নাগরিকরা ‘সরকারের দাস’ নন, প্রতিবাদ করা নাগরিকের অধিকার। শুধু তার জন্য তাঁদের উপরে শাস্তির খাঁড়া নামানো ঠিক নয় বলে মন্তব্য করল আদালত। বম্বে হাই কোর্টের বিচারপতি মাধব জামদার বৃহস্পতিবার তাঁর মৌখিক পর্যবেক্ষণে এই মন্তব্য করেন।
সোশালিস্ট ডেমোক্র্যাটিক পার্টি অব ইন্ডিয়া-র সাধারণ সম্পাদক সইদ আহমদ আবদুল ওয়াহিদ চৌধরির শাস্তির মামলা শুনছিলেন বিচারপতি। কেন্দ্রীয় সরকারের বিভিন্ন সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে সক্রিয় ভাবে মিছিল ও ধর্নার আয়োজন করে আসছিলেন সইদ। নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন এবং জ্ঞানবাপী মসজিদ সংক্রান্ত বিতর্কও এর মধ্যে ছিল। সইদের বিরুদ্ধে পাঁচটি এফআইআর হয় এবং তার ভিত্তিতে মুম্বই পুলিশ তাঁকে এক বছরের জন্য এলাকাছাড়া হয়ে থাকার নির্দেশ দেয়।
এ দিন মামলার নথি পর্যালোচনা করে বিচারপতি জানতে চান, কী কারণে সইদকে এক বছরের জন্য এলাকাছাড়া করার কথা বলা হয়েছিল। এই প্রসঙ্গেই তিনি মৌখিক ভাবে বলেন, কোনও নাগরিক সরকারের সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করেছেন বলে পুলিশ তাঁকে নির্বাসিত করতে পারে না। বিচারপতি জামদার বলেন, ‘‘এটা কী হচ্ছে? দেশের সব নাগরিককে কি ভারতের সরকারের দাস বানিয়ে দেওয়া হয়েছে? তারা প্রতিবাদ করতে পারবে না, আন্দোলন করতে পারবে না— এ সব কী? এখন এত প্রশ্নপত্র ফাঁস হচ্ছে। মানুষ যদি প্রতিবাদ করে, তা হলে তাদের বিরুদ্ধে মামলা দেওয়া হবে? প্রতিবাদ করা নাগরিকদের অধিকার। আবেদনকারী তো শুধু ‘বিজেপি সরকার মুর্দাবাদ’, ‘অমিত শাহ মুর্দাবাদ’ ধরনের স্লোগানই দিয়েছেন। নাগরিকরা এমন স্লোগান দিতে পারবেন না কেন? এই সব স্লোগান দেওয়ার জন্য এলাকাছাড়া করার নির্দেশ কেন?’’
পুলিশের ভূমিকা নিয়ে কড়া প্রশ্ন তুলে বিচারপতি যোগ করেন, ‘‘পুলিশ মুখ্যমন্ত্রী বা প্রধানমন্ত্রীর চাকর নয়। তারা জনগণের সেবক।’’ এই মামলায় সংশ্লিষ্ট পুলিশ অফিসারদের উপরে মোটা অঙ্কের জরিমানা করার কথাও বলেন তিনি। লিখিত নির্দেশের বয়ান বলে দেওয়ার সময়েও বিচারপতি স্পষ্ট করে বলেন, সরকারের সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করা কোনও নাগরিককে এলাকাছাড়া করার কারণ হতে পারে না। সেটা সংবিধানপ্রদত্ত মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং মর্যাদার সঙ্গে বেঁচে থাকার মৌলিক অধিকারের উপরে আঘাত হানে। মামলাটির নিষ্পত্তি করে সইদের বিরুদ্ধে এলাকাছাড়া হওয়ার দু’-দু’টি নির্দেশই বিচারপতি খারিজ করে দেন। তাঁর লিখিত নির্দেশে স্পষ্ট বলা হয়েছে, ‘আবেদনকারী তাঁর নাগরিক দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে ভারত সরকারের কিছু সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে মিছিল ও ধর্নার আয়োজন করেছেন। শুধুমাত্র এই কারণে মহারাষ্ট্র পুলিশ আইনের অধীনে তাঁকে নির্বাসিত করা যায় না। তাঁর বিরুদ্ধে করা পদক্ষেপ বিদ্বেষপ্রসূত। কেবলমাত্র সরকারের কিছু সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করার কারণে আবেদনকারীর বিরুদ্ধে যে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে, তা তাঁর মৌলিক অধিকারকে ক্ষুণ্ণ করেছে।’
শুনানির সময়ে বিচারপতি জামদার মহারাষ্ট্রে দল বদলের হিড়িক এবং তথাকথিত ‘ঘোড়া কেনাবেচার’ প্রসঙ্গও উল্লেখ করে হালকা রসিকতার সুরে বলেন, ‘‘পরশু দিন ১০ বছরের একটি শিশু দুর্ঘটনায় মারা গেল। অথচ বিধানসভায় কী নিয়ে আলোচনা হচ্ছিল? এক জন প্রিসাইডিং অফিসার কী ভাবে নির্বাচিত হলেন এবং তিনি কী ভাবে অন্য দলে চলে গেলেন। এ সব কী হচ্ছে? আপনিও (সইদ) দল বদলে ফেলুন না! এখন তো পুরো মহারাষ্ট্রেই ঘোড়া কেনাবেচা চলছে। একটা ‘ওয়াশিং মেশিন’ তো আছেই!’’
এই খবরটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
5,148
1,999
429
169
(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)