বাংলাদেশে তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন নতুন সরকারের সঙ্গে এখনও প্রথামাফিক দৌত্য শুরু করেনি ভারত। কূটনৈতিক শিবিরের বক্তব্য, গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় নয়া সরকার তৈরি হল বলেই প্রতিবেশী রাষ্ট্রের আইনশৃঙ্খলা নিয়ে উদ্বেগ এবং ভারতে তার প্রভাব চুঁইয়ে আসা নিয়ে আশঙ্কা শেষ হল, এমনটা ভাবার কারণ নেই। বরং দু’দেশের মধ্যে সরকারি ভাবে কূটনৈতিক সংলাপ শুরু হলে সন্ত্রাসবিরোধী মেকানিজ়মের বিষয়টি সর্বাধিকগুরুত্ব দিয়ে সামনে আনতে পারে নয়াদিল্লি। সীমান্ত যাতে নিরাপদথাকে, সে দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির মোকাবিলা করতে পুলিশি ব্যবস্থা যাতে আবার জোরদার করা হয়, সে গুলিকেও অগ্রাধিকার দিয়েদেখা হবে।
বাংলাদেশে গত কয়েক মাসে ভারত-বিরোধী ভাষ্য এবং সংখ্যালঘুদের উপর নিপীড়নের ঘটনায় জেরবার হয়েছে নয়াদিল্লি। শুধু তাই নয় চট্টগ্রামের খুলশি এলাকায় ভারতীয় মিশনের গা ঘেঁষে হিংসার ঘটনা শুরু হওয়ায় ভিসা পরিষেবা বন্ধ রেখে ভারতীয় কর্মীদের পরিবারকে দেশে ফেরানোর সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছিল নিরাপত্তার খাতিরে। সেই বিভীষিকা যেন আর ফিরে না আসে সেটা অগ্রাধিকারের মধ্যে থাকবে ভারতের। কূটনৈতিক শিবির অবশ্য জানাচ্ছে, ভারতের সীমান্তবর্তী এলাকায় জামায়াতে ইসলামীর বেশি আসন পাওয়ার বিষয়টি নিয়ে বাড়তি আশঙ্কার কারণ নেই। দেশভাগের সময় সাম্প্রদায়িক অশান্তি ফলে যে মুসলমান সম্প্রদায় পালিয়ে প্রাণ বাঁচিয়েছিলেন, তাঁরা বেশিরভাগই ঢাকা পৌঁছতে পারেননি, সীমান্তের কাছাকাছিই বসতি গেড়েছিলেন। ভারত-বিরোধী মননের লালনপালন তখন থেকেই। এখানে ইসলামী উগ্রপন্থা আগেও ছিল, কিন্তু জামাতের হাওয়া এ বারের মতো জোরালো ছিল না বলে ভোটে তারা আসন জয় করতে পারেনি। এ বার পরিস্থিতি তাদের অনুকূল থাকায় বেশ কিছু আসনে জিততে পেরেছে।
কূটনৈতিক মহলের বক্তব্য, এখনই বাংলাদেশের সঙ্গে দৌত্য এবং আস্থাবর্ধক পদক্ষেপ নিয়ে তাড়াহুড়ো না করার কারণ রয়েছে। প্রথমত, তারেক জেতার পরই প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী অভিনন্দন জানিয়েছেন, স্পিকার ওম বিড়লা তাঁর চিঠি নিয়ে গিয়েছেন। তাতে মোদী ভারত এবং বিএনপি সরকারের ভবিষ্যৎ পথ চলার দিশা নির্দেশ করে দিয়েছেন। তিনি তারেককে ‘যত দ্রুত সম্ভব’ ভারত সফরে আসার আমন্ত্রণ জানিয়ে রেখেছেন। ভারত আশা করছে, প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলির মধ্যে সবার আগে নয়াদিল্লি সফরে আসবেন তারেক। দ্বিতীয়ত, মোদী তারেকের সঙ্গে কথা বলে লিখেছেন, ‘দুটি ঘনিষ্ঠ প্রতিবেশী হিসেবে, যাদের গভীর ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক সম্পর্ক রয়েছে, আমাদের উভয় জনগণের শান্তি, অগ্রগতি এবং সমৃদ্ধির প্রতি ভারতের অব্যাহত প্রতিশ্রুতির কথা পুনর্ব্যক্ত করেছি’।"
বাংলাদেশে এখন রমজান মাস শুরু হয়ে গিয়েছে। চলবে প্রায় এক মাস। এখন কোনও গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক দৌত্য শুরুর আদর্শ সময় নয় সেই দেশে। তাই তাদের প্রস্তুত হওয়ার জন্য কিছুটা সময় দেওয়া হচ্ছে। ভারত আগে থেকেই জানিয়ে রেখেছিল, ভোটে জিতে আসা সরকারের সঙ্গে কাজ করতে আগ্রহের কথা। সেই অনুযায়ী দু’দেশের মানুষের স্বার্থকে এগিয়ে নিয়ে যেতে বিএনপি সরকারের সঙ্গে যথাসময় কার্যকরী দৌত্য শুরু করা হবে।
বাংলাদেশিদের ভিসা দেওয়ার বিষয়টি নিয়ে ইতিবাচক ভাবেই চিন্তাভাবনা করছে নয়াদিল্লি। তবে চটজলদি কিছু নয়, ধীরে সুস্থে সময় নিয়ে তা খোলা হবে। ২০২৪ সালের ৮ অগস্ট, জুলাই অভ্যুত্থানের মধ্যে এবং প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভারত চলে আসার তিন দিনপরে ভিসা স্থগিতের প্রথমসিদ্ধান্ত আসে। '২০২৫ সালের নভেম্বরে দ্বিতীয় দফায় ভিসা স্থগিতাদেশ আসে। কট্টরপন্থী নেতা ওসমান হাদির মৃত্যুকে কেন্দ্র করে ভারতবিরোধী বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ার পর একে একে ভারতের ‘ভিসা অ্যাপ্লিকেশন সেন্টার’গুলি বন্ধ হয়ে যায়। ফলে সব কিছু আগের মতো করতে কিছু সময় লাগবে বলে মনে করছে কূটনৈতিক মহল।
এই খবরটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
5,148
1,999
429
169
(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)