E-Paper

বাল্যবিবাহ, স্কুলছুট রোখার পাঠ দিচ্ছে খুদে সমীক্ষকেরাই

পশ্চিমবঙ্গ ও ঝাড়খণ্ডের একাধিক জেলায় ছোটদের এমনই নানা সমস্যা নিয়ে সমীক্ষার রিপোর্ট তৈরি করেছে স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন ‘তেরে দ্য হোমস ইন্ডিয়া’।

স্বাতী মল্লিক

শেষ আপডেট: ২৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ১০:৪১
—প্রতিনিধিত্বমূলক ছবি।

—প্রতিনিধিত্বমূলক ছবি।

পালিয়ে বিয়ে করেও কোনও কারণে বাড়িতে ফিরে এলে কিশোরীদের কপালে জোটে মার, ঘরবন্দি জীবন। পরিবারের ‘সম্মানহানি’র দোষ ঘাড়ে নিয়ে সে হয়ে ওঠে দরিদ্র মা-বাবার ‘বোঝা’। স্কুলের বদলে বরাদ্দ হয় চার দেওয়ালের ঘর। উপরি পাওনা মানসিক চাপ, গঞ্জনা। কখনও আবার জোটে দ্বিতীয় বিয়ের নিদান।

স্কুলে স্কুলে মেয়েমুখী পড়াশোনা ও মেয়েদের জন্য নানা সরকারি প্রকল্পের দৌলতে বাহবা পায় ছাত্রীরাই। ফলে ক্লাসে ক্রমশ পিছনের সারিতে ছাত্রেরা। স্কুলেও লিঙ্গ বৈষম্যের শিকার কিশোরেরা তাই আগ্রহ হারাচ্ছে পড়াশোনায়। বলছে, ‘‘স্কুলের পড়া বোঝার মতো বুদ্ধি আমাদের নেই।’’ সেই সঙ্গে রয়েছে রোজগার করার পারিবারিক চাপ। ফলে স্কুলছুট হয়ে অন্যত্র কাজের আশায় পাড়ি দিচ্ছে তারা। কখনও স্কুলের নাম করে পালিয়ে যাচ্ছে।

পশ্চিমবঙ্গ ও ঝাড়খণ্ডের একাধিক জেলায় ছোটদের এমনই নানা সমস্যা নিয়ে সমীক্ষার রিপোর্ট তৈরি করেছে স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন ‘তেরে দ্য হোমস ইন্ডিয়া’। তাদের উদ্যোগে এবং এ রাজ্যের ন’টি স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবী সংস্থার সহযোগিতায় একাধিক বিষয়ে সমীক্ষা চালিয়েছে ছোটরাই! সেই রিপোর্ট সকলের সামনে পেশ করতে চলেছে খুদে সমীক্ষকেরা।

‘তেরে দ্য হোমস’-এর শিশু সুরক্ষা ও অভিবাসনের প্রজেক্ট ম্যানেজার পৌলমী দে সরকার বলছেন, ‘‘সব সময়ে বড়দের চোখ দিয়েই সমস্যাকে দেখা হয়। কিন্তু এখানে ছোটদের সমস্যার নানা দিক চিহ্নিত করে সমীক্ষা চালানো— সবটাই করেছে ১৫ থেকে ২২ বছর বয়সিরা। গত দেড় বছর ধরে এ জন্য তাদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। শুক্রবার এক কর্মশালায় সেই রিপোর্ট সকলের সঙ্গে ভাগ করে নেবে তারা।’’

সমীক্ষার জন্য এ রাজ্যের পাঁচটি জেলা ও ঝাড়খণ্ডের ছ’টি জেলায় একাধিক বিষয়কে বেছে নিয়েছিল খুদে সমীক্ষকেরা। স্কুলছুট ছাত্র, স্কুলের পড়াশোনায় লিঙ্গ বৈষম্য, ছোটদের অনলাইনে বিপদে পড়ার আশঙ্কা, অনলাইন গেমিং ও জুয়া খেলার প্রবণতা এবং একক অভিভাবকের পরিবারে ছোটদের মানসিক সমস্যা— এই বিষয়গুলি নিয়েই বিশেষত পিছিয়ে পড়া পরিবারের খুদে, তাদের অভিভাবক, শিক্ষকদের সঙ্গে কথা বলেছে সমীক্ষকেরা। সমস্যার কারণ খুঁজে বার করা ছাড়াও সমাধানের কথাও রয়েছে রিপোর্টে।

এই সমীক্ষা দেখাচ্ছে, মুর্শিদাবাদ ও উত্তর ২৪ পরগনায় পড়াশোনা ও ফেল করার চাপের ফলে ছাত্রেরা লেখাপড়ায় আগ্রহ হারাচ্ছে। মদ-গাঁজা সহজলভ্য হওয়ায় বাড়ছে স্কুলছুটের সংখ্যা। পশ্চিম মেদিনীপুর ও কলকাতায় ছোটদের মধ্যে মোবাইল-আসক্তি বাড়ছে। ছেলেদের মধ্যে গেমিং ও জুয়ার নেশা মাথাব্যথার কারণ হয়ে উঠছে। সমীক্ষা চালানো কিশোরদের ৬৫ শতাংশই নিজের ফোন ব্যবহার করে গেমিংয়ের জন্য খরচ করছে। ফলে কমছে ঘুম, হয়ে উঠছে খিটখিটে, বদমেজাজি। মন বসছে না লেখাপড়াতেও। সাইবার-নিরাপত্তা নিয়ে সম্যক জ্ঞান না থাকায় বিপদের মুখে পড়ছে কিশোরীরা। একক অভিভাবকের পরিবারে বড় হওয়া ছোটরা আবার বেশি মানসিক চাপ ও অপুষ্টিতে ভুগছে।

কেমন লেগেছে সমীক্ষার কাজ? স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা ‘প্রাজক’-এর তত্ত্বাবধানে মালদহে এই সমীক্ষার কাজ করা কলেজছাত্রী মাসুমা পারভিন বলছেন, ‘‘সমীক্ষা করতে গিয়ে বুঝেছি, অনেকেই, বিশেষত ছোট মেয়েরা অনলাইন সুরক্ষা নিয়ে কিছু জানেই না। কাউকে নিজের পাসওয়ার্ড দিলে যে ফেসবুক অ্যাকাউন্ট হ্যাকড হতে পারে, তাকে ব্ল্যাকমেল করা হতে পারে— সেই ধারণাই নেই। এর জন্য প্রচার চালানো, স্কুলে বোঝানোর প্রয়োজন রয়েছে।’’

খুদেদের সমীক্ষা কি নতুন গবেষণার রাস্তা খুলে দিতে পারে? রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের মানবাধিকার ও মানব উন্নয়ন বিভাগের কোঅর্ডিনেটর পায়েল রায়চৌধুরী দত্ত বলছেন, ‘‘এগুলি জ্বলন্ত সমস্যা, যা গবেষণার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। তবে এতে কিছু নতুন সমস্যাও উঠে এসেছে। যেমন, মুর্শিদাবাদে ছেলেদেরও মা-বাবারা লেখাপড়া করতে উৎসাহ দিচ্ছেন না। ফলে ছেলেদের মধ্যে স্কুলছুট বাড়ছে। এই বিষয়ে পরবর্তী কালে একযোগে গবেষণা করার সুযোগ থাকছে।’’

(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

Child Marriage school dropouts

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy