×

আনন্দবাজার পত্রিকা

Advertisement

২১ জানুয়ারি ২০২১ ই-পেপার

রুপোলি পর্দায় রোদ-চশমা

২১ জুন ২০১৫ ০২:১০

প্রথমেই মনে পড়ে সত্যজিৎ রায় পরিচালিত ‘নায়ক’ সিনেমাটার কথা। অরিন্দমরূপী উত্তমকুমার এ সিনেমার একটা বিরাট অংশ জুড়ে সানগ্লাস ব্যবহার করেছেন। এ কথা আমরা অল্পবিস্তর সবাই জানি যে, রুপোলি পর্দার সফল লোকেরা সানগ্লাস ব্যবহার করতে পছন্দ করেন। ব্যাপারটা অনেকটা যেন রিচ্যুয়ালে দাঁড়িয়ে গেছে। অরিন্দমরূপী উত্তমকুমার রাজধানী এক্সপ্রেসে ওঠা থেকেই সানগ্লাস তার চিরসখা। সেই সঙ্গেই একই রকম উল্লেখযোগ্য বিষয় হল, ‘নায়ক’ সিনেমার একটি স্বপ্নদৃশ্যে পার্টি রয়েছে—রাতের পার্টি, কিন্তু সেই পার্টিতে উপস্থিত সমস্ত নারী-পুরুষের চোখেই রয়েছে সানগ্লাস। এ প্রসঙ্গে আরও একটি কথা না বললেই নয়। চোখকে সান-স্পর্শ থেকে বাঁচাতেই গ্লাস-এর উপস্থিতি, অথচ সানগ্লাস এমনই এক ব্যবহারের জিনিস, যা প্রায় অধিকাংশ অভিনেতা-অভিনেত্রীর কাছেই অন্তর্বাস ব্যবহারের সামিল। ফলে সন্ধের পার্টিতেও সানগ্লাসকে দেখতে পাওয়া যায়। সেই ষাটের দশকেই সত্যজিৎ রায় ‘নায়ক’ সিনেমায় তাঁর রাতের পার্টিতে সবার চোখে সানগ্লাস পরিয়েছেন। অর্থাই এ পার্টির সকলেই যেন সেলিব্রিটি পর্যায়ের অথবা অন্ধ। অন্ধত্ব না দেখানোর জন্যই সানগ্লাসের ব্যবহার। এ সিনেমার নায়িকা পরেছিলেন চশমা। যথোপযুক্ত চশমা। তিনি শর্মিলা ঠাকুর। সেই শর্মিলা ঠাকুরকেই আমরা দেখতে পাব ‘সীমাবদ্ধ’ সিনেমায়। এই সিনেমাতেই শর্মিলার জামাইবাবু নবাগত বরুন চন্দ ও তাঁর অফিসের অন্যতম ডিরেক্টরের ভূমিকায় হারীন্দ্রনাথ চট্টোপাধ্যায় দুজনেই সানগ্লাস ব্যবহার করেছেন। তবে শর্মিলা ঠাকুরের সানগ্লাস ব্যবহার যেন সেই সময়ের এক আধুনিকতার জলজ্যান্ত উদাহরণ। যদিও ‘নায়ক’ কিংবা ‘সীমাবদ্ধ’র কাহিনি তো অনেকটাই সমকালীন, সানগ্লাসের ব্যবহার দেখানোর পক্ষে যথাযথ। কিন্তু সত্যজিৎ রায়ের পক্ষেই বোধহয় সম্ভব কোনও রূপকথার গল্পকে সিনেমা করে, তাতেও সানগ্লাস ব্যবহার করা। আজ্ঞে হ্যাঁ, আমি বলতে চাইছি—‘গুপী গাইন বাঘা বাইন’ ছবিতে জাদুকর বরফিকেও আমরা দেখেছি সানগ্লাস ব্যবহার করতে। বরফি চরিত্রটির অভিনেতাও ছিলেন হারীন্দ্রনাথ চট্টোপাধ্যায়। এ ধরনের ছায়াছবির কাহিনিতেও যে সানগ্লাস ব্যবহার করা যায়, সে কল্পনা বুঝি একমাত্র সত্যজিতের মতো প্রতিভার পক্ষেই সম্ভব।

