সন্তানের মৃত্যু হয়েছে। জীবদ্দশায় তাঁর সন্তান নিজের শুক্রাণু হিমায়িত করে রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। এখন সন্তানের সেই হিমায়িত শুক্রাণু ফেরত চাইছেন মা। কিন্তু তাতেও বিপত্তি। আইনি প্যাঁচে পড়েছেন ৫৫ বছর বয়সি প্রৌঢ়া। এ নিয়ে বম্বে হাই কোর্টে মামলাও চলছে গত কয়েক মাস ধরে। নিষ্পত্তি এখনও হয়নি।
প্রৌঢ়ার সন্তানের মৃত্যু হয় গত বছরের ১৬ ফেব্রুয়ারি। অসুস্থতার কারণেই মৃত্যু হয় তাঁর। তখনও বিয়ে হয়নি যুবকের। এখন তাঁর হিমায়িত শুক্রাণু আইভিএফ-এর জন্য ব্যবহার করতে চান প্রৌঢ়া। সেখান থেকেই শুরু আইনি লড়াই। কেন্দ্র জানিয়ে দিয়েছে, প্রৌঢ়ার আবেদন রাখা সম্ভব নয়। সন্তানহারা মায়ের আর্জি মেনে না নেওয়ার নেপথ্যে সঙ্গত আইনি কারণও রয়েছে বলে দাবি কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্য মন্ত্রকের। এই মর্মে হাই কোর্টে হলফনামাও দিয়েছে মন্ত্রক। প্রৌঢ়ার আবেদন যাতে খারিজ করে দেওয়া হয়, আদালতে সেই আর্জিও জানিয়েছে কেন্দ্রীয় সরকার।
সন্তানের মৃত্যুর পরের মাস (গত বছরের মার্চ) থেকেই হিমায়িত শুক্রাণু ফেরত পাওয়ার চেষ্টা শুরু করেন মা। প্রথমে মহারাষ্ট্রের প্রজনন সহায়ক-প্রযুক্তি (এআরটি) আইনের আওতায় সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন করেন। তাঁর সন্তান জীবদ্দশায় যে শুক্রাণু হিমায়িত করে রেখেছিলেন, তা ফেরত চান প্রৌঢ়া। কিন্তু তাঁকে বলে দেওয়া হয়, এ ভাবে অন্য কাউকে হিমায়িত শুক্রাণু দেওয়া সম্ভব নয়। জাতীয় প্রজননের সহায়ক-প্রযুক্তি এবং সারোগেসি পর্ষদের সঙ্গে তাঁকে যোগাযোগ করতে বলা হয়।
মহরাষ্ট্রের ওই কর্তৃপক্ষের কথা মতো প্রৌঢ়া যোগাযোগ করেন জাতীয় পর্ষদে। সেখানেও ধাক্কা খান তিনি। গত বছরের ৬ মে প্রৌঢ়ার আবেদন খারিজ করে দেয় পর্ষদ। শেষে বম্বে হাই কোর্টের দ্বারস্থ হন তিনি। গত জুন মাসে হাই কোর্ট নির্দেশ দেয়, মামলার নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত ওই হিমায়িত শুক্রাণু নষ্ট করা চলবে না। সেটি যেমন সংরক্ষিত অবস্থায় ছিল, তেমন ভাবেই রাখতে হবে। ওই অন্তর্বর্তী নির্দেশ দেওয়ার সময়ে হাই কোর্ট বলেছিল, “মামলা বিচারাধীন থাকাকালীন শুক্রাণু নষ্ট হয়ে গেলে প্রৌঢ়ের আর্জির আর কোনও মূল্যই থাকবে না।”
আরও পড়ুন:
এই মামলার ক্ষেত্রে, প্রৌঢ়ার সন্তান অবিবাহিত অবস্থায় মারা গিয়েছেন। মৃত্যুর আগে তিনি কোনও উইলও করে যাননি। ফলে এই হিমায়িত শুক্রাণুর ভবিষ্যৎ কী হবে, তা নির্ধারণ করার জন্য মামলাটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছে আদালত। তবে সম্প্রতি কেন্দ্রীয় সরকার আদালতে দাবি করেছে, প্রৌঢ়ার আর্জির কোনও গ্রহণযোগ্যতাই নেই। তাই এই মামলা খারিজ করার জন্য হাই কোর্টে আবেদন জানিয়েছে তারা।
হলফনামায় কেন্দ্র জানিয়েছে, প্রজনন-সহায়ক প্রযুক্তি আইন অনুসারে শুক্রাণু হিমায়িত করার সময়ে একটি সম্মতিপত্র পূরণ করতে হয়। সেখানে বিভিন্ন তথ্য জানাতে হয়। মৃত্যুর পরে ওই হিমায়িত শুক্রাণুর কী পরিণতি হবে, সেই সংক্রান্ত বিষয়েও সম্মতি দিতে হয়। কেন্দ্র হলফনামায় জানিয়েছে, যুবক ওই সম্মতিপত্রে স্পষ্ট ভাবে জানিয়েছেন, মৃত্যুর পরে তাঁর হিমায়িত শুক্রাণু ‘নষ্ট’ করে দেওয়া হবে।
হলফনামায় কেন্দ্র আরও জানিয়েছে, সারোগেসি আইনের আওতায় হিমায়িত শুক্রাণু অন্য কোনও ক্লিনিকে স্থানান্তরের নিয়ম নেই। এআরটি আইনের ২৯ এবং ৩০ নম্বর ধারার কথাও উল্লেখ করেছে তারা। কেন্দ্র জানিয়েছে, আইনের ২৯ নম্বর ধারা অনুসারে, হিমায়িত শুক্রাণু অন্য কাউকে দিয়ে দেওয়া বা বিক্রি করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। একমাত্র এ বিষয়ক জাতীয় পর্ষদের অনুমতি নিয়েই কেউ নিজের হিমায়িত শুক্রাণু অন্যত্র স্থানান্তর করতে পারেন। তা ছাড়া আইনের ৩০ নম্বর ধারা অনুসারে, এই হিমায়িত শুক্রাণু বিদেশে নিয়ে যাওয়া সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।
আইনের এই ধারাগুলির কথা উল্লেখ করে কেন্দ্রের বক্তব্য, সন্তানের হিমায়িত শুক্রাণু পেতে পারেন না ওই প্রৌঢ়া। কারণ, তাঁর সন্তান নিজেই সিদ্ধান্ত নিয়েছেন যে মৃত্যুর পরে ওই শুক্রাণু নষ্ট করে দেওয়া হবে। হিমায়িত শুক্রাণু মরণোত্তর ব্যবহারের ক্ষেত্রে মৃতের কোনও সম্মতি নেই, তা-ও আদালতে জানিয়েছে কেন্দ্র। গত ডিসেম্বরে এই শুনানি পর্ব সময়ের অভাবে সম্পূর্ণ হয়নি। আগামী ফেব্রুয়ারিতে এই মামলার পরবর্তী শুনানি হবে বলে জানিয়েছে হাই কোর্ট।