ইংরেজিতে বহুপ্রচলিত একটি প্রবাদ আছে, ‘টাইম ইজ় মানি।’ সীমিত আয়ুষ্কালে সময়কে যাঁরা ঠিক ভাবে কাজে লাগান, তাঁরাই অভীষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছোন, কারণ, সময় অত্যন্ত মূল্যবান। কিন্তু প্রিয়জনকে কতটা সময় দেবেন, কতটা সময় নিজের জন্য বরাদ্দ রাখবেন, কেউ কি তা লিখে রাখেন? সেই স্কুলবেলায় পরীক্ষার আগে পড়াশোনার জন্য রুটিন তৈরির মতো দৈনন্দিন হিসাব কষেন? কর্নাটকের বেঙ্গালুরু শহরে এমনই একজন যুবক রয়েছেন। যিনি জীবনখাতার প্রত্যেক পাতায় কাকে কতটুকু সময় দেবেন, কতটা সময় খরচ হল, সব লিখে রেখেছেন। সমাজমাধ্যমে ভাইরাল তাঁর মাইক্রোসফ্ট এক্সেল শিট।
এক্স (সাবেক টুইটার) অ্যাকাউন্টে তাঁর নাম পঙ্কজ। তিনি নিজের জন্য ‘কাস্টোমার রিলেশনসিপ ম্যানেজমেন্ট’ (সিআরএম)-এর আদলে একটি ‘সিস্টেম’ তৈরি করেছেন। নাম দিয়েছেন ‘জিয়া।’ এই ব্যক্তিগত সিআরএমে দৈনন্দিন মানুষের সাক্ষাৎ, কথোপকথন ইত্যাদি লিখে রাখেন। প্রতি দিন এ ভাবে নিজের অনুভূতি ‘ট্র্যাক’ করেন পঙ্কজ। কেন?
এক্স পোস্টে পঙ্কজ লিখেছেন, ‘‘আমি আক্ষরিক অর্থেই বন্ধুত্বের পরিমাণ নির্ণয় করি। যদি কারও আরওআই (রিটার্ন অফ ইনভেস্টমেন্ট) দীর্ঘ সময় ধরে নেতিবাচক থাকে, তা হলে আমি তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ বন্ধ করে দিই।’’ অর্থাৎ, মানুষের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে সময় বিনিয়োগ করেন। তাতে মনের লাভ কিছু না-হলে, চটজলদি নিজেকে সরিয়ে নেন। এমনকি, প্রেমিকার সঙ্গে গত ছ’বছরে তাঁর কথাবার্তা কী ভাবে এগিয়েছে, হাসি-কান্না, রাগ-অভিমান সব কিছু লেখা আছে এক্সেল শিটে!
পঙ্কজ বলছেন, তিনি জানেন তাঁর এই হিসাব নিয়ে অনেকে ঠাট্টা করতে পারেন। কেউ তাঁকে ‘অসুস্থ’ বলে ভাবতে পারেন। তিনি পরোয়া করেন না। লিখেছেন, ‘‘অনেকে বলেছেন, মানুষের সঙ্গে সময়ের লেনদেনের হিসাব করছি আমি। কিন্তু আমার মনে হয়, জীবনে তো অসীম সময় নেই। তাই ভান না-করে বাঁচতে হবে। আমি কাউকে বোঝানোর চেষ্টা করছি না। আমি কেবল আমার পরিসংখ্যানে নতুন বন্ধুত্ব তৈরি বিষয়ে একটি তথ্য দেখাচ্ছি।’’এক্সেল শিটের ছবি দিয়ে পঙ্কজ দেখিয়েছেন, তাঁর ‘সম্ভাব্য জীবনসঙ্গী’ এবং বন্ধুবান্ধবদের জন্য তৈরি একটি টেবল। সেখানে রয়েছে, কী ভাবে, কোথায় কার সঙ্গে দেখা হয়েছে, কত ঘণ্টা বা কত মিনিট কথা বলেছেন, আড্ডা দিয়েছেন ইত্যাদি। সেই সম্পর্ক এখন কোন জায়গায় দাঁড়িয়ে এবং কী ভাবে তা এগিয়েছে, তারও দীর্ঘ হিসাব রেখেছেন। তাঁর দাবি ‘অর্থপূর্ণ’ সম্পর্কের জন্য হিসাব রাখা জরুরি। একটি হিসাবে রয়েছে, মানুষের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তুলতে মোটামুটি ৮-১২ ঘণ্টা ব্যয় করেন তিনি। সম্পর্কের ভিত পোক্ত করতে, নিজেদের মধ্যে আস্থা স্থাপন করতে ৩ থেকে ৬ মাস সময় নেন। তবে পঙ্কজের দাবি, বেশির ভাগ মানুষ ওই পর্যায় অতিক্রম করতে পারেন না। যদি ওই পর্যায় পেরোয়, তখন সম্পর