E-Paper

বিজেপিতেই ক্ষোভ বাড়াচ্ছে হিমন্তের দল-ভাঙানো নীতি

দিনের পর দিন বিজেপির নিন্দা ও কংগ্রেসের আদর্শের বুলি আওড়ানোর পরে, রাতারাতি কংগ্রেস ছেড়ে গেরুয়া টুপি শিরোধার্য করা প্রদ্যুৎ বরদলৈ বললেন, ‘কংগ্রেসে বড় অসম্মান’।

রাজীবাক্ষ রক্ষিত

শেষ আপডেট: ১৯ মার্চ ২০২৬ ০৯:৫৯
হিমন্তবিশ্ব শর্মা।

হিমন্তবিশ্ব শর্মা। — ফাইল চিত্র।

বিস্তর শোরগোল ফেলে বিজেপিতে যোগ দিয়েছিলেন অসমের প্রাক্তন প্রদেশ কংগ্রেস সভাপতি ভূপেন বরা। কিন্তু কংগ্রেসি ভূপেন যখন বিজেপির ভূপেন হয়ে বিহপুরিয়ায় নিজের এলাকায় ফিরলেন, কোনও ব্যান্ডপার্টি, সংবর্ধনা বা উৎসব নয়, তাঁকে অভ্যর্থনা জানাতে হাজির ছিলেন মাত্র দু’জন। তাঁদের মধ্যে এক জন তাঁর ছেলে।

দিনের পর দিন বিজেপির নিন্দা ও কংগ্রেসের আদর্শের বুলি আওড়ানোর পরে, রাতারাতি কংগ্রেস ছেড়ে গেরুয়া টুপি শিরোধার্য করা প্রদ্যুৎ বরদলৈ বললেন, ‘কংগ্রেসে বড় অসম্মান’। সম্মানের সঙ্গে কাজ করতে বিজেপিতে এসেছেন। কিন্তু এ ভাবে প্রদ্যোৎকে বিজেপিতে টানায় গেরুয়া শিবির জুড়ে মোটেই খুশির হাওয়া বইছে না।

কংগ্রেস ও ইউডিএফ ভাঙিয়ে সংখ্যালঘু বিধায়কদেরও বার করে আনছেন মুখ্যমন্ত্রী হিমন্তবিশ্ব শর্মা। আর তাঁদের ঠিকানা হচ্ছে, বিজেপির শরিক দল অগপ। অর্থাৎ, এত দিন মুখে যে সংখ্যালঘু বিধায়কদের ‘বাংলাদেশি মুসলিম’ বলে হিমন্ত দাগিয়ে এসেছেন, তাঁদেরও তিনি টেনে নিচ্ছেন এনডিএ-র ছাতার তলায়। আর অনুপ্রবেশকারীদের বিরুদ্ধে অসম আন্দোলনের ফসল হিসেবে তৈরি যে দল, সেখানেই ভিড় বাড়াচ্ছেন তাঁরা। ফলে অগপ-র মূল আদর্শ ক্রমেই অস্তিত্বহীন হচ্ছে বলে রোষ বাড়ছে সে দলেও।

সব মিলিয়ে পুরনো বিজেপি ও পুরনো অগপ, দুই পক্ষকেই হিমন্ত কোণঠাসা করে চলেছেন নিজের দলবদলু রণনীতির ধাক্কায়। বিজেপিতে দলের পুরনো কর্মী বনাম নব্য বিজেপি তথা প্রাক্তন কংগ্রেসিদের মধ্যে অন্তঃসলিলা কাজিয়া দীর্ঘদিনের। নেহাতই সাংগঠনিক কাঠামো মজবুত হওয়ায় তা কংগ্রেসের ঘরোয়া কোন্দলের মতো প্রকাশ্যে আসে না।

বিধানসভা নির্বাচন ঘনিয়ে আসতেই অসমের রাজনীতিতে ফের দলবদলের হিড়িক। বিধানসভা কেন্দ্রের সীমানা পুনর্বিন্যাসের ফলে বহু আসনে জনসংখ্যার গঠন বদলে গিয়েছে। তাই অনেকেই পুরনো আসনে ও পুরনো দলে টিকিট পাবেন না। ফলে বেশ কয়েক জন বিধায়ক ইতিমধ্যে দলবদল করেছেন। আরও কয়েক জন আছেন লাইনে। কংগ্রেসের মেরুদণ্ড ভেঙে দিতে দলে দলে কংগ্রেসিকে বিজেপিতে টানা হচ্ছে।

