তাঁর অপ্রকাশিত স্মৃতিকথার অংশ নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্ক হয়েছে বিস্তর। এ বার তা নিয়ে মুখ খুলে প্রাক্তন সেনাপ্রধান জেনারেল মনোজমুকুন্দ নরবণে জানালেন, চিনকে লাদাখে এক ইঞ্চি জমিও ছাড়া হয়নি। আর সেনাকে রাজনীতির বাইরে রাখা উচিত। পাশাপাশি তাঁর বক্তব্য, ওই বিতর্ক তাঁর কাছে ‘বন্ধ হয়ে যাওয়া অধ্যায়।’
প্রাক্তন সেনাপ্রধানের স্মৃতিকথা ‘ফোর স্টারস অব ডেস্টিনি’ প্রতিরক্ষা মন্ত্রকের ছাড়পত্র পায়নি এখনও। কিন্তু তার কিছু অংশ প্রকাশিত হয় সংবাদমাধ্যমে। যা গত ফেব্রুয়ারি মাসে বাজেট অধিবেশনের প্রথম পর্বে সংসদে তুলে ধরে সরকারকে আক্রমণ করেন লোকসভার বিরোধী দলনেতা রাহুল গান্ধী। তিনি দাবি করেন, ২০২০ সালে লাদাখে চিনের সঙ্গে সংঘাতের সময়ে পূর্ব লাদাখে কৈলাস রেঞ্জের দিকে ট্যাঙ্ক নিয়ে এগোচ্ছিল চিনা সেনা। সেনাপ্রধান তা জানানোর পরেও প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী নাকি কোনও সিদ্ধান্ত নিতে পারেননি। সে কথা প্রাক্তন সেনাপ্রধানের বইতেই রয়েছে বলে দাবি করেন রাহুল। স্পিকার ওম বিড়লা লোকসভা কার্যবিধির কথা স্মরণ করিয়ে রাহুলকে পড়া থেকে বিরত হতে বলেন। বাধা দেন প্রতিরক্ষামন্ত্রী রাজনাথ সিংহ ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহও।
লোকসভায় এ নিয়ে সরকার ও বিরোধী পক্ষের তুমুল তরজা হয়। সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত নরবণের বইয়ের যে অংশ রাহুল পড়তে চেয়েছিলেন তাতে বলা হয়েছে, ‘‘রাজনাথ সিংহ (কৈলাস রেঞ্জের দিকে চিনা সেনার অগ্রগতি সম্পর্কে) বলেন যে, তিনি প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে কথা বলেছেন এবং এটি সম্পূর্ণ রূপে একটি সামরিক সিদ্ধান্ত। আমাকে বলা হয় যা উপযুক্ত মনে হয় তা করতে।....এই সম্পূর্ণ স্বাধীনতা পাওয়ার পরে এখন সম্পূর্ণ দায়িত্ব আমার উপরে। আমি একটি গভীর শ্বাস নিলাম ও কয়েক মিনিট চুপ করে বসে রইলাম।’’ রাহুল দাবি করেন, প্রধানমন্ত্রী নিজে সিদ্ধান্ত না নিয়ে সব দায় সেনাপ্রধানের উপরে চাপিয়ে দিয়েছিলেন।বিতর্কের সময়ে একটি বিবৃতি ছাড়া এ নিয়ে মুখ খোলেননি নরবণে। প্রাক্তন সেনাপ্রধানের দাবি, রাজনাথ তাঁকে যা বলেছিলেন তা সেনার উপরে সরকারের আস্থারই প্রমাণ। তাঁর কথায়, ‘‘চিনকে কোনও জমি ছাড়া হয়নি। সেটাই সত্য। কেউ যদি সেটা মানতে রাজি না হন তা হলে সেটা তাঁর বিষয়। যিনি কোনও বিষয় বিশ্বাস করতে চান না তাঁকে কোনও প্রমাণ দিয়েই সেই বিষয়টি বিশ্বাস করানো যাবে না।’’ তাঁর কথায়, ‘‘রাজনৈতিক নেতৃত্ব সরাসরি সামরিক বিষয়ে হস্তক্ষেপ করেন না। প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বাধীন কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভার নিরাপত্তা বিষয়ক কমিটি সিদ্ধান্ত নেয়। সেনায় সিদ্ধান্ত হয় সেনাপ্রধানের নির্দেশ মেনে। কেউ বারবার বলেন না যে, সেনাপ্রধান এই বলেছেন, সেনাপ্রধান ওই বলেছেন। কোনও কাজ হলে তা কার নির্দেশে হচ্ছে তা সকলে বোঝেন।’’
নরবণের বক্তব্য, ‘‘সশস্ত্র বাহিনীকে যত দূর সম্ভব রাজনীতি থেকে দূরে রাখা উচিত। ভারতীয় সশস্ত্র বাহিনী নিজেকে অরাজনৈতিক বলতে গর্ববোধ করে। আমাদের দেশের চারপাশে যা ঘটছে তাতে সেনার এই অবস্থানই আমাদের শক্তি। তাতেই আমাদের গণতন্ত্র শক্তিশালী হয়।’’ তবে নরবণের বক্তব্য, ‘‘প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তিকে গুলিয়ে ফেলা উচিত নয়। ব্যক্তিগত ভাবে কারও রাজনৈতিক মত থাকতে পারে। তিনি ভোটও দিতে পারেন।’’ তাঁর মতে, রাজনৈতিক বিতর্কের ফলে সেনার উপরে দেশবাসীর আস্থা কমার সম্ভাবনা খুবই কম। কারণ, সেনার সঙ্গে দেশবাসীর গভীর বন্ধন রয়েছে।
নরবণের দাবি, ২০২০ সালে লাদাখে কেন চিন আগ্রাসী হয়ে উঠেছিল তা স্পষ্ট হয়নি। কোভিড অতিমারি থেকে নজর ঘোরাতে বা জম্মু-কাশ্মীর ভেঙে দুই কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল জম্মু-কাশ্মীর ও লাদাখ তৈরি হওয়ার ফলে এই পদক্ষেপ করে থাকতে পারে বেজিং। তবে স্বল্পমেয়াদে পাকিস্তান চ্যালেঞ্জ হলেও দীর্ঘমেয়াদে চিনের উপরে নজর রাখা প্রয়োজন বলে মনে করেন তিনি। তাঁর কথায়, ‘‘১৯৫০-এর দশকে চিন একটি প্রস্তাব দেয়। তাতে বলা হয়েছিল ভারত আকসাই চিন এলাকার উপরে অধিকার ছাড়লে তারা অরুণাচল প্রদেশকে ভারতের অঙ্গ হিসেবে মেনে নেবে। সেই প্রস্তাবের সূত্র ধরে সীমান্ত বিবাদের সমাধান খোঁজা উচিত বলে আমার মনে হয়।’’
এই খবরটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
5,148
1,999
429
169
(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)