যদি কোনও কারণে লোহিত সাগরের কেব্লগুলির ক্ষতি হয় তবে ভারতে ইন্টারনেট পরিষেবায় বড় প্রভাব পড়তে পারে। বর্তমানে ভারতে ক্লাউড পরিষেবা, অনলাইন পেমেন্ট, এআই-এর উপর নির্ভরতা বাড়ছে। আর তা লোহিত সাগরের নীচে থাকা কেব্লগুলির উপর নির্ভরশীল। তাই ওই কেব্লগুলি ক্ষতি হলে প্রভাব ওই সব পরিষেবা পড়বে। আশঙ্কা, ভারতে বড় ধরনের আর্থিক সমস্যাও দেখা দিতে পারে।
লোহিত সাগরের নীচে থাকা ওই ফাইবার অপটিক তারগুলি বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ইন্টারনেট করিডোর। ওই অঞ্চল দিয়ে কয়েক ডজন কেব্ল এশিয়া এবং ইউরোপের মধ্যে বিস্তৃত। ওই কেব্লগুলিতে কোনও সমস্যা দেখা দিলে তার সরাসরি প্রভাব পড়ে বহু মানুষের দৈনন্দিন জীবনেও। তাই একটি তারে কোনও গোলযোগ দেখা দিলে পরিস্থিতি সামাল দিতে ভিন্ন অ্যাক্সেস পয়েন্ট ব্যবহার করা হয়, যাতে গোটা ব্যবস্থা ধসে না পড়ে। এতে সম্পূর্ণ সংযোগ বিঘ্নিত না হলেও তুলনামূলক ভাবে ধীরগতির নেটওয়ার্ক সংযোগ পান ব্যবহারকারীরা। তবে যদি বড়সড় কোনও ক্ষতি হয়, তবে তার প্রভাব সদূরপ্রসারী হবে বলে মত অনেকের।