Advertisement
E-Paper

বৃন্দাবনী বস্ত্রের প্রদর্শনী ইংল্যান্ডের জাদুঘরে

ব্রিটেনে এক টুকরো অসম! গত কাল থেকে ব্রিটিশ মিউজিয়ামে শুরু হয়েছে অসমের সংস্কৃতি নিয়ে প্রদর্শনী। চলবে ১৫ অগস্ট পর্যন্ত। মূল আকর্ষণ ন’মিটার দৈর্ঘ্যের বৃন্দাবনী বস্ত্র। ওই বস্ত্রের সঙ্গে জড়িয়ে আছে উত্তরবঙ্গের ইতিহাসও।

রাজীবাক্ষ রক্ষিত

শেষ আপডেট: ২৩ জানুয়ারি ২০১৬ ০৩:২৪
ব্রিটেনের প্রদর্শনীতে রয়েছে এই বৃন্দাবনী বস্ত্র। ছবি: রিনি কাকতি।

ব্রিটেনের প্রদর্শনীতে রয়েছে এই বৃন্দাবনী বস্ত্র। ছবি: রিনি কাকতি।

ব্রিটেনে এক টুকরো অসম! গত কাল থেকে ব্রিটিশ মিউজিয়ামে শুরু হয়েছে অসমের সংস্কৃতি নিয়ে প্রদর্শনী। চলবে ১৫ অগস্ট পর্যন্ত। মূল আকর্ষণ ন’মিটার দৈর্ঘ্যের বৃন্দাবনী বস্ত্র। ওই বস্ত্রের সঙ্গে জড়িয়ে আছে উত্তরবঙ্গের ইতিহাসও।

ইতিহাস বলে, অসমের বৈষ্ণবগুরু শ্রীমন্ত শঙ্করদেব মৃত্যুর আগে বেশ কয়েক বছর কোচবিহারে কোচরাজ নরনারায়ণ ও তাঁর ভাই চিলারায়ের সঙ্গে ছিলেন। শঙ্করদেবকে অত্যন্ত শ্রদ্ধা করতেন তাঁরা। অসমে এখনও ওই দু’জন খুবই জনপ্রিয়। ১৫৬৭ সালে রাজা নরনারায়ণ শঙ্করদেবের কাছে আবদার করেন শ্রীকৃষ্ণের বৃন্দাবনলীলা দেখতে চেয়ে। শঙ্করদেব ও তাঁর প্রিয়তম শিষ্য মাধবদেব তখন ছ’মাসের পরিশ্রমে বরপেটার কারিগরদের দিয়ে বৃন্দাবন, কৃষ্ণলীলা, গোপ-গোপিনী, গো-পালন, গোকুল, মথুরা, দ্বারকা আর দশাবতারের ছবি ফুটিয়ে তোলেন সুবৃহৎ বস্ত্রখণ্ডে। মৃত্যুর দিন কয়েক আগে ওই বস্ত্র রাজাকে দেখান শঙ্করদেব। দেখে রাজা মুগ্ধ। বৃন্দাবন-চিত্রিত ওই বস্ত্রই ‘বৃন্দাবনী বস্ত্র’ নামে ইতিহাসে খ্যাত।

১৫৬৮ সালে কোচবিহারের মধুপুর (তৎকালীন ভেলাডেঙা) সত্রে ১১৯ বছর বয়সে শঙ্করদেবের মৃত্যু হয়। ১৫৮১ সালে চিলারায় ও তার তিন বছর পরে নরনারায়ণ মারা যান। কোচ রাজত্বও ভেঙে যায়। দু’বার বন্যায় বিধ্বস্ত হয় সত্র। অত বড় বস্ত্র সংরক্ষণের ক্ষমতাও সত্রের ছিল না। তাই হারিয়ে যায় বৃন্দাবনী বস্ত্রও।

