ছ’দিনের বিদেশ সফরে পঞ্চম তথা শেষ গন্তব্যে গিয়ে অভূতপূর্ব অভ্যর্থনা পেলেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। ইউরোপের দেশ ইটালিতে। সে দেশের প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনির সঙ্গে তাঁর বৈঠকে দ্বিপাক্ষিক সহযোগিতায় একাধিক ক্ষেত্র নিয়ে ইতিবাচক আলোচনা হয়েছে। সই হয়েছে কয়েকটি চুক্তি। মেলোনিকে দেওয়া মোদীর উপহারের ‘নাম বিভ্রাটে’ বুধবার চকিত-উত্থানের সাক্ষী হয়েছে শেয়ার বাজার। এর পাশাপাশি, মোদীর দেশের প্রত্যাবর্তনের ঠিক আগেই বিরোধী দলনেতা রাহুল গান্ধীর ‘গদ্দার’-মন্তব্যের জেরে ঘরোয়া রাজনীতিতে তৈরি হয়েছে নতুন বিতর্ক।
সংযুক্ত আরব আমিরশাহি সুইডেন, নেদারল্যান্ডস, নরওয়ে, ঘুরে বুধবার ইটালিতে পৌঁছোন মোদী। তাঁর বিমান রোমে অবতরণ করার পরেই এক্স পোস্টে তিনি লেখেন, ‘এই সফরের মূল লক্ষ্য হবে ভারত-ইটালি সহযোগিতা কী ভাবে বৃদ্ধি করা যায়’। চলতি বছরের শুরুতেই ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে এক বাণিজ্যচুক্তি করেছে ভারত। এই চুক্তির অন্যতম উদ্দেশ্য ছিল, আমেরিকার উপর ভারতের নির্ভরতা কমানো। সেই চুক্তি স্বাক্ষরের পর এটাই ছিল মোদীর প্রথম ইউরোপ সফর। এর আগে ২০২৪ সালের জুনে জি৭ শীর্ষ সম্মেলনে যোগ দিতে ইটালিতে গিয়েছিলেন তিনি।
চকোলেট বিভ্রাট
মোদীকে বুধবার রোমের ভিলা ডোরিয়া পামফিলিতে আনুষ্ঠানিক অভ্যর্থনা জানান ইটালির প্রধানমন্ত্রী মেলোনি। সেখানেই হয় দ্বিপাক্ষিক বৈঠক। সাক্ষাৎপর্বে মেলোনিকে ‘পার্লে মেলোডি’ চকোলেট উপহার দেন মোদী। ইটালির প্রধানমন্ত্রী সেই উপহারের ১২ সেকেন্ডের ভিডিয়ো সমাজমাধ্যমে পোস্ট করে লেখেন ‘রোমে স্বাগত, আমার বন্ধু’! এর পরেই হইচই পড়ে যায় মুম্বইয়ের দালাল স্ট্রিটে। ‘পার্লে’-র শেয়ার কেনার ধুম পড়ে যায়। হঠাৎ করে বাড়ে সংস্থার শেয়ারদর। কিন্তু কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই জানা যায়, এই ‘পার্লে’, সেই ‘পার্লে’ নয়। সমনামী অন্য এক সংস্থার শেয়ার কিনেছেন বাজারে লগ্নিকারীরা, যার সঙ্গে ‘মেলোডির’ কোনও সম্পর্কই নেই। মোদীর চকোলেট-কাণ্ডকে কটাক্ষ করে রাহুল এক্স পোস্টে লেখেন— ‘আমাদের মাথার উপর দিকে অর্থনৈতিক ঝড় বয়ে যাচ্ছে, আর আমাদের প্রধানমন্ত্রী ইটালিতে গিয়ে চকোলেট বিলি করছেন। কৃষক, যুবসমাজ, মহিলা, শ্রমিক, ছোট ব্যবসায়ী-সকলের চোখেই জল। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী হাসছেন, হাসিমুখে রিল বানাচ্ছেন। আর তা দেখে শুধু বিজেপির লোকেরা হাততালি দিচ্ছে। কোনও নেতৃত্ব নয়, এটি প্রহসন’।
ভারতীয় সময় বেলা ১১টা ৫০ মিনিটে ওই ভিডিয়ো পোস্ট হওয়ার আধ ঘণ্টার মধ্যে লাফিয়ে বৃদ্ধি পায় ‘পার্লে ইন্ডাস্ট্রিজ়’-এর শেয়ারদর। তবে এই সংস্থার সঙ্গে ‘মেলোডি’র কোনও যোগ নেই। ‘পার্লে ইন্ডাস্ট্রিজ়’ মূলত রিয়্যাল এস্টেট এবং পরিকাঠামো সংক্রান্ত কাজের সঙ্গে যুক্ত। এ ছাড়া কাগজ, কাগজের বর্জ্য থেকে পুনর্ব্যবহারযোগ্য পণ্যও তৈরি করে এরা। অন্য দিকে, ‘মেলোডি’ চকোলেট তৈরি করে সম্পূর্ণ ভিন্ন এক সংস্থা— পার্লে প্রোডাক্ট্স। এটি ১৯৯৯-২০০০ সাল পর্যন্ত পার্লে-বিসলেরি লিমিটেডের অধীনস্থ একটি সংস্থা ছিল। তবে এখন এর সঙ্গে পার্লে বা বিসলেরি গোষ্ঠীর কোনও যোগ নেই। এই পার্লে প্রোডাক্ট্স শেয়ার বাজারে তালিকাভুক্ত কোনও সংস্থাও নয়। দুই সংস্থার নামের সঙ্গেই ‘পার্লে’ জুড়ে থাকায় লগ্নিকারীদের মধ্যে বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছিল।
আরও পড়ুন:
কী হল মোদী-মেলোনি বৈঠকে
২০২৯ সালের মধ্যে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য ২০০০ কোটি ইউরোতে (সাড়ে ২ লক্ষ ২৫ হাজার কোটি টাকারও বেশি) পৌঁছোনোর যৌথ লক্ষ্য ঘোষণা করেছেন দুই প্রধানমন্ত্রী। প্রতিরক্ষা ও সন্ত্রাসবাদ মোকাবিলা, বাণিজ্য ও বিনিয়োগ, গুরুত্বপূর্ণ প্রযুক্তি এবং জ্বালানি-সহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে সহযোগিতা বৃদ্ধির পাশাপাশি, ক্রমবর্ধমান ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতার প্রেক্ষাপটে দ্বিপাক্ষিক কৌশলগত সম্পর্ক নিবিড় করার কথা জানানো হয়েছে যৌথ বিবৃতিতে।
ইউক্রেন যুদ্ধ, ইরান-সহ পশ্চিম এশিয়ায় যুদ্ধ পরিস্থিতি এবং হরমুজ় প্রণালীতে সঙ্কটের প্রসঙ্গও এসেছে যৌথ বিবৃতিতে। বৈঠকের পরে মোদী বলেন, “প্রযুক্তি ও উদ্ভাবন আমাদের অংশীদারির চালিকাশক্তি। এআই, কোয়ান্টাম, মহাকাশ এবং অসামরিক পারমাণু শক্তির মতো অনেক ক্ষেত্রে আমাদের সহযোগিতার বিপুল সম্ভাবনা রয়েছে।” ২০২৩ সালে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যের পরিমাণ ছিল ১৪০০ কোটি ইউরো। ২০২৯-এই তা ২০০০ কোটি ইউরোয় পৌঁছোবে বলে জানান তিনি। সেই সঙ্গে তাঁর মন্তব্য, ‘‘দু’দেশের স্টার্টআপ, গবেষণা কেন্দ্র এবং শিল্পক্ষেত্রকে সংযুক্ত করতে আমরা ভারত-ইতালি ইনোভেশন সেন্টার নিয়ে কাজ করছি।”
জাহাজ চলাচল, বন্দর আধুনিকীকরণ, লজিস্টিকস এবং ব্লু ইকোনমি আগামী দিনে নয়াদিল্লি-রোম সম্পর্কের অন্যতম ভরকেন্দ্র হবে বলেও জানান মোদী। সেই সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর ঘোষণা— ‘‘হেলিকপ্টার, নৌ-প্ল্যাটফর্ম-সহ সমুদ্র-যুদ্ধের উপযোগী অস্ত্র এবং ইলেকট্রনিক যুদ্ধ ব্যবস্থা—সংক্রান্ত অংশীদারিত্ব বাড়ানো হবে।’’ দুই প্রধানমন্ত্রী ভারত-পশ্চিম এশিয়া-ইউরোপ অর্থনৈতিক করিডর (আইএমইসি)-এ সহযোগিতার কথাও ঘোষণা করেছেন। মেলোনি জানিয়েছেন, বিশেষত ছাত্রছাত্রী, গবেষক ও দক্ষ কর্মীদের যাতায়াত বাড়াতে এবং শ্রমবাজারের চাহিদা অনুযায়ী দক্ষতা উন্নয়নে ভবিষ্যতে সহযোগিতার ক্ষেত্র সম্প্রসারিত হবে। তাৎপর্যপূর্ণ ভাবে ত্রাণসামগ্রী নিয়ে গাজ়ায় যাওয়া জাহাজ আটক করা নিয়ে ইজ়রায়েলের সমালোচনা করেন মেলোনি!
‘গদ্দার’ মন্তব্য এবং ‘ভুল মানচিত্র’
লোকসভার বিরোধী দলনেতা রাহুল গান্ধী বুধবার তাঁর নির্বাচনী কেন্দ্র রায়বরেলীতে এক জনসভায় বলেন, “এরপর কোনও আরএসএস নেতা যদি আপনার বাড়িতে আসে, তাঁরা যদি নরেন্দ্র মোদী-অমিত শাহর কথা বলেন, তা হলে তাঁকে পালটা বলুন, ‘আপনার প্রধানমন্ত্রী গদ্দার, আপনার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী গদ্দার, আরএসএস গদ্দার। আপনারা ভারত বেচার কাজ করছেন, আপনারা সব স্বশাসিত সংস্থাকে আক্রমণ করছেন, আপনারা আমাদের সংবিধানকে আক্রমণ করছেন, অম্বেডকরকে আক্রমণ করছেন, মহাত্মা গান্ধীকে আক্রমণ করছেন’।” রাহুলের মন্তব্যের পরেই ‘প্রধানমন্ত্রীর অবমাননা’ অভিযোগ তুলে পাল্টা প্রচারে নেমেছে বিজেপি। পাশাপাশি পদ্ম শিবিরের অভিযোগ, প্রধানমন্ত্রীর বিদেশ সফর নিয়ে সমালোচনা করতে গিয়ে রাহুলের ‘সমাজমাধ্যম টিম’ নরওয়ের পতাকার বদলে সুইডেনের পতাকা ব্যবহার করেছে।