Advertisement



সানগ্লাসের আরও একটি সুন্দর ব্যবহার ‘আলো আমার আলো’ সিনেমায়—যেখানে ধনকুবের এক লম্পট মানুষের চরিত্রে ছিলেন উত্তমকুমার, নারী মানেই যার কাছে ভোগের পণ্য। এ হেন এক চরিত্রের রূপারোপে সানগ্লাস অতি অবশ্যই পূর্ণতা দান করেছিল। ঠিক যেন নৈবেদ্যর চূড়ায় রাখা সন্দেশের মতোই! ঠিক একই রকম ভাবে বহু সিনেমাতেই বিকাশ রায় সানগ্লাসের ব্যবহারকে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছেন। যেমন ‘ছদ্মবেশী’—যেখানে সারাক্ষণই স্যুটেড-বুটেড বরকর্তা বিকাশ রায়ের চোখে ওই সানগ্লাস থাকাটাই যেন আইডিয়াল। না হলে যেন চরিত্রটা ঠিক জমত না।

সম্ভবত বাংলা ছবি অর্থাৎ টলিউডের রুপোলি পর্দার তুলনায় বলিউডের রুপোলি পর্দায় সানগ্লাসের ব্যবহার পরিমাণে অনেক বেশি। অশোককুমার বহু চরিত্র করেছেন সানগ্লাস পরে। এমনকী, মেগা সিরিয়াল ‘মহাভারত’-এর অ্যাঙ্করিংয়ের সময়েও! যদিও এ-ব্যাপারে প্রশ্ন করা হলে তিনি জানিয়েছিলেন: চোখের একটা গুরুতর সমস্যা হয়েছিল তাঁর, তাই ডাক্তারদের নির্দেশে তাঁকে শুটিং করতে হত সানগ্লাস পরে। ফলে বলাই বাহুল্য, সানগ্লাস যেমন অশোককুমারের চোখ বাঁচিয়েছে—তেমনই তাঁর পেশাকেও বাঁচিয়েছে এবং সর্বোপরি তাঁর চরিত্রটিকেও অন্য এক মাত্রা দান করেছে। ‘সঙ্গম’ ছবিতে রাজ কপূরকে সানগ্লাস-সহ দেখা গিয়েছে। আর শাম্মি কপূরের সানগ্লাস ব্যবহার তো সেই সময়কার হিন্দি সিনেমায় নায়কের চরিত্রে আধুনিকতার ছোঁয়া এনে দেয়।

অন্য প্রসঙ্গে আসার আগে বা যাওয়ার আগে একটা কথা না বললেই বোধহয় নয়। আশির দশকের অন্যতম হিট নায়ক গোবিন্দ তাঁর কিছু সিনেমায় সেই সানগ্লাস ব্যবহার করেছেন, যার গায়ে দাম লাগানো ট্যাগ ঝুলত। কোনও নায়ক কোনও জিনিস ব্যবহার করছেন দামের লেভেলসুদ্ধ—এ প্রায় আজব ব্যাপার বইকী, অথবা পরিচালকের উর্বর মস্তিষ্কের ফল! আবার পুরনো দিনে যাওয়া যাক। হিন্দি সিনেমার গানের ইতিহাসে বিখ্যাততম গানগুলির একটি ‘ও মেরে দিল কি চ্যায়েন’। গায়ক কিশোরকুমার, অভিনেতা রাজেশ খন্না। অন্ধ রাজেশ খন্না চোখে সানগ্লাস পরে গানটি গেয়েছেন ‘মেরে জীবনসাথী’ সিনেমায়। ওই দৃশ্যে চোখে সানগ্লাস না থাকলে যেন নুন ছাড়া কোনও রান্নার পদ বলেই মনে হত! এ ছাড়া ‘আন্দাজ’-এও রাজেশ খন্না সানগ্লাস ব্যবহার করেছিলেন। ‘ডন’ সিনেমায় প্রথম ডন-এর ভূমিকায় ছিলেন অমিতাভ বচ্চন। তিনি সানগ্লাস ব্যবহার করতেন। ‘দো অনজানে’ সিনেমাতেও মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে আসা অমিতাভ দীর্ঘ সময় সানগ্লাস ব্যবহার করেছিলেন। তবে ও সব তো যৌবনের অমিতাভ বচ্চনের কথা। এই সে দিন ‘বান্টি অওর বাবলি’ সিনেমাতেও পুলিশের দুঁদে গোয়েন্দা অমিতাভ বচ্চন বিড়ি ও সানগ্লাস-সহযোগে দাপিয়ে অভিনয় করেছেন। শাহরুখ ‘বাদশা’ খানকে দেখা গিয়েছে ‘বাদশা’ নামে সিনেমায় এক ভয়ংকর সানগ্লাস ব্যবহার করতে। যা পরলে অন্যকে সম্পূর্ণ নগ্ন দেখা যায়। ভাগ্যিস, এখনও কোনও সানগ্লাস-নির্মাতা অত উন্নত মানের সানগ্লাস বানাতে পারেননি! শাহরুখকে দেখা গিয়েছে ‘ডন-টু’ সিনেমাতেও একটা বড় অংশ জুড়ে সানগ্লাস পরে অভিনয় করতে। অবশ্য ডন-কে সানগ্লাস ছাড়া মানায়ও না! আর একটা মজার সানগ্লাস ব্যবহার করেছিলেন কাদের খান—যার মধ্যে ছোট একটা জানালা ছিল আর ছিল একটা মজার ব্যাপার। কেউ বাইরের কোনও দৃশ্য দেখতে না চাইলে অমনি সানগ্লাসের জানালা বন্ধ হয়ে যেত।



