পুরনো বন্ধু কলকাতার এক গুজরাতি ব্যবসায়ীর বিপুল টাকা বিনিয়োগের ব্যবস্থা করতে পরশমল লোঢা মালয়েশিয়ায় যাচ্ছিলেন বলে ধারণা করছেন এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেট (ইডি)-এর তদন্তকারীরা। তার আগেই মুম্বই বিমানবন্দরে ধরা পড়ে যান তিনি।
ইডি-র এক অফিসারের দাবি, নতুন বছরের গোড়াতেই লগ্নি সংক্রান্ত এই বৈঠকটি করার কথা ছিল। তা চূড়ান্ত করতেই বড়দিনের ছুটিতে তিনি মুম্বই থেকে মালয়েশিয়া যাচ্ছিলেন। তার আগে মুম্বই থেকেই বেশ কয়েক বার কথাবার্তা সেরে নিয়েছিলেন তিনি। গোয়েন্দাদের দাবি, লোঢার ফোনের সিম ক্লোন করা ছিল। ফলে লোঢার সব কথাবার্তাই গোয়েন্দারা শুনছিলেন। দু’দিন আটক থাকার পর আপাতত তিনি ইডি-র হেফাজতে। ইডি সূত্রের খবর, কলকাতার ওই গুজরাতি ব্যবসায়ীও এখন ইডি-র নজরবন্দি। মালয়েশিয়ায় কালো টাকা পাঠানোর চক্রে ওই ব্যবসায়ীর ভূমিকা কী, তা খতিয়ে দেখাও শুরু হয়েছে।
ইডি-র এক কর্তার অভিযোগ, ‘‘দিন কয়েক আগে দিল্লির এক আইনি উপদেষ্টা সংস্থার কাছ থেকে নতুন নোটে যে ২৫ কোটি টাকা উদ্ধার হয়েছিল, তা আসলে লোঢার। তা জানার পর থেকেই লোঢাকে গ্রেফতার করার প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছিল।’’ ওই কর্তার মতে, ‘‘পরিস্থিতি কোন দিকে এগোচ্ছে তা সম্ভবত বুঝে গিয়েছিলেন লোঢা, তাই তড়িঘড়ি মালয়েশিয়া যাচ্ছিলেন তিনি।’’
তদন্তকারীদের একাংশের দাবি, এক শ্রেণির রাজনৈতিক নেতা, আমলার সঙ্গে বিভিন্ন শিল্পগোষ্ঠীর যোগাযোগ করিয়ে দিতেন লোঢা। ধরা পড়ার পরেই নিজের মোবাইল ফোন ও ল্যাপটপের নানা তথ্য মুছে ফেলেছেন তিনি। তদন্তকারী সংস্থার এক কর্তার কথায়, ‘‘আমাদের কাছে রিকভারি সফটওয়্যার রয়েছে। তা দিয়ে লোঢার ল্যাপটপ এবং ফোনের তথ্য জোগাড় করা হচ্ছে। সেখান থেকেই আরও বড় চক্রের সন্ধান পাওয়া যাবে।’’
ইডি-র একটি সূত্র জানাচ্ছেন, গত পাঁচ বছর ধরেই লোঢার উপর নজর রাখা হচ্ছিল। ইউপিএ জমানায় প্রশাসনের অলিন্দে তাঁর অবাধ গতিবিধি দেখে গোয়েন্দারা বিশেষ এগোতে সাহস করেননি। নোট বাতিলের পরে সেই পরিস্থিতি বদলায়। গোয়েন্দারা বুঝতে পারেন, লোঢার মতো ঘুঘুরাই এখন ঘোলা জলে মাছ ধরা শুরু করবেন। ২৪ ঘণ্টা তাঁর উপর নজরদারিতে জানা যায় পুরনো নোট নতুন করার চক্রে পুরোদস্তুর নেমে পড়েছেন তিনি। তাঁর কথোপকথনের সূত্রেই নয়ডার অ্যাক্সিস ব্যাঙ্ক এবং দিল্লির আইনি উপদেষ্টা সংস্থায় হানা দিয়ে বড় অঙ্কের টাকা ধরা পড়ে। তামিলনাডুতেও ধরা পড়ে বড় একটি চক্র।
তদন্তকারীদের দাবি, তাঁর বন্ধু কলকাতার ওই গুজরাতি ব্যবসায়ীকে লোঢাই মালয়েশিয়ার এক সরকারি লগ্নি তহবিলে বিনিয়োগের পরামর্শ দিয়েছিলেন। আবাসন, পরিকাঠামো, স্বাস্থ্য পরিষেবা, আর্থিক পরিষেবা, সংবাদ মাধ্যমের মতো বিভিন্ন ক্ষেত্রে প্রায় ৮০টি কোম্পানিতে বিনিয়োগ রয়েছে ওই লগ্নি-তহবিলের। নতুন ‘খাজানা’ তৈরি করে দেবেন বলে লোঢা তাঁর ওই ব্যবসায়ী বন্ধুকে আশ্বস্ত করেছিলেন বলে তদন্তকারীরা জেনেছেন। পরশমল ধরা পড়ার পরে তাঁর বন্ধুর ব্যবসা নিয়েও এখন কাটা-ছেঁড়া শুরু করেছেন গোয়েন্দারা।
ওয়াকিবহালরা বলছেন, গত দশ বছর কলকাতার কারবারে তেমন গুরুত্ব দিচ্ছিলেন না পরশমল। এই শহরে বেশ কয়েকটি বহুতলের মালিক লোঢা হঠাৎই ব্যবসা সরিয়ে নিয়ে যান চেন্নাই এবং দিল্লিতে। তবে এখানকার শিল্পপতি-ব্যবসায়ীদের সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ আগের মতোই ছিল। ইডি জানিয়েছে, দিল্লি এবং চেন্নাইয়ে থেকেও কলকাতার বেশ কয়েকটি বড় ডিলে মধ্যস্থ হিসেবে কাজ করেছেন লোঢা। তিহাড় জেলে বন্দি এক অর্থলগ্নি সংস্থার মালিকের জামিনের ব্যবস্থা করতেও তিনি সক্রিয় হয়েছিলেন। তবে ইডি-র দাবি— উঁচু মহলে যোগাযোগের মাধ্যমে তৈরি লোঢার নেটওয়ার্কে এ বার আর কাজে এল না।