১. মুখ্যমন্ত্রী হিসাবে কাকে দেখতে চান?
শোলাঙ্কি রায়: মিনাক্ষী মুখোপাধ্যায়কে মুখ্যমন্ত্রী হিসাবে দেখতে চাই! এ বার যত জন প্রার্থী আছেন, তাঁদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি লড়াকু। একেবারে মাটির মেয়ে। মিনাক্ষী আমাদের প্রজন্মের প্রতিনিধি। আমাদের সময়ের সমস্যাগুলিকে তুলে ধরেন বার বার। ক্লান্তিহীন লড়াই লড়তে পারেন তিনি। জিতবেন কি না জানি না, কিন্তু আশা করব, মিনাক্ষী নিজের যুদ্ধে টিকে থাকুন।
২. দল দেখে ভোট দেন না কি প্রার্থী দেখে?
শোলাঙ্কি: আমি আদর্শে বাঁচি। যে দল, যে প্রার্থী আমার আদর্শের সঙ্গে সহমত, আমি তাঁকে ভোট দিই। ব্যক্তিগত রাজনীতির ছাপ আমার সব সিদ্ধান্তে পড়ে। অনেক সময়ে দলের সঙ্গে আমার মতামত মেলে না। যদি আমার মতাদর্শের বিপরীতে থাকা প্রার্থী প্রাসঙ্গিক কথা বলেন, তা হলে তাঁকেই ভোট দেব।
৩. প্রার্থী বাছাইয়ের পরীক্ষা হলে কেমন হয়? আর জেতার পরে যদি হয় বিধায়কের প্রশিক্ষণ?
শোলাঙ্কি: প্রথমত, যে কোনও প্রার্থীর ন্যূনতম শিক্ষাগত যোগ্যতা থাকা দরকার। না হলে কখনওই কোনও সমস্যার সমাধান হবে না। দ্বিতীয়ত, রাজনীতি সম্পর্কে সম্যক জ্ঞান থাকা উচিত। মানুষের উপকার করতে চান বলাটা যথেষ্ট নয়। তা হলে তো দানধ্যান করলেই পারেন। রাজনীতি করার কী দরকার? রাজনীতি না করেও তো কত মানুষ নিঃস্বার্থ ভাবে অন্যের উপকার করেন! জেতার পরেও প্রশিক্ষণের প্রয়োজন। প্রত্যেক সরকারি কর্মচারীর মতো তাঁদেরও কাজ শিখে নিতে হবে।
৪. নিজে বিধায়ক হলে কী বদলাতে চাইতেন?
শোলাঙ্কি: যে খাতে টাকা ঢোকে, সে খাতেই যেন খরচ হয়। এটাই নিশ্চিত করতে চাই প্রথমে। আর দায় নেওয়া, জবাবদিহি করার অভ্যাস তৈরি করব। সেটা ক্ষমতাসীনদের মধ্যে দেখা যায় না।
৫. আপনার পেশার জগতের কোনও অভিযোগ কি ভোট প্রচারে গুরুত্ব পাওয়া দরকার?
শোলাঙ্কি: অভাব-অভিযোগ তো প্রচুর আছে। ইন্ডাস্ট্রি চলে কর্পোরেট কাঠামোর মতোই। কর্পোরেটদের মতো একই সমস্যার সম্মুখীন আমরাও হই। পারিশ্রমিক থেকে শুরু করে কাজের সময় ইত্যাদি সব বদলানো দরকার। শ্রম আইন মেনে চলা হয় না। আমাদের পেশায় সবচেয়ে বেশি লঙ্ঘন হয় এটাই। তবে এই মুহূর্তে দাঁড়িয়ে, এই নির্বাচনে ইন্ডাস্ট্রির উল্লেখ না থাকলেও চলবে। আগে মানুষের স্বাস্থ্য, শিক্ষা, খাদ্যের ব্যবস্থা হোক, ভেঙে পড়া রাস্তা ঠিক হোক, সকলের চাকরি হোক, এটাই চাই। নয়তো সবাই ধীরে ধীরে রাজ্যের বাইরে, দেশের বাইরে চলে যাবেন। সার্বিক ভাবে শ্রম আইন পোক্ত হলে, সব ক্ষেত্রের মানুষ উপকৃত হবে।
৬. নির্বাচন প্রক্রিয়াকে দুর্নীতিমুক্ত রাখতে পারে কী কী?
শোলাঙ্কি: (হেসে) যাঁরা দুর্নীতিমুক্ত রাখার চেষ্টা করতে পারেন, তাঁরাই দুর্নীতিতে গলা পর্যন্ত ডুবে রয়েছেন। তার বাইরে গণতন্ত্রের যে স্তম্ভগুলি আছে, অর্থাৎ গণমাধ্যম, বিচার বিভাগ এবং আইন বিভাগ— তাদের উপরে দায়িত্ব বর্তায়। তারা যদি রাজধর্ম পালন করে, তা হলেই দুর্নীতিমুক্ত রাখা যায়।
৭. ঘন ঘন দলবদলের বিরুদ্ধে কি ব্যবস্থা নেওয়া দরকার?
শোলাঙ্কি: প্রথমেই বাদ দিয়ে দেওয়া উচিত। পরবর্তী দলেরই তাঁকে আর গ্রহণ করা উচিত নয়। যে ব্যক্তি সকালে এক কথা বলেন, বিকেলে অন্য, তাঁর বক্তব্য বা মতাদর্শের দাম টাকার কাছে তা হলে খুবই নগন্য।
৮. রাজনীতিতে অপশব্দের প্রয়োগ কি জরুরি?
শোলাঙ্কি: ছোটবেলায় মা-বাবার কাছে গল্প শুনেছি, জ্যোতি বসু তাঁর বিপরীত দলের নেতৃত্ব ইন্দিরা গান্ধীকে চিরকাল ‘মিসেস গান্ধী’ বলে সম্বোধন করেছেন। পার্লামেন্টে যখন বিল পাশ হত, বিরোধী শিবিরের মানুষেরা একে অপরের সঙ্গে অত্যন্ত সম্মান দিয়ে কথা বলতেন মনে আছে। আর এখন? কোন ভাষায় কথা বলে লোকে? প্রত্যেকটা দলেই অপশব্দ প্রয়োগের প্রবণতা দেখতে পাই। আর সেটাকেই উদ্যাপন করতে দেখি। তাই জন্যই বলছিলাম, রাজনীতিতে শিক্ষার গুরুত্ব অপরিসীম।
৯. দেশজ সংস্কৃতি, উন্নয়ন না কি সমান অধিকার— ভোট প্রচারে কোনটা বেশি গুরুত্বপূর্ণ?
শোলাঙ্কি: যদি সকলের পেটে ভাত না জোটে, তা হলে কি সেটা উন্নয়ন? সমান অধিকার না পেলে কিছুই হবে না। সবাই না বাঁচলে দেশের সংস্কৃতিই বা বাঁচবে কেমন করে? দেশ তো আসলে মানুষকে নিয়েই। শুধু তো মানচিত্র নয়। দেশের সংজ্ঞাই পাল্টে দেওয়া হচ্ছে। এই ধরনের জাতীয়বাদের অর্থ কী, যেখানে মানুষেরই কোনও জায়গা নেই? কেউ বুঝিয়ে দিক আমাকে!
১০. ভাতা-র রাজনীতি সমাজের উন্নতি করে কি?
শোলাঙ্কি: ভাতা দিয়ে সরকারের হয়তো লাভ হয়, কিন্তু সাধারণের হয় না।
১১. প্রায় বিরোধীশূন্য রাজনীতি কি স্বাস্থ্যকর?
শোলাঙ্কি: বিরোধীশূন্য হয়ে যাওয়া মানেই তো একনায়কতন্ত্র জারি হয়ে গেল। কোনও সুস্থ, স্বাধীন দেশের জন্য এটা কাম্য নয়। আর গণতন্ত্রে তো আমরা কেউ কেউ বিরোধীকেও বেছে নিই। তাই বিরোধীদল থাকতেই হবে। তবেই না সরকার একটু সাবধান হবে!
১২. তারকারা কি ভোট টানার শর্টকাট?
শোলাঙ্কি: যে কেউ ভোটে দাঁড়াতে পারেন, যে কেউ রাজনীতির ময়দানে নামতে পারেন। সেটা তাঁদের ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত। কিন্তু সকলেরই ন্যূনতম রাজনৈতিক জ্ঞান থাকা উচিত। নয়তো রাজনীতি ছেলেখেলায় পরিণত হয়ে যাবে। অথচ একটা দেশ দাঁড়িয়েই থাকে রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের উপর। খুব গুরুত্বপূর্ণ এটা। সেটা বুঝে রাজনীতিতে যাওয়া উচিত।
১৩. পছন্দের রাজনীতিবিদ কে?
শোলাঙ্কি: বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য, সোমনাথ চট্টোপাধ্যায়, অটলবিহারী বাজপেয়ী, পণ্ডিত জওহরলাল নেহেরু, ইরানের এখনকার বিদেশমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি, রাজনীতিবিদ হিসেবে এঁদের খুবই সম্মান করি।