মহারাষ্ট্রের পুণেতে ব্যবসায়ীপুত্র কেতনবিশাল অগ্রবালকে খুনের আগে তাঁর বাগ্দত্তা সিয়া গয়াল দেখা করেছিলেন প্রেমিক চেতন বাবুলাল চৌধরীর সঙ্গে। সেখানেই লোহাগড় দুর্গে কেতনকে খুনের পরিকল্পনা করা হয়েছিল বলে জানিয়েছে পুলিশ। এমনকি, সেই খুনকে ‘দুর্ঘটনা’ বলে সাজানোর পরিকল্পনাও হয়েছিল খুনের কয়েক ঘণ্টা আগে পুণেতে সেই সাক্ষাৎপর্বেই।
২৬ বছরের যুবক কেতনকে তাঁর বাগ্দত্তা সিয়া এবং সিয়ার প্রেমিক চেতন গত ১৮ জুন পুণের অদূরে লোহাগড় দুর্গে ট্রেকিং করার সময় ৪৫০ ফুট গভীর খাদে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দিয়েছিলেন বলে অভিযোগ। ধৃত সিয়া এবং চেতনকে মঙ্গলবার এক সপ্তাহের জন্য পুলিশি হেফাজতে পাঠানোর নির্দেশ দিয়েছেন পুণে দায়রা আদালতের বিচারক। পুণে (গ্রামীণ) পুলিশের সুপার সন্দীপ সিংহ গিল জানিয়েছেন, ২২ বছরের চেতন এবং ২০ বছরের সিয়ার বিরুদ্ধে খুন ও অপরাধমূলক ষড়যন্ত্র এবং প্রমাণ লোপের চেষ্টার অভিযোগ আনা হয়েছে।
পরিকল্পনামতো সিয়া পুলিশের কাছে কেতনের পা পিছলে পড়ে যাওয়ার কথা বলে ‘দুর্ঘটনাতত্ত্ব’ সাজানোর চেষ্টা করলেও তা সফল হয়নি। পুণে (গ্রামীণ) পুলিশের তদন্তকারী দল লোহাগড় দুর্গ যাওয়ার পথে সমস্ত সিসিটিভি ফুটেজ খতিয়ে দেখতে শুরু করতেই ‘রহস্য উন্মোচন’ হয়। সন্দীপের কথায়, ‘‘আমরা সিসিটিভি ফুটেজে দেখতে পাই, কেতন-সিয়ার গাড়ি অনুসরণ করছেন একজন যুবক। তাঁর গতিবিধি সন্দেহজনক ছিল। বিশেষ করে ঘটনার দিন অত্যধিক গরম থাকা সত্ত্বেও ওই যুবকের গায়ে ছিল হুডি।’’ কেন গরমে ওই যুবক হুডি পরেছিলেন, তা ভাবায় তদন্তকারীদের। শুধু তা-ই নয়, দুর্ঘটনাস্থলের আশপাশের সিসিটিভি ফুটেজেও ওই যুবকের উপস্থিতি ধরা পড়ে।
সেই সূত্র ধরে জিজ্ঞাসাবাদের সময়ই ভেঙে পড়েন সিয়া। স্বীকার করেন কেতনকে খুনের পরিকল্পনার কথা। স্বীকার করেন, ওই হুডি পরিহিত যুবকই তাঁর প্রেমিক চেতন। তদন্তকারীদের আরও দাবি, সিয়ার কথায় বেশ কিছু অসঙ্গতি ধরা পড়েছিল। সিয়ার ফোন, সমাজমাধ্যম অ্যাকাউন্ট এবং কল ডিটেল-সহ বেশ কিছু গতিবিধি পরীক্ষা করার পর তদন্তকারীরা জানতে পারেন, সহকর্মী চেতনের সঙ্গে সম্পর্ক ছিল সিয়ার। পুলিশ সূত্রের খবর, আরও একটি ভিডিয়ো প্রকাশ্যে এসেছে। সেখানে দেখা যাচ্ছে, গাড়িতে রয়েছেন কেতন। তিনি চালকের পাশের আসনে বসে। পিছনের আসনে ছিলেন সিয়া। তাঁর দিকে ঘুরে কেতন গল্পে মশগুল ছিলেন। ইয়ার্কি-ঠাট্টা চলছিল। তদন্তকারীরা মনে করছেন, কেতনকে খুনের ঠিক আগের ভিডিয়ো সেটি। খুব হাসিখুশি দেখাচ্ছিল কেতনকে।
তদন্তে জানা গিয়েছে, ৩১ মে কেতন ও সিয়া লোহাগড় দুর্গে গিয়েছিলেন। চার দিন পর সিয়া আবার তাঁকে লোহাগড় দুর্গে যেতে জোরাজুরি করেন। কিন্তু কেতনের মা তাঁকে দ্বিতীয় বার সেখানে যেতে দেননি। ১৪ জুন সিয়া আবার কেতনকে লোহাগড়ে যাওয়ার জন্য জোর করেন। সে দিনও তিনি নাকি তাঁকে খাদের ধাক্কা দিয়ে ফেলে দেওয়ার চেষ্টা করেন। কিন্তু কেতন একটি ঝোপ আঁকড়ে ধরে নিজেকে বাঁচাতে সক্ষম হন। কেতন যখন জানতে চান কেন তাঁকে ধাক্কা দেওয়া হয়েছে, তখন সিয়া সাপ দেখার মিথ্যা আতঙ্ক সৃষ্টি করেন এবং এমন ভাবে বিষয়টি উপস্থাপন করার চেষ্টা করেন যেন তিনিই তাকে রক্ষা করেছেন। ১৮ জুন সকালে সিয়া ও চেতন পুণের একটি ক্যাফেতে দেখা করেন এবং কেতনকে হত্যার পরিকল্পনা করেন। তাঁরা দুর্গের যাওয়ায় ট্রেকিং রুটে এমন কিছু সম্ভাব্য স্থান চিহ্নিত করেন, যেখান থেকে কেতনকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দেওয়া যেতে পারে।
বিকেলে সিয়া আবার কেতনকে নিয়ে দুর্গে যান। চেতনও তাদের পিছু নিয়ে ট্রেকিংয়ে যোগ দেন। হেঁটে ওই পথ পার হতে সাধারণত প্রায় তিন থেকে চার ঘণ্টা সময় নেয়। ট্রেকিংয়ের সময় চেতন হাতের ইশারায় সিয়ার সঙ্গে যোগাযোগ করছিলেন। সিসিটিভি ফুটেজে দেখা গিয়েছে, চেতন নিজের পরিচয় গোপন রাখতে হুডি পরে তাঁদের পিছু নিয়েছিলেন। তদন্তকারীদের সূত্র উদ্ধৃত করে প্রকাশিত খবরে দাবি, সহকর্মী চেতনের সঙ্গে প্রেমের সম্পর্ক ছিল সিয়ার। তার মধ্যেই কেতনের সঙ্গে তাঁর বাগ্দান হয়ে গিয়েছিল। আগামী নভেম্বর মাসে সিয়া এবং কেতনের বিয়ে ঠিক করেছিল তাঁদের পরিবার। রাজস্থানের উদয়পুরে কয়েক কোটি টাকা দিয়ে বিলাসবহুল হাভেলীও ভাড়া করা হয়েছিল।
কিন্তু সিয়া চাইছিলেন না, কেতনের সঙ্গে তাঁর বিয়ে হোক। অভিযোগ, কেতনকে সরাতে চেতনকে নিয়ে খুনের পরিকল্পনা করেন সিয়া। ১৮ জুন যখন কেতনকে নিয়ে লোহাগড় দুর্গে হাজির হয়েছিলেন সিয়া, সেখানে আগে থেকেই ছিলেন চেতন। কেতন এবং সিয়া ট্রেক করে উঠছিলেন। তাঁদের অনুসরণ করছিলেন চেতন। তাঁর উপস্থিতির কথা টের পাননি কেতন। কিন্তু সিয়া জানতেন, চেতন তাঁদের অনুসরণ করছেন। হাঁটতে হাঁটতে তাঁরা দু’জনে পাহাড়ের ধারে যান। ঠিক সেই সময়ে সেখানে চেতন হাজির হন। অভিযোগ, তার পর কেতনকে ধাক্কা মেরে পাহাড় থেকে প্রায় ৪০০ ফুট গভীর ফেলে দেন।