ক’মাস পরেই ভোট। তৃণমূলকে ঠেকাতে রাজ্যে সিপিএমের একটি অংশ কংগ্রেসের সঙ্গে হাত মেলাতে চান। রাজ্য কংগ্রেসেরও অনেকে চাইছেন, ভোটের আগেই প্রকাশ্যে বা পরোক্ষ সমঝোতা হোক বামেদের সঙ্গে। কিন্তু সঙ্কটের সময়ে কংগ্রেসের শীর্ষ নেতৃত্ব যখন সমর্থন চাইলেন, সিপিএম ফিরিয়ে দিল সেই আবেদন। বরং তৃণমূল এগিয়ে এল সনিয়া ও রাহুল গাঁধীর সমর্থনে। সংসদে কংগ্রেসের সঙ্গে এক সুরে সরকারের বিরুদ্ধে গলা চড়ালেন তাঁদের সাংসদরা। আর দিল্লিতে এসে প্রকাশ্যেই সনিয়ার পাশে দাঁড়ালেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়!
ন্যাশনাল হেরাল্ড মামলায় সনিয়া ও রাহুল গাঁধীকে নিম্ন আদালতে সমনের প্রতিবাদে আজ গোটা দিন সংসদ অচল করে রাখে কংগ্রেস। তাতে সমর্থন জোগায় তৃণমূল। ব্যক্তিগত ভাবেও সনিয়া-রাহুলের পাশে থাকার বার্তা দিতে মুখ খোলেন মমতা। তাঁর কথায়, ‘‘এত বছর রাজনীতি করার পর যদি কাউকে আদালতে হাজিরা দিতে হয়, তা হলে খুবই অস্বস্তি হয়। আমারও খারাপ লাগছে। কাল সনিয়াজির জন্মদিন। ওঁর সময় হলে আমি দেখা করব। এ বিষয়ে কথা হবে।’’
বিধানসভা ভোটের সময় সমীকরণ কী দাঁড়াবে সে পরের কথা। তবে সন্দেহ নেই, রাজ্যে কংগ্রেস-সিপিএম সমঝোতার ভাবনায় কিছুটা হলেও জল ঢেলে দিয়েছে এ দিনের মমতা-সনিয়া তথা কংগ্রেস-তৃণমূলের সমঝোতার ছবিটি। অ-বিজেপি দলগুলির মধ্যে একমাত্র তৃণমূলই আজ এই ভাবে কংগ্রেসের পাশে দাঁড়িয়েছে। পশ্চিমবঙ্গে সিপিএম এবং কংগ্রেসের যাঁরা সমঝোতার পক্ষে সওয়াল করছেন, তাঁরা চিন্তায় পড়ে গিয়েছেন এতে।
মোদী সরকারের বিরুদ্ধে তোপ দাগতে গিয়ে মল্লিকার্জুন খড়্গে, গুলাম নবি আজাদ, কপিল সিব্বলের মতো কংগ্রেস নেতারা আজ বারবারই বলেছেন, শুধু তাঁদের দলকেই নয়, তৃণমূল ও বিরোধী শিবিরের অন্যদেরও একই ভাবে নিশানা করা হচ্ছে। সারদা মামলায় জেরবার তৃণমূলকে দলের কেন্দ্রীয় নেতারা এ ভাবে কাছে টানার চেষ্টা চালাচ্ছেন দেখে বেজায় অস্বস্তিতে রাজ্যের কট্টর তৃণমূল-বিরোধী কংগ্রেস নেতারা।
সিপিএমের সমস্যা অন্য। তাদের কাছে প্রশ্নটা নীতির। কংগ্রেসের তরফে তৃণমূল এবং সিপিএম, দু’দলের কাছেই সমর্থনের জন্য অনুরোধ জানানো হয়েছিল। তৃণমূল সেই অনুরোধে সাড়া দিলেও সিপিএম সমর্থন করেনি। প্রশ্ন উঠেছে, বিজেপিকে রুখতে কংগ্রেসের সঙ্গে সদ্ভাব রেখে চলার দর্শন ছেড়ে সীতারাম ইয়েচুরির সিপিএম কি ফের প্রকাশ কারাটের কংগ্রেস-বিরোধিতার পথে ফিরছে? সিপিএম সংসদীয় দলের নেতাদের জবাব, ন্যাশনাল হেরাল্ডের বিষয়টি দুর্নীতির অভিযোগ। এটি সনিয়া-রাহুলের ব্যক্তিগত বিষয়। তার সঙ্গে জাতীয় রাজনীতির কোনও সম্পর্ক নেই। সিপিএম সংসদে নির্দিষ্ট বিষয়ের ভিত্তিতে মোদী সরকারের বিরুদ্ধে কংগ্রেস ও অন্য অ-বিজেপি দলের সঙ্গে গলা মেলাচ্ছে। দলের নেতাদের যুক্তি, অসহিষ্ণুতা বা কৃষক আত্মহত্যা নিয়ে কংগ্রেসের সঙ্গে গলা মেলালেও দুর্নীতির প্রশ্নে গলা মেলানো সম্ভব নয়। তা ছাড়া এর সঙ্গে সংসদেরও কোনও সম্পর্ক নেই। সনিয়া-রাহুলকে সমন করেছে আদালত। তার জন্য সংসদ অচল করার কোনও অর্থ নেই।
কংগ্রেস সাংসদরা যখন আজ সংসদে ওয়েলে নেমে বিক্ষোভ দেখাচ্ছিলেন, তখন নিজেদের আসনে দাঁড়িয়ে প্রতিবাদ জানান ও আগাগোড়া নৈতিক সমর্থন জোগান তৃণমূল সদস্যরা। নীরব থাকে সিপিএম। লোকসভার অধিবেশন চলাকালীন সনিয়াকে দীর্ঘ সময় ধরে সুদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে আলোচনাও করতে দেখা যায়। পরে বেলা তিনটে নাগাদ তৃণমূলের লোকসভার নেতা সুদীপবাবু এই বিষয়ে বক্তব্যও পেশ করেন সংসদে।
মুখ্যমন্ত্রী মমতা আজ সন্ধেয় রাজ্যের দাবিদাওয়া নিয়ে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর সঙ্গে বৈঠক করেছেন। কিন্তু পাশাপাশি সনিয়ার প্রতি সদর্থক বার্তাও দিলেন। বিহারে নীতীশ কুমারের শপথের অনুষ্ঠানে রাহুলকে দীর্ঘক্ষণ মমতার সঙ্গে কথা বলতে দেখা গিয়েছিল। এ বার সংসদে সনিয়া-রাহুলের পাশে দাঁড়াল তৃণমূল। মমতা কাল দশ জনপথে যেতে আগ্রহী বলে ঘোষণা করার আগেই আজ তাঁর দলের সূত্রে জানিয়ে দেওয়া হয়েছিল, জন্মদিনে সনিয়ার কাছে কাল ফুল ও শাল পাঠাবেন নেত্রী। সব মিলিয়ে একে ভোটের মুখে তৃণমূলের বিজেপি-বিরোধী রাজনীতির অঙ্গ হিসেবে দেখছে রাজনৈতিক দলগুলি। যা নিয়ে আজ কটাক্ষ করতে ছাড়েননি সিপিএম নেতারা।
পলিটব্যুরো নেতা মহম্মদ সেলিম বলেন, ‘‘তৃণমূলের অবস্থা এখন কানা মাছি ভোঁ ভোঁ, যাকে পাবি তাকে ছোঁ।’’ তাঁর যুক্তি, সনিয়া-রাহুলকে আদালতের সমন দেখে আসলে সিঁদুরে মেঘ দেখছেন তৃণমূল নেত্রী। তাঁর মনে ভয় তৈরি হয়েছে, আদালত যদি আজ ন্যাশনাল হেরাল্ডের মামলায় সনিয়া-রাহুলকে সমন করতে পারে, তা হলে আজ বাদে কাল তাঁকেও সারদা-কাণ্ডে সমন করতে পারে। সেই ভয়েই তিনি বলছেন, অনেক দিন রাজনীতি করলে আদালতে ডাকা উচিত নয়। সিপিএম নেতাদের যুক্তি, আজ যেমন সনিয়া আদালতের সমন পেয়ে সংসদ অচল করছেন, তেমনই মমতাকে আদালতে ডাকা হলে তৃণমূল বাংলা অচল করবে। কোনওটিই সমর্থনযোগ্য নয়।
আজ সকালে অধিবেশন শুরু হওয়ার ঠিক আগে প্রথমে সনিয়া ও তার পর জ্যোতিরাদিত্য সিন্ধিয়া তৃণমূলের লোকসভার দলনেতা সুদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়কে জানান, শাসক শিবির সব রকম ভাবে বিরোধীদের কন্ঠরোধ করার চেষ্টা করছে। এর প্রতিবাদে কংগ্রেসের সমর্থনে পাশে দাঁড়াক তৃণমূল। সুদীপবাবুর কথায়, ‘‘বিরোধীদের ঐক্যের প্রশ্নে আমরা কংগ্রেসের সমর্থনে পাশে দাঁড়াই। তবে কংগ্রেস ওয়েলে নামলেও আমরা নিজেদের আসনে দাঁড়িয়েই প্রতিবাদ জানিয়েছিলাম।’’ লোকসভায় প্রশ্নোত্তর পর্বেই সংসদ অচল করার জন্য ওয়েলে নামেন কংগ্রেস সাংসদেরা। সে সময় উপস্থিত তৃণমূলের ১৬ জন সাংসদ নিজেদের আসনে দাঁড়িয়ে পড়েন। প্রশ্নসূচি মেনে তৃণমূলের অপরূপা পোদ্দার (আফরিন আলি)-কে স্পিকার প্রশ্ন করার জন্য ডাকতে, তিনি প্রশ্ন করবেন না বলে জানিয়ে দেন।
বেলা আড়াইটে নাগাদ লোকসভায় দলিত প্রসঙ্গে আলোচনা শুরু করে সরকার। এর বিরোধিতায় সক্রিয় হন সনিয়া। সুদীপবাবুর আসনের পাশে দাঁড়িয়ে সনিয়া তাঁকে বলেন, মল্লিকার্জ্জুন খড়্গে কাল এ নিয়ে আলোচনা করতে চেয়েছিলেন, তখন সুযোগ দেয়নি সরকার। কিন্তু এখন সরকার নিজের ইচ্ছামাফিক ওই বিষয়ে আলোচনা শুরু করে দিয়েছে। শাসক শিবিরের এ জাতীয় স্বেচ্ছাচারী পদক্ষেপ বিরোধীদের কণ্ঠরোধ করার চেষ্টা— এই যুক্তিতে তৃণমূলের সাহায্য চান সনিয়া। সনিয়ার আবেদনের পর কংগ্রেসের সমর্থনে ফের বিক্ষোভে সামিল হন সুদীপবাবুরা।
তবে এ দিন যে ভাবে শেষ মুহূর্তে কংগ্রেসের পক্ষ থেকে তৃণমূলের সাহায্য চাওয়া হয়েছে তা নিয়ে ঘনিষ্ঠ মহলে ক্ষোভ জানিয়েছেন তৃণমূলের কিছু নেতা। যেমন সৌগত রায়ের কথায়, ‘‘কোনও বিষয় নিয়ে সরকারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদে শরিক হবে, কি হবে না, তা দলীয় স্তরে স্থির করতে একটু সময় লাগে। কিন্তু কংগ্রেসের সমস্যা হল তারা একেবারে শেষ বেলায় সাহায্য চায়। কংগ্রেস নেতৃত্বের উচিত, সংসদে কক্ষ সমন্বয়ের প্রশ্নে অন্য দলগুলির সঙ্গে একটু আগে আলোচনা করে নেওয়া।’’