স্বামী অন্ধ বলে সেই কবেই গান্ধারী চোখ ঢেকে নিয়েছিলেন কাপড়ের বন্ধনে। আজ যদি গান্ধারী থাকতেন, তবে আশা করা যায়—গাঢ় কালো বা কোনও ঘোর রঙের সানগ্লাসই ব্যবহার করতেন।



শেষে বলি, কয়েকটা কৃষ্ণসার ও ঘুমন্ত পথচারী মেরে ফেলে সল্লু মিঞা আদালতে গিয়েছিলেন সানগ্লাস পরে। নিন্দুকে বলে, এই ঘটনায় এই ঘটনায় এত দুঃখ পেয়েছিলেন যে কেঁদে কেঁদে চোখ ফুলিয়ে ফেলেছিলেন সল্লু ভাই। তাই নাকি ক্রন্দনরত চোখ লুকোতেই সানগ্লাস ব্যবহার করেছিলেন। কে জানে, কোনটা ঠিক। তবে পর্দায় কিংবা বাস্তবে সানগ্লাস অপরিহার্য—আর অপরিহার্য থাকবেও। চোখ বলে কথা!

কিন্তু তার পরেও কথা থেকে যায়। বিশেষত এই দুর্বল বাংলা গদ্যলেখকের জন্য। হে আমার মুম্বইয়ের পাঠক, শুধু মাত্র বয়স হয়ে যাওয়ার কারণেই এতক্ষণ ধরে একটানা বকবক করে গেছি। পাতার পর পাতা যা ইচ্ছে তাই লিখে গেছি। কেননা সানগ্লাসই বলি আর গগলসই বলি—মহাকবি শেকসপিয়রের সেই প্রবাদই সঠিক: গোলাপকে যে নামেই ডাকো, সে গোলাপ-ই! না, এখানে এই বাজারে e-গোলাপ ভাববেন না যেন। অর্থাৎ আসলটা হচ্ছে চোখের আড়াল। সেই কবে বাংলা গানের রোমান্টিকতম গায়ক শ্যামল মিত্র (মিত্তির বললে যেন আপন আপন লাগে) গেয়েছিলেন, ‘চোখের নজর কম হলে আর/কাজল দিয়ে কী হবে’। সত্যিই তো, এখন মনে হয়—‘চোখের নজর কম হলে আর/সানগ্লাস পরে কী হবে’। পাঠক, প্রভুপাদ আমার, আপনি এ রচনা পাঠ করছেন আরব সাগরের হাওয়া খেতে খেতে। আর বিধ্বংসী জ্যৈষ্ঠে জ্বলে যেতে যেতে আপনাকে হাবিজাবি কথা শোনানো, থুড়ি কথা পড়ানো আমার ঠিক হচ্ছে না। তবু সানগ্লাস নিয়ে লিখতে বসে আপনাকে এত কথা পড়ানোর কারণ—আপনি যেখানে বাস করেন, তা হল মুম্বই। আমচি মুম্বই। গোটা ভারতের বাণিজ্যিক রাজধানী। সুদূর হলিউডের ভিত কাঁপিয়ে দেওয়া বলিউডের বাসিন্দাও আপনি। আপনি হরবখত দেখছেন সানগ্লাস কী, কেন, কীসের বৃত্তান্ত। বাংলা সিনেমায় ক’টাই বা আর ছবি হয়েছে সানগ্লাস নিয়ে অর্থাৎ নায়ক-নায়িকাকে সানগ্লাস পরিয়ে? তার চেয়ে অনেক বেশি বলিউডের ছবি হয়েছে। তবু এত কথা লেখার কারণ—সানগ্লাস দেশ-কাল-জাতি-ধর্ম সব পেরিয়ে গিয়েছে।



এতক্ষণেও যে কথাটা বলা হয়নি তা হল, এই ঠা-ঠা গরমে ডাবের জল, ঠান্ডা জল, সুতির পোশাক, বাতানুকূল যন্ত্রের মতোই সানগ্লাস এক এবং অদ্বিতীয়। একে অস্বীকার করা ভুলের তস্য ভুল! আর শুধু কি তাই! কথায় বলে না—‘বললে হবে, খরচা আছে’! তা, খরচের দিক দিয়ে ধরলে বলতে হবে স্বয়ং মাইকেল জ্যাকসন। তাঁর তো বিশ্ব তোলপাড় করা বহু গান এবং নাচ সানগ্লাস পরিহিত অবস্থায়। সে দিনেই হোক কিংবা রাতে। মাইকেল জ্যাকসন এবং সানগ্লাস যেন দুই বন্ধু। যেন হরিহর আত্মা। যেন কই মাছের হরগৌরী। যেন সুনীল-শক্তি, যেন সুচিত্রা-উত্তম! আর একটু দূরে গিয়ে বললে, বিনোদবিহারী মুখোপাধ্যায়ের কথাও মনে পড়ে। অত বড় শিল্পী, চোখ আর দৃষ্টি নষ্ট হয়ে গিয়েছিল। তখন কালো চশমাই ব্যবহার করতেন। তাঁর যা ছবি আমরা দেখি, সবই কালো চশমা পরিহিত বিনোদবিহারীকেই দেখি।

সানগ্লাস-গগলস-রোদচশমা-কালোচশমা—যা-ই বলা যাক না কেন, এ হল আজ দিনযাপনের এক প্রধান উপকরণ। এ কোনও ঘরের শত্রু বিভীষণ নয়। এ ঘরেরই লোক। ডাক্তাররা গরমের দিনে একে ধারণ করতে বলছেন। কেন বলছেন? না, আপনার চোখ বাঁচবে। এ রচনা শুরু করেছিলাম একটা কথা দিয়ে—চোখ অতিশয় বাচাল, যদি না সে অর্ধেক স্তব্ধতা জয় করতে পারত। সত্যি, চোখের মতো কথা কে আর বলতে পারে? কেউ না। তাই তাকে স্তব্ধ করিয়ে রাখা হয়েছে, যেন সে কথা বলতে না পারে। কিন্তু শেষে বলতে হয়—তা হলে আমাদের প্রিয় বাপ্পিদা মানে বাপ্পি লাহিড়ির চোখ কি এতই বাচাল যে, বাপ্পিদা সারাক্ষণ কালো চশমা বা সানগ্লাস পরে রইলেন! এ রচনার শেষে এই খেদ গেল না যে, বাপ্পিদা—আমাদের যৌবনের হিন্দি গানের হিরো বাপ্পিদাকে সানগ্লাস ছাড়া কখনও দেখিনি। অবশ্য উল্টো দিক দিয়ে বললে, সানগ্লাসকে সিংহাসনে বসিয়েছেনও তিনিই। মোদ্দা কথা—সানগ্লাস, সারা বছর জিন্দাবাদ!

Advertisement