শাংহাই কোঅপারেশন অর্গানাইজ়েশনে (এসসিও) প্রতিরক্ষামন্ত্রী পর্যায়ের বৈঠকে যোগ দিতে চিনে যাওয়ার আগে প্রতিরক্ষামন্ত্রী রাজনাথ সিংহ বলেছিলেন, আন্তর্জাতিক শান্তি এবং নিরাপত্তা নিয়ে ভারতের দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরাই তাঁর লক্ষ্য। বাস্তবে সেই লক্ষ্যে কিন্তু পৌঁছতে পারল না ভারত। এসসিও বিবৃতিতে পহেলগাম নিয়ে ভারতের উদ্বেগ অনুপস্থিত দেখে বিবৃতিতে স্বাক্ষরই করলেন না রাজনাথ। ফলে কার্যত ভেস্তে গেল এসসিও গোষ্ঠীর প্রতিরক্ষা মন্ত্রকের উদ্যোগ। যৌথ বিবৃতি ছাড়াই এসসিও প্রতিরক্ষামন্ত্রীদের সম্মেলন শেষ হল। কূটনৈতিক শিবিরের মতে, এর অর্থ হল, পহেলগামে নাশকতার দু’মাস কেটে যাওয়ার পরেও আন্তর্জাতিক ভাষ্যে পাকিস্তানের সীমান্ত সন্ত্রাসের দিকে আঙুল তুলতে ব্যর্থ হল মোদী সরকার।
বুধবার ওই সম্মেলনে নাম-না করে সন্ত্রাসবাদে মদত দেওয়ার অভিযোগে পাকিস্তানকে নিশানা করেছিলেন রাজনাথ। দশ দেশের আন্তর্জাতিক মঞ্চ এসসিও-র অন্যতম সদস্য পাকিস্তান। পাকিস্তানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী খোয়াজা আসিফ মুহাম্মদও ওই সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন। তা সত্ত্বেও ভারতের উদ্বেগের বিষয়টি বিবৃতির খসড়ায় স্থান পায়নি।
ফলে এটা দিনের আলোর মতো স্পষ্ট যে, ইসলামাবাদ যৌথ বিবৃতির খসড়ায় পহেলগাম সন্ত্রাসের চিহ্নটুকুও রাখতে দেয়নি এবং তা সম্পূর্ণ ভাবে মেনে নিয়েছে আয়োজক রাষ্ট্র চিন। কূটনৈতিক মহলের একাংশের মতে, পহেলগাম নিয়ে ভারতের কূটনীতির প্রয়াসই এতে চোট পেল। অপারেশন সিঁদুর নিয়ে সবর্দলীয় প্রতিনিধিদের নানা দেশে পাঠিয়েও পাকিস্তানকে একঘরে করা গেল না। বিদেশমন্ত্রীর সফরও কাজে এল না। সেই সঙ্গে অপারেশন সিঁদুরে ক্ষেপণাস্ত্র এবং ড্রোন আক্রমণে পাকিস্তানের প্রধান মদতদাতা চিনের সঙ্গে ভারতের সম্পর্কও আবার খানিক ধাক্কা খেল বলে মনে করা হচ্ছে। কংগ্রেসের সুপ্রিয়া শ্রীনতে আজ কটাক্ষ করে বলেন, ‘‘যখনই আপনার নিজেকে অকেজো মনে হবে, এস জয়শঙ্করের কথা ভাববেন!’’
আগামী মাসের ৬ তারিখ ব্রাজ়িলে বসছে এসসিও-র শীর্ষ সম্মেলন। সেখানে যোগ দিতে যাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। সেখানকার বিবৃতিতেও পাক সন্ত্রাস সম্পর্কে যদি রা কাড়তে না পারে নয়াদিল্লি, তা হলে এই ঘটনারই পুনরাবৃত্তি হবে। এখনও পর্যন্ত খবর, ওই বৈঠকটি চিনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং এড়িয়ে যেতে পারেন। তিনি না-ও যেতে পারেন ব্রাজ়িলে। কারণ ব্রিকস বৈঠকের পর ব্রাজ়িলের শীর্ষ নেতৃত্বের পক্ষ থেকে প্রধানমন্ত্রী মোদীর সম্মানে একটি রাষ্ট্রীয় নৈশভোজের আয়োজন করার কথা রয়েছে। সেখানে উপস্থিত থাকতে চাইছেন না শি, এমনটাই শোনা যাচ্ছে।
বিবৃতিতে সই না করলেও আজ এসসিও সম্মেলনে বক্তৃতার সময়ে রাজনাথ হুঁশিয়ারি দেন, যারা সন্ত্রাসবাদকে নিজেদের ক্ষুদ্র স্বার্থ পূরণের উদ্দেশ্যে প্রশ্রয় দেয় এবং ব্যবহার করে, এর পরিণতি তাদের ভোগ করতে হবে। সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে নয়াদিল্লির লড়াইয়ের বার্তা স্পষ্ট করে দিয়ে তিনি বলেন, “এই লড়াইয়ে আমাদের সকলকে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। যারা সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে দু’মুখো আচরণ করে, সেই দেশগুলির সমালোচনা করতে এসসিও-র কোনও দ্বিধা থাকা কাম্য নয়।” বক্তৃতায় পহেলগামের ঘটনার কথা তুলে ধরেন রাজনাথ। জানান, পহেলগামে যে ধরনের জঙ্গি হানা দেখা গিয়েছে, তার সঙ্গে অতীতে লস্কর-ই-তইবার জঙ্গি হানার ধাঁচ মিলে যায়। প্রতিরক্ষামন্ত্রীর কথায়, “পহেলগামে জঙ্গি হামলার সময়ে ধর্মীয় পরিচয় দেখে গুলি করা হয়েছিল। ওই হামলার দায় স্বীকার করে রেজ়িস্ট্যান্স ফ্রন্ট। এরা রাষ্ট্রপুঞ্জের তালিকাভুক্ত সন্ত্রাসবাদী লস্কর-ই-তইবার ছায়া সংগঠন।”
এর পর আজ বিকেলে নয়াদিল্লিতে সাংবাদিক সম্মেলনে বিদেশ মন্ত্রকের মুখপাত্র রণধীর জায়সওয়াল গোটা ঘটনার নির্যাস তুলে বলেন, এসসিও-র সম্মেলনে কোনও যৌথ বিবৃতি গৃহীত হয়নি। কিছু বিষয়ে কিছু দেশ ঐকমত্যে পৌঁছতে পারেনি। ফলে ওই নথিটি চূড়ান্ত করা সম্ভব হয়নি। তিনি বলেন, “ভারত চাইছিল সন্ত্রাসবাদ নিয়ে উদ্বেগের কথা জোরালো ভাবে ওই নথিতে উল্লেখ থাকুক। কিন্তু একটি নির্দিষ্ট দেশের কাছে তা গ্রহণযোগ্য হয়নি। তারা তা মেনে নিতে পারছিল না। সেই কারণেই বিবৃতিটি গৃহীত হয়নি।” তিনি পাকিস্তানের নাম সরাসরি উল্লেখ না করলেও ইঙ্গিতে স্পষ্ট করে দিয়েছেন। কূটনৈতিক সূত্রের বক্তব্য, এসসিও বৈঠকে পাকিস্তান বালোচিস্তানে সন্ত্রাসবাদ চলছে বলে দাবি করে সেটিকে যৌথ বিবৃতির অন্তর্ভুক্ত করার চেষ্টা করেছিল। ভারত যেহেতু যৌথ বিবৃতিতে স্বাক্ষর করেনি, তাই সেই প্রস্তাবও গৃহীত হয়নি। সে জন্য ‘প্রজাতন্ত্রী বালোচিস্তানের’ তরফে ভারতকে ধন্যবাদ জানানো হয়েছে।
এই খবরটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
5,148
1,999
429
169
(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)