ব্রিটিশ মিউজিয়ামের দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার কিউরেটর রিচার্ড ব্লারটন জানান, বৃন্দাবনী ধারার বস্ত্রখণ্ডগুলি কোচবিহার থেকে ভুটান হয়ে লামাদের সঙ্গে তিব্বত পৌঁছয়। দক্ষিণ তিব্বতের গোবসি মঠে সেগুলি সেলাই করে দেওয়ালে ঝোলানো হয়। পরে লর্ড কার্জনের নির্দেশে ১৯০৪ সালে কর্নেল ইয়ংহাজব্যান্ড তিব্বত অভিযানে গেলে তাঁর সঙ্গী হন রুডইয়ার্ড কিপলিংয়ের বন্ধু সাংবাদিক পার্সিভাল ল্যান্ডন। তিনিই বস্ত্রখণ্ডগুলি ইংল্যান্ড নিয়ে যান। ১৯০৫-এ সেগুলি ব্রিটিশ মিউজিয়াম ও ভিক্টোরিয়া অ্যান্ড অ্যালবার্ট মিউজিয়ামের হাতে আসে। তিব্বত থেকে আনায় সেগুলি ‘তিব্বতি লাম্পা’ নামে জাদুঘরে রাখা হয়। ১৯৯২ সালে ব্রিটিশ গবেষকরা নজর করেন, বস্ত্রখণ্ডগুলি ভিন্নধর্মী বয়নশিল্পের ধারা বহন করছে। তাঁরাই জানান, ওগুলি শঙ্করদেবের হাতে গড়া কোচবিহারের বৃন্দাবনী বস্ত্র। এর বেশ কিছু বছর আগে ভূপর্যটক জাঁ রিবো ও তাঁর স্ত্রী কৃষ্ণা রায়ও পনেরো থেকে বিশ শতকের বিভিন্ন প্রাচ্য বস্ত্রখণ্ড সংগ্রহ করেছিলেন। সেগুলি ১৯৯০ সালে তাঁরা প্যারিসের ‘মিউজি গুইমে’-তে দান করেন। তার মধ্যেও ছিল অসম থেকে আনা বস্ত্রখণ্ড।

ভিক্টোরিয়া অ্যান্ড অ্যালবার্ট মিউজিয়ামের ভারতীয় বিভাগের কিউরেটর রোজমেরি ক্রিল গবেষণা করে দেখেন কৃষ্ণাদেবীর আনা বস্ত্র, ও ব্রিটিশ মিউজিয়ামে রাখা বস্ত্রের নকশা ও বয়নশৈলীতে মিল রয়েছে। তা থেকে আন্দাজ করা যায়, সম্ভবত শঙ্করদেবের মৃত্যুর পরেও অনেক দিন ওই শৈলীতে বস্ত্রবয়ন চলেছে অসমে। বস্ত্রগুলির মধ্যে সব চেয়ে পুরনো ‘মিউজি গুইমে’র বস্ত্রখণ্ডটি। ব্রিটিশ মিউজিয়ামের বস্ত্রখণ্ডটি ১৬৮০ সালে তৈরি। তবে প্রচলিত মতে, ব্রিটিশ মিউজিয়ামের ১২টি ধাপের রেশমে বোনা, ভাগবত পুরাণের দৃশ্যপট ফুটিয়ে তোলা বস্ত্রখণ্ডটিই ‘বৃন্দাবনী বস্ত্র’ নামে বেশি পরিচিত। এমন অন্তত ১৫টি বস্ত্রখণ্ড ইংল্যান্ড, আমেরিকা, ইতালি, ফ্রান্স ও ভারতের আমদাবাদের ক্যালিকো মিউজিয়ামে রাখা আছে। ব্লারটন জানান, কেবল বৃন্দাবনী বস্ত্রই নয়, ইংল্যান্ড ও পশ্চিমী সভ্যতার কাছে অসমের ঐতিহ্য তুলে ধরার জন্য মাজুলির রাসে ব্যবহৃত বিভিন্ন মুখোশ, পোশাক, সত্রের দ্রব্যাদি, পুঁথি, বৃন্দাবনী বস্ত্র ও রাসলীলার উপরে তৈরি দু’টি তথ্যচিত্রও প্রদর্শনীতে থাকছে। ব্রিটিশ লাইব্রেরি থেকে প্রদর্শনীর জন্য ধার নেওয়া হচ্ছে ব্রহ্মবৈবর্ত্য পুরাণের পাণ্ডুলিপি। চিপস্টো সংগ্রহশালা থেকে চিনা রেশমের উপরে অসমীয় ধাঁচে বৃন্দাবনী কাজ করা একটি পোশাকও আনা হচ্ছে। থাকছে নৃসিংহের প্রতিমূর্তি। লন্ডনের পরে এই প্রদর্শনী চিপস্টোয় চলবে।

Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy