Advertisement
E-Paper

‘মন্দি’ কবে কাটবে, প্রশ্ন অপেক্ষার ইমলি-চকে 

মন্দার ছায়া ক্রমেই দীর্ঘ হচ্ছে দেশের গাড়ি শিল্পে। বিক্রি কমছে, ফলে উৎপাদনও। কাজ হারাচ্ছেন হাজার হাজার শ্রমিক। প্রাথমিক ধাক্কা কাটতে কয়েক সেকেন্ড লাগাল। তার পর বুঝলাম, ওঁরা ভাবছেন ঠিকাদার বা তাঁদের কেউ কর্মীর খোঁজে এসেছেন। ‘না’ বলতেই চোখ থেকে আশার আলো যেন দপ্ করে নিভে গেল।

দেবপ্রিয় সেনগুপ্ত

শেষ আপডেট: ৩০ অগস্ট ২০১৯ ০২:৩৩
 কাজের ডাক আসবে, সেই অপেক্ষায় আদিত্যপুরের ইমলি-চকে শিল্পাঞ্চলের কর্মীরা। ছবি: পার্থ চক্রবর্তী

কাজের ডাক আসবে, সেই অপেক্ষায় আদিত্যপুরের ইমলি-চকে শিল্পাঞ্চলের কর্মীরা। ছবি: পার্থ চক্রবর্তী

সকাল সওয়া আটটা। ইমলি-চক বাজারে বড় উঠোনের মতো জায়গাটায় বেশ ভিড়। টাটা-কান্দ্রা রোডের পাশে অটো থেকে নেমে ‘ইমলি’ গাছ পেরিয়ে সেখানে পৌঁছনোর আগেই দৌড়ে এলেন কালীপদ মাহাতো, মহেন্দ্র সর্দার, রবি ঘোড়ই, জয়নুল হক। সঙ্গে কয়েক জন মহিলাও। প্রশ্ন ছুড়লেন, ‘‘কোনও কাজ আছে?’’

প্রাথমিক ধাক্কা কাটতে কয়েক সেকেন্ড লাগাল। তার পর বুঝলাম, ওঁরা ভাবছেন ঠিকাদার বা তাঁদের কেউ কর্মীর খোঁজে এসেছেন। ‘না’ বলতেই চোখ থেকে আশার আলো যেন দপ্ করে নিভে গেল। সাংবাদিক পরিচয় দিয়ে এই প্রশ্নের কারণ জানতে চাইলে তাঁদের দাবি, গাড়ির যন্ত্রাংশ তৈরির কারখানায় ‘মন্দি’ চলছে। কাজ কমছে। তাই নতুন কাজের খোঁজ।

জামশেদপুর থেকে প্রায় সাড়ে ছ’কিমি দূরে ইমলি-চক। তার ঢিল ছোড়া দূরত্বেই আদিত্যপুর শিল্পতালুক। ইমলি-চকে নিত্য ভিড় করেন কাজের খোঁজে আসা অস্থায়ী কর্মীরা। সাধারণত ‘সিভিল’ (নির্মাণকাজ) বা পণ্য খালাসের কাজে যান তাঁরা। যন্ত্রাংশ তৈরির কারখানাতেও কাজ পান কেউ কেউ। ভাল সময়ে দিনে ৫০০ টাকাও রোজগার হয়। কিন্তু এখন অধিকাংশেরই কপালে জুটছে শুধু অপেক্ষা। আদিত্যপুরের যন্ত্রাংশ তৈরির একটি নামী সংস্থার কর্মী কৃষ্ণা গাগরাইয়ের কোনও সপ্তাহে কাজ আছে তো পরের সপ্তাহে নেই। তখন গন্তব্য এই ইমলি-চক। পেট চালাতে ভরসা ‘সিভিল’-এর কাজ। গাড়ি শিল্পের সঙ্কট সেই শিল্পের বৃত্ত ছাড়িয়ে অনেকটা কর্কট রোগের মতোই ধীরে ধীরে থাবা বসিয়েছে অন্য কাজের ক্ষেত্রেও। ভিন্ রাজ্যের সাংবাদিককে ঘিরে থাকা ভিড়ের অন্যতম মুখ মীনা দেবী বললেন, ‘‘ফ্যাক্টরি চালু থাকলে তবে তো লোকে ঘর বানাবে!’’

‘‘আগে আটটার পরে এই চকে ক’জন বসে থাকতেন সেটাই বড় প্রশ্ন ছিল,’’ বললেন বাজারের চাল-ডাল-মশলা-সাবান-তেলের দোকানি নিরঞ্জন দাস। জামশেদপুরেই জন্ম ও বেড়ে ওঠা ওই ব্যবসায়ী জানালেন, তাঁর দোকানে বিক্রি এখন অর্ধেক। প্রায় দু’লক্ষ টাকার ধার দেওয়া পণ্যের ৫০ হাজার টাকাও ঘরে তুলতে পারেননি।

ইমলি-চকে তাই এখন বাড়তি ভিড়। পুরনোদের সঙ্গে সেখানে কাজের সন্ধানে হাজির হচ্ছেন কারখানার কাজ খোয়ানো শ্রমিকেরাও। তাতে কাজের সুযোগ কমে যায় না? জয়নুল, গণেশ, নাসিমদের জবাব, ‘‘কাজ তো সবারই দরকার। তাই কাজ ভাগ করেই আয় করছি।’’ প্রতিযোগিতার দৌড় তখন যেন নুয়ে পড়ে ইমলি গাছের তলায়।

কিন্তু কেন এই হাল? টাটা মোটরসের উপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা? মানতে নারাজ সিংভূম ইন্ডাস্ট্রিজ অ্যাসোসিয়েশনের প্রাক্তন সভাপতি বিকাশ মুখোপাধ্যায় ও অ্যাসোসিয়েশন অব কম্পোনেন্ট ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশনের পূর্বাঞ্চলের চেয়ারম্যান সঞ্জয় সবরওয়াল। সঞ্জয়বাবু বলছেন, ‘‘হয়তো সিঙ্গুরে টাটার গাড়ি কারখানা হলে জামশেদপুরের যন্ত্রাংশ শিল্পের বাজার কিছুটা বাড়ত। কিন্তু এ বারের সমস্যা গোটা দেশেই এক।

চেন্নাই, পুণে, গুরুগ্রাম, সর্বত্রই সঙ্কটে গাড়ি শিল্প।

তাঁর ও বিকাশবাবুর অভিযোগ, সার্বিক ভাবেই গাড়ি শিল্পে চাহিদায় ভাটা। খনিজ বা নির্মাণকাজ থমকে থাকায় বাণিজ্যিক গাড়ির চাহিদা নেই। কিন্তু এই পরিস্থিতি তো এক দিনে হয়নি। গত কয়েক মাস ধরে তার আভাস থাকলেও কেন্দ্র কেন নড়েচড়ে বসেনি, প্রশ্ন তুলছেন অনেকেই। বিকাশবাবুর আরও প্রশ্ন, শিল্পের প্রাথমিক কাঁচামালের ভাণ্ডার হওয়া সত্ত্বেও ঝাড়খণ্ড সরকার কেন নতুন বিনিয়োগ টানতে সমর্থ হয়নি? সিংভূম চেম্বারের প্রেসিডেন্ট অশোক ভালোটিয়ার বক্তব্য, রেল-সহ কিছু নতুন শিল্প আসা জরুরি।

আদিত্যপুরে শিল্পাঞ্চলে সাময়িক উৎপাদন ছাঁটাই ও কাজ খোয়ানোর কথা মানছেন সেখানকার দায়িত্বে থাকা ঝাড়খণ্ড ইন্ডাস্ট্রিয়াল এরিয়া ডেভেলপমেন্ট অথরিটির রিজিওনাল ডেপুটি ডিরেক্টর রঞ্জনা মিশ্র। তিনি জানালেন, ভবিষ্যতে নতুন বিনিয়োগের জন্য চেষ্টা করছেন তাঁরা।

সম্প্রতি যন্ত্রাংশ কারখানায় কাজ খুইয়ে গায়ে আগুন লাগিয়ে আত্মহত্যা করেছেন জামশেদপুরের কৈলাসনগরের যুবক প্রভাত কুমার। পড়ন্ত বিকালে তাঁর পরিবার ও প্রতিবেশীরা জানালেন, বরাবরই চুপচাপ প্রভাত সে দিনও কাউকে কিছু বলেননি। পড়শি বীরেন্দ্র কুমারের ছেলেও টাটা মোটরসের অস্থায়ী কর্মী। আরও অনেকেই নানা যন্ত্রাংশ সংস্থায় কাজ করেন। নতুন লগ্নি কী আসবে পরের কথা, তাঁদের একটাই প্রশ্ন ‘মন্দি’ কবে কাটবে?

India AutoIndustryCrisis
Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy