সোশ্যাল সাইটে পোস্ট হওয়া একটি ব্যঙ্গচিত্র। পেঁয়াজ হাতে নিয়ে দাঁড়িয়ে নরেন্দ্র মোদী। বলছেন, ‘না খাউঙ্গা, না খানে দুঙ্গা’!
সামনে বিহার ভোট— প্রধানমন্ত্রীর ‘ইজ্জতের লড়াই’। অথচ তার আগেই বাজারে লাফিয়ে বাড়ছে পেঁয়াজের খুচরো ও পাইকারি দাম। অনেকেই বলছেন, ক্ষোভের আগুন আর শুধু হেঁশেলে আটকে নেই। পথেঘাটে আলোচনায়, সোশ্যাল মিডিয়াতেও পেঁয়াজ নিয়ে ব্যঙ্গ-বিদ্রুপ চরম আকার নিয়েছে। কোথাও মোদীর পুরনো স্লোগানকেই বেঁধা হচ্ছে কটাক্ষে। কোথাও হোয়াটসঅ্যাপে আসছে ভিডিও— বাগদত্তাকে পেঁয়াজের আংটি পরাচ্ছেন এক যুবক। কিংবা এক পাতার কমিকস— ‘দু’কেজি পেঁয়াজ কিনবেন? এক্ষুনি প্যান কার্ড দেখান!’
অতএব হাওয়া প্রতিকূল। চিন্তা বাড়ছে বিজেপির। পেঁয়াজের দাম দিল্লিতে ৮০-৯০ টাকা কেজিতে পৌঁছনোর পর নড়ে বসতেই হয়েছে মোদী প্রশাসনকে। রাশ টানা হয়েছে রফতানিতে। পাকিস্তান, আফগানিস্তান, মিশর থেকে ১০ হাজার টন পেঁয়াজ আমদানির বরাত দেওয়া হয়েছে। নির্দেশ দেওয়া হয়েছে কালোবাজারি রোখার। সম্ভবত এ সবেরই প্রভাবে আজ মহারাষ্ট্রে পেঁয়াজের সবথেকে বড় পাইকারি বাজার লাসালগাঁওয়ে পেঁয়াজের দাম ৫০ টাকা কেজির নীচে নেমেছে। কিন্তু খুচরো বাজারে দাম এখনও ৮০ টাকার আশেপাশেই। আজ কলকাতায় মানিকতলা, গড়িয়াহাট-সহ বিভিন্ন বাজারে পেঁয়াজের দর ছিল গড়ে ৭০ টাকা কেজি। তবে কৃষি বিপণন ও উদ্যান পালন দফতরের গাড়ি থেকে কিছু এলাকায় ৫০ টাকা কেজি দরে পেঁয়াজ বিক্রি করা হয়েছে।
ইউপিএ জমানায় তৎকালীন কেন্দ্রীয় অর্থমন্ত্রী প্রণব মুখোপাধ্যায় এক বার মোক্ষম বলেছিলেন, ‘‘এমন কোনও অর্থমন্ত্রী নেই, যাঁকে পেঁয়াজ কাঁদায়নি!’’ রোজকার হেঁশেলে লাগে বলে পেঁয়াজের দাম বরাবরই ক্ষমতাসীন সরকার তথা শাসক দলের কাছে স্পর্শকাতর বিষয়। আবার বিরোধীদের কাছে সেটাই হাতিয়ার। প্রণববাবু যখন ইন্দিরা গাঁধীর জমানায় অর্থমন্ত্রী ছিলেন, তখনও এক বার পেঁয়াজের দাম নিয়ে রাজ্যসভায় ধুন্ধুমার হয়। এক সাংসদ পেঁয়াজের মালা পরে ওয়েলে নেমে পড়েছিলেন।
ঘটনা হল, মোদী নিজেই ইউপিএ আমলে প্রশ্ন তুলেছিলেন— ‘যে সব রাজ্যে পেঁয়াজ উৎপন্ন হয়, সবই তো কংগ্রেসের অধীনে। তা হলে দাম বাড়ছে কেন?’ বিশেষ করে মহারাষ্ট্রের কথা বলেছিলেন মোদী। তাঁর অভিযোগ ছিল, কংগ্রেসই মহারাষ্ট্রে কালোবাজারিতে প্রশ্রয় দিচ্ছে। কিন্তু এখন মহারাষ্ট্রে বিজেপিরই সরকার। কেন্দ্রে কৃষি মন্ত্রক বিজেপির হাতে। শরিক দলের মন্ত্রী রামবিলাস পাসোয়ান সামলাচ্ছেন খাদ্য ও ক্রেতা সুরক্ষা মন্ত্রক। এ দিকে মহারাষ্ট্রে এখন গুদাম থেকে পেঁয়াজ চুরির মতো ঘটনা যেমন ঘটছে, তেমন কালোবাজারিরও অভিযোগ উঠেছে। বিজেপি সূত্রের বক্তব্য, এই সব ক’টা তির যে তাঁর দিকেই আসবে, মোদী তা জানেন। তাই ভোটের আগে বিহারের জন্য সওয়া লক্ষ কোটি টাকার প্যাকেজ ঘোষণা করেও তাঁর স্বস্তি নেই। লালু-নীতীশ-কংগ্রেস জোট পেঁয়াজ নিয়ে নেমে পড়েছে। ইতিহাস বলছে, পেঁয়াজের অগ্নিমূল্যের রাজনৈতিক খেসারত দেওয়ার নজির কিছু কম নেই।
হালফিলে বড় উদাহরণ দু’টি। নব্বইয়ের দশকের শেষ দিকে সুষমা স্বরাজ তখন দিল্লির মুখ্যমন্ত্রী। বিধানসভা ভোটের ঠিক আগে পেঁয়াজের দাম ১০ টাকা কেজি থেকে এক লাফে ৫০ টাকায় পৌঁছে যায়। পেঁয়াজের ঝাঁঝেই গদি ছাড়তে হয় সুষমাকে। আবার দু’বছর আগে দিল্লিতে ঠিক ভোটের মুখে একই ভাবে পেঁয়াজের দাম কাঁদিয়েছিল কংগ্রেসের তিন বারের মুখ্যমন্ত্রী শীলা দীক্ষিতকে। ২০ টাকা কেজি থেকে পেঁয়াজের দাম তখন পৌঁছে গিয়েছিল ৮০-৯০ টাকায়। এ বার তাই ঝুঁকি না নিয়ে দিল্লির শাসক দল আম আদমি পার্টি আগেভাগেই কেন্দ্রের উপরে দায় চাপিয়ে প্রশ্ন তুলেছে, পেঁয়াজের উৎপাদন মার খাবে দেখেও জুন-জুলাইয়ে রফতানি করা হল কেন?
গত সাত-আট বছর ধরে কিন্তু পেঁয়াজের উৎপাদন প্রায় দ্বিগুণ বেড়েছিল। ২০০৮ নাগাদ উৎপাদন ছিল বছরে নব্বই লক্ষ টনের মতো। এখন তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ২ কোটি টন। তবু দাম বাড়ছে কেন?
কৃষি মন্ত্রক বলছে, এর কারণ মহারাষ্ট্র, কর্নাটক, অন্ধ্র, তেলঙ্গনায় খরা। এই এলাকাতেই দেশের অর্ধেক পেঁয়াজ উৎপন্ন হয়। তা ছাড়া, মহারাষ্ট্রে অকাল বৃষ্টিতেও পেঁয়াজ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ফলে সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি যত পেঁয়াজ বাজারে আসার কথা ছিল, ততখানি আসবে না বলে আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। কৃষি মন্ত্রক সূত্রের বক্তব্য, মহারাষ্ট্র ও কর্নাটকে পেঁয়াজ যাঁরা চাষ করেন, তাঁদের সিংহভাগই ছোট বা মাঝারি চাষি। বাজার দর নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা এঁদের নেই। বাজারে একাধিপত্য চালায় কিছু পাইকার। এদেরই কব্জা করা যাচ্ছে না।
কংগ্রেস নেতাদের যুক্তি, প্রণববাবু অর্থমন্ত্রী থাকার সময় এক বার এই পাইকারদের বাড়িতে আয়কর বিভাগ তল্লাশি চালিয়েছিল। রাতারাতি তখন পেঁয়াজের দাম ৬০ শতাংশ কমে গিয়েছিল। তেমনই কোনও পদক্ষেপ করুক কেন্দ্র। কেন্দ্রীয় খাদ্য প্রক্রিয়াকরণ মন্ত্রী হরসিমরত কৌরের একটি মন্তব্য নিয়েও বিতর্ক উস্কে দিতে চাইছে কংগ্রেস। দু’দিন আগে হরসিমরত বলেছিলেন, ‘‘পেঁয়াজের দাম বাড়লে (প্যাকেট করা) পেঁয়াজ পাউডার ও পেঁয়াজ বাটা ব্যবহার করুন।’’ কংগ্রেস মুখপাত্র অজয় কুমারের কথায়, ‘‘বোঝা যাচ্ছে প্রধানমন্ত্রী এঁদের পরামর্শেই সরকার চালাচ্ছেন। ক’দিন বাদে পেঁয়াজ থাকবে শুধু শো-রুমে!’’