বিকেল তখন সাড়ে ৫টা। সুবিশাল এবং সুগভীর নর্মদার মাঝে তখন ক্রুজ়ে বসে জলসফর উপভোগ করছিলেন পর্যটকেরা। তাতে শিশু, মহিলা, বয়স্ক-সহ ২৯ জন ছিলেন। আচমকাই ঝড় উঠল। নদীতে বড় বড় ঢেউ উঠতে শুরু করল। ক্রুজ় অস্বাভাবিক ভাবে দুলছিল। তার পরই জলের জোরালো একটি ঝাপটা। ক্রুজের জানলার কাচ ভেঙে গেল। তার পরই সেই ভাঙা জায়গা দিয়ে হু-হু করে জল ঢুকতে শুরু করল।
এ পর্যন্ত বলে থেমে গিয়েছিলেন দুর্ঘটনা থেকে বেঁচে ফেরা সৈয়দ রিয়াজ় হোসেন। কোন চমৎকারে তিনি বেঁচে গিয়েছেন এখনও বুঝে উঠতে পারছেন না। এনডিটিভি-কে সৈয়দ বলেন, ‘‘তখনও কেউ বুঝে উঠতে পারছিলাম না কী করা উচিত। ক্রুজ়ে জল ঢুকছিল। মহিলা, শিশুরা ভয়ে, আতঙ্কে ক্রুজ়ের এক প্রান্তে গিয়ে আশ্রয় নিয়েছিল। গোটা ক্রুজে তখন কান্নার রোল। আতঙ্কের পরিবেশ।’’
সৈয়দ বলেন, ‘‘বিপদ ঘনিয়ে আসছে বুঝতে পেরে আমার লাইফজ্যাকেটটা খুলে অন্য এক যাত্রীকে পরতে দিলাম। তার কিছু ক্ষণের মধ্যেই ক্রুজ় জলে ভরে গিয়ে কাত হয়ে গেল। তখনও ঝড়ের দমকা হওয়া চলছিল। তার পর ধীরে ধীরে ক্রুজ়ের সামনের অংশ জলের তলায় ঢুকে যেতে শুরু করল।’’ সৈয়দ আরও জানান, ভেবেছিলেন এটাই শেষ। আর হয়তো বেঁচে ফেরা হবে না। ক্রুজ় উল্টে যেতেই তিনি কোনও রকমে বেরিয়ে আসার চেষ্টা করেন। মাথা জলের উপরে থাকলেও দেহের নীচের অংশটা আটকে গিয়ছিল ক্রুজ়ের কোনও একটি জায়গায়। সৈয়দের চোখ বেয়ে জল গড়িয়ে পড়ল। সামলানোর চেষ্টা করে তিনি আবার বলতে শুরু করলেন, ‘‘ওই অবস্থায় বাঁচার লড়াই চালিয়ে গিয়েছি। ক্রুজ়ের ভিতরের লোকগুলির মুখ মনে পড়ছিল। বার বার মনে হচ্ছিল, ওরা যেন বেরিয়ে আসতে পারেন। বেরিয়ে এলেন ঠিকই, তবে নিথর হয়ে। কিছু পরেই দেখলাম আমার চারপাশে এক এক করে মহিলা, পুরুষ এবং শিশুদের দেহ ভেসে উঠছে। এর থেকে বেদনাদায়ক আর কী হতে পারে।’’ সৈয়দ জানান, তিনি বেঁচে ফিরেছেন ঠিকই, কিন্তু যাঁরা তাঁর সহযাত্রী ছিলেন, চোখের সামনে এ ভাবে মরতে দেখে কান্নায় ভেঙে পড়েছিলেন। শুক্রবার সকাল পর্যন্ত ২৪ জনকে উদ্ধার করা হয়েছে বলে স্থানীয় প্রশাসন সূত্রে খবর। ১৭ জনকে হাসপাতালে ভর্তি করানো হয়েছে। পাঁচ শিশু-সহ ন’জনের মৃত্যু হয়েছে। ঘটনাচক্রে, সৈয়দ বেঁচে ফিরলেও তাঁর পরিবারের এখনও কোনও খোঁজ মেলেনি।
প্রসঙ্গত, বৃহস্পতিবার মধ্যপ্রদেশের বার্গি বাঁধে নর্মদার জলে ক্রুজ়ডুবি হয়। সেই ঘটনায় এখনও উদ্ধারকাজ চলছে।