এই দলবদলের খেলায় কংগ্রেস যেমন নাজেহাল, তেমনই বেজায় অসন্তুষ্ট বিজেপির পুরনো কর্মীরাও। একে হিমন্ত সদলবল বিজেপিতে আসার পরে পুরনো বিজেপি নেতারা গুরুত্বহীন, কোণঠাসা জীবন কাটাচ্ছেন। হিমন্তের একান্ত ঘনিষ্ঠ বৃত্ত বাদে, নানা চাপে বা প্রলোভনে বিজেপিতে যোগ দেওয়া কংগ্রেস নেতা-বিধায়কদের অবস্থাও হয়েছে দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিকদের মতো।

অগপ থেকে আসা সর্বানন্দ সোনোয়াল মুখ্যমন্ত্রী হয়েছেন বটে, কিন্তু অনুগত মন্ত্রী ও বিধায়কদের এত বড় বাহিনী গড়ে তোলেননি। কিন্তু হিমন্ত কংগ্রেস ভাঙিয়ে তাঁর ‘দাদা ব্রিগেড’ নিয়েই বিজেপিতে যোগ দিয়েছিলেন। জেদ করে হিমন্তকে বিজেপিতে আনা প্রাক্তন রাজ্য সভাপতি সিদ্ধার্থ ভট্টাচার্যই এখন নব্য বিজেপির জমানায় ব্রাত্য। প্রাক্তন সাংসদ তথা কেন্দ্রীয় মন্ত্রী রাজেন গোঁহাই তো রাগে দলই ছেড়েছেন। বিধায়ক মৃণাল শইকিয়া প্রকাশ্যে হিমন্ত-ঘনিষ্ঠ মন্ত্রীদের সমালোচনা করেছেন। পুরনো কর্মী দিলীপ শইকিয়া রাজ্য সভাপতি হয়েছেন বটে, কিন্তু তাঁকে মুখ্যমন্ত্রী পদে দেখতে চাওয়া শিবিরও বুঝে নিয়েছে, হিমন্তর সঙ্গে টক্কর দিয়ে লাভ নেই।

সর্বানন্দকে ফের মুখ্যমন্ত্রী করার জন্য রাজ্য ও কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের একাংশ যে এখনও সক্রিয়, তা হিমন্ত বিলক্ষণ জানেন। তাই তিনি পুরনো বিজেপি নেতাদের কয়েক জনকে সাংসদ করে দিল্লি পাঠিয়েছেন, বাকিদের নখদন্তহীন করে রেখেছেন। প্রতিষ্ঠান-বিরোধিতা ও দুর্নীতির অভিযোগের সঙ্গে লড়ার পাশাপাশি, দলের ভিতরে বিক্ষুব্ধ গোষ্ঠীও হিমন্তর বড় মাথাব্যথা।

বিজেপির বরিষ্ঠ নেতা ও প্রাক্তন ভারপ্রাপ্ত সভাপতি শান্তনু ভরালী সম্প্রতি বলেছেন, ২০১৪ সালের আগে যাঁরা দলে ছিলেন, তাঁরাই প্রকৃত বিজেপি কর্মী। দীর্ঘদিন ধরে যাঁরা দলকে শক্তিশালী করার জন্য কাজ করেছেন, তাঁদের যথাযথ গুরুত্ব দেওয়া হয়নি। অনেক পুরনো নেতা ও কর্মী বর্তমানে দলের ভিতরে অবহেলার শিকার হচ্ছেন। এই পরিস্থিতিকে সামনে রেখেই প্রদেশ কংগ্রেস সভাপতি গৌরব গগৈ বলছেন, ২০২৬ সালের ভোট হতে চলেছে ‘আসল’ কংগ্রেসি বনাম ‘ভুয়ো’ কংগ্রেসিদের লড়াই।

(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

BJP

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy