তিল থেকে তাল। তার জেরে চর্চা গেল আরও বেড়ে। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী প্রশ্ন শুনতে চাননি বলে নরওয়ের সাংবাদিকের একটি পোস্টের মোকাবিলা করতে যে ভাবে ঝাঁপাল বিদেশ মন্ত্রক, তা কিছুটা নজিরবিহীন বলেই মনে করছে কূটনৈতিক মহল। সাড়ে চার দশক পর ভারতীয় প্রধানমন্ত্রীর নরওয়ে সফর স্মরণীয় হয়ে থাকল ভিন্ন কারণে।
নরওয়ের সাংবাদিক হেলে লিং গত কাল সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতার ক্ষেত্রে ভারতের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিলেন। সমাজমাধ্যমে বিষয়টি ছড়িয়ে পড়ায় আজ নরওয়েতে অবস্থিত ভারতীয় দূতাবাস হেলে-কে ট্যাগ করে একটি সাংবাদিক সম্মেলনে আমন্ত্রণ জানায়। বিদেশ মন্ত্রকের সচিব সিবি জর্জ সেখানে ভারতের সাংবিধানিক মূল্যবোধ, বহুত্ববাদ, মানবাধিকারের রেকর্ড এবং গণতন্ত্র সংক্রান্ত দীর্ঘ ভাষ্য তুলে ধরেন। গোটা বিষয়টি ভাইরাল হয়ে ছড়িয়ে পড়েছে এবং ভারত-নর্ডিক সম্মেলনের খবরকে কার্যত ছাপিয়ে গিয়েছে।
অর্থনীতিবিদ তথা ভারত সরকারের প্রাক্তন মুখ্য অর্থনৈতিক উপদেষ্টা কৌশিক বসু এক্স হ্যান্ডলে লিখেছেন, “ভারতের আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তি এবং অর্থনীতি ধাক্কা খাচ্ছে সরকার সমালোচনা সহ্য করতে না পারার কারণে। যদি সমালোচনা হজম করার মতো আত্মবিশ্বাস না থাকে, কোনও সংশোধনী পদক্ষেপ না করে দুর্বলতা ঢাকতে যদি কেবল স্লোগান দেওয়া হয়, তা হলে অর্থনীতিতে বিরাট নেতিবাচক প্রভাব পড়ে।” অন্য দিকে বিজেপি-র আইটি শাখার প্রধান অমিত মালবীয় বলেছেন, “যৌথ সাংবাদিক সম্মেলনে নরওয়ের প্রধানমন্ত্রীও কোনও প্রশ্ন নেননি। কিন্তু রাহুল গান্ধীর নেতৃত্বে কংগ্রেসের পাগলাটে বাস্তুতন্ত্র ‘কা কা’ করে ডেকে যাচ্ছে তুচ্ছ সাংবাদিকের অসংলগ্ন বাচালতা নিয়ে।” আজ নরওয়ের প্রধানমন্ত্রী ইউনাস গার স্টোর অবশ্য বলেছেন, ‘‘আমার সহকর্মীরা সমস্ত সংবাদমাধ্যমের সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেছেন। তবে ভারতে হয়তো ভিন্ন ঐতিহ্য রয়েছে। আমাদের তাকে সম্মান জানানো উচিত।’’
কূটনৈতিক মহলের বক্তব্য, আজ সাংবাদিক সম্মেলন চলাকালীন বিদেশ মন্ত্রকের কূটনৈতিক সচিবের দেহভাষা এবং অভিব্যক্তিও নজর কেড়েছে। এক সময় সাংবাদিক লিং সম্মেলনকক্ষ থেকে বেরিয়ে যান, কিন্তু কিছুক্ষণ পর ফিরেও আসেন! গোটা বিষয়টির নাটকীয়তা চোখে পড়েছে সবার।
ওই সম্মেলনে সিবি বলেছেন, “আমাদের সংবিধান মানুষের মৌলিক অধিকারকে রক্ষা করে। আপনারা জানেন, আমাদের দেশে মহিলাদের সমানাধিকার রয়েছে। ১৯৪৭ সালে ভারতে নারীদের ভোটদানের অধিকার দেওয়া হয়েছিল। অনেক দেশ রয়েছে, যারা অনেক পর নারীদের ভোটাধিকার দিয়েছে। মানবাধিকারের সেরা উদাহরণ কী? সরকারকে বদলে দেওয়ার অধিকার। সেটাই ভারতে ঘটছে এবং আমরা সে কারণে গর্বিত।” এই দীর্ঘ বয়ানকালে সাংবাদিকদের গুঞ্জনে দৃশ্যতই অসহিষ্ণু হয়ে উঠতে দেখা যায় জর্জকে। তিনি বলেন, “এটা আমার সাংবাদিক সম্মেলন। দয়া করে বাধা দেবেন না। আপনারা প্রশ্ন করেছেন, কেন ভারতকে কোনও দেশ বিশ্বাস করবে। সেটারই উত্তর দিচ্ছি।”
গোটা বিষয়টি নিয়ে গত কাল থেকেই আসর গরম করেছে কংগ্রেস। আজ দলের পক্ষ থেকে তুলে ধরা হয়েছে যে, গত ১২ বছরে রাহুল ১২৯টি সাংবাদিক সম্মেলন করেছেন। পাশাপাশি কংগ্রেস আজ ইন্দিরা গান্ধীর ১৯৮৩ সালের অসলো সফরের ছবিও পোস্ট করেছে। সেখানে দেখা যাচ্ছে তিনি তৎকালীন নরওয়ের প্রধানমন্ত্রী কারে ইউলোচের সঙ্গে সাংবাদিক সম্মেলন করছেন। কংগ্রেসের বক্তব্য, ‘‘একজন রাষ্ট্রপ্রধানের সঙ্গে সেলসম্যানের এটাই তফাৎ!’’
আমেরিকান কংগ্রেসের ভারতীয় বংশোদ্ভূত সদস্য রো খন্নারও মন্তব্য, “আমি মোদীকে বলেছি যে আপনার কাছে পঞ্চম বৃহত্তম অর্থনীতির গৌরব থাকতে পারে। কিন্তু গোটা বিশ্ব গান্ধীকে (মহাত্মা) বেশি সম্মান করে। বিশ্বে আপনার নামে রাস্তা নেই, কিন্তু নেহরুর নামে রয়েছে। মোদীকে এটা বলায় উনি চমকে উঠেছেন।”
এই খবরটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
5,148
1,999
429
169
(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)