ঝাড়খণ্ড, বিহারের পরে এ বার পশ্চিমবঙ্গ। কেন নির্বাচনমুখী রাজ্যে ঠিক ভোটের আগে ইডি বিরোধী রাজনৈতিক দলের বিরুদ্ধে তদন্তে তৎপর হয়, তা নিয়ে প্রশ্ন তুললেন রাজ্যসভার নির্দল সাংসদ কপিল সিব্বল। তাঁর মতে, “কেন্দ্রীয় এজেন্সির তদন্তের সীমা কতটা থাকা উচিত সেই আবেদন এ বার অন্তত শোনা উচিত সুপ্রিম কোর্টের। তা না হলে যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামো ভেঙে পড়তে বেশি দিন দেরি নেই।”
অন্য দিকে কেন সে দিন ইডির অফিসারেরা মুখ্যমন্ত্রীকে নথিপত্র নিয়ে যেতে বাধা দিলেন না, তা নিয়ে প্রশ্ন ওঠায় বিজেপির এক নেতার বক্তব্য, “তা হলে মমতা সে দিন ‘স্ট্রেচার’-এ করে বের হতেন। নাটক করতে আরও সুবিধা হত মুখ্যমন্ত্রীর।”
গত বৃহস্পতিবারের ইডি অভিযান ও তাতে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের হস্তক্ষেপ নিয়ে রাজনৈতিক তরজা চরমে। বিজেপি যেখানে স্বাধীনতা-উত্তর ভারতে এমন ঘটেনি বলে আক্রমণ শানিয়েছে, তখন বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলি একে কেন্দ্রীয় এজেন্সি দিয়ে বিরোধীদের মুখ বন্ধ করার চেষ্টা বলে সরব হয়েছে। আজ দিল্লিতে সাংবাদিক সম্মেলনে কংগ্রেসের প্রাক্তন নেতা কপিল সিব্বল বলেন, “সব দেখে মনে হচ্ছে, ইডির একমাত্র লক্ষ্য হল কী ভাবে বিরোধী দল ও বিরোধী নেতাদের হেনস্থা করা যায়।”
অতীতের উদাহরণ তুলে কপিল বলেন, “যে রাজ্যে নির্বাচন আসে, ইডি সেখানে পৌঁছে যায়। অতীতে ঝাড়খণ্ডের নির্বাচনের সময় হেমন্ত সোরেন, বিহারে ভোটের আগে লালুপ্রসাদ ও তেজস্বী যাদবের বিরুদ্ধে তৎপর হয়েছিল ইডি। এ বারে পশ্চিমবঙ্গে ভোটের দিন এগিয়ে আসতেই সেখানে তৎপর হয়েছে তারা। হঠাৎ তাদের মনে হয়েছে কয়লা দুর্নীতি নিয়ে নথি সংগ্রহ করতে হবে। এদের লক্ষ্য একটাই— কী ভাবে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে সমস্যায় ফেলা যায়।” তাঁর মতে, পরিস্থিতি যে দিকে এগোচ্ছে, তাতে সর্বঘটের তদন্ত এজেন্সিতে পরিণত হয়েছে ইডি। “যখন ইডি তৈরি হয়েছিল, তখন জানা ছিল না এই এজেন্সি যখন তখন, যেখানে সেখানে তদন্ত করতে যেতে পারে। কোথাও অভিযোগ দায়ের হলেই ইডি পৌঁছে যাচ্ছে। দেখে মনে হচ্ছে তাদের সব কিছু তদন্ত করে দেখার ক্ষমতা রয়েছে।” ওই তদন্ত সংস্থার এক্তিয়ার কতটা, তা নিয়ে সুপ্রিম কোর্টে শুনানি ঝুলে রয়েছে। সিব্বল বলেন, “সুপ্রিম কোর্টের বিষয়টি এ বার দেখা উচিত। তা না হলে যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামো ভেঙে পড়বে।”
তবে মমতার ভূমিকা নিয়ে গোড়ায় সরব হলেও, আপাতত মেপে পা ফেলার পক্ষপাতী বিজেপি কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব। দল ভাল করেই বুঝতে পারছে, মমতা সে দিন যে ভাবে হস্তক্ষেপ করেছেন, তাতে মুখ্যমন্ত্রীর বিরুদ্ধে কোনও পদক্ষেপ করা হলে তা আখেরে তৃণমূলকেই সুবিধা করে দেবে। রাজ্য বিজেপির এক নেতার ব্যাখ্যা, “এ ক্ষেত্রে প্রমাণ লোপাটের চেষ্টার অপরাধে মমতার বিরুদ্ধে অভিযোগ দায়ের ও পরবর্তী ধাপে আদালতের নির্দেশে তিনি যদি গ্রেফতার হন, তা হলে আমজনতার ভাবাবেগ তৃণমূলের পক্ষে চলে যাওয়ার পূর্ণ সম্ভাবনা রয়েছে। শহুরে ভোটার বিজেপিকে সমর্থন করলেও, গ্রামবাংলার ভোট গোটাটাই কব্জা করে নেবে তৃণমূল। ফলে বুঝে পা ফেলা প্রয়োজন। তাই মমতার হস্তক্ষেপকে রাজনৈতিক ভাবে কোন পথে ব্যবহার করা হবে, তার জন্য কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের নির্দেশের জন্য অপেক্ষা করছে রাজ্য নেতৃত্ব।
আইপ্যাকের কর্ণধার প্রতীক জৈনের বাড়ি ও দফতরে তল্লাশি শুরুর আগে ইডি আধিকারিকদের গোটা এলাকা নিশ্ছিদ্র করে নেওয়া উচিত ছিল বলেও মনে করছেন অনেকে। দাবি উঠেছে, কেন সে দিন মমতার প্রবেশে বাধা দেওয়া হল না কিংবা তিনি যখন নথিপত্র কেড়ে নিচ্ছিলেন, কেন তাঁকে ইডি বা আধাসেনার জওয়ানেরা আটকালেন না। রাজ্য বিজেপির এক নেতার কথায়, “আগের ভোটে হুইল চেয়ার পর্ব হয়েছিল।এ বারে তা হলে সহানুভূতি কুড়োতে কেন্দ্রীয় বাহিনী তাঁকে মারধর, শারীরিক নিগ্রহ করেছে বলে অভিযোগে সরব হতেন মমতা। এখন মানুষ অন্তত মুখ্যমন্ত্রীর আসল চেহারাটা দেখতে পেল যে, দুর্নীতিগ্রস্তদের বাঁচাতে তিনি কী ভাবে সক্রিয়।”
এই খবরটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
5,148
1,999
429
169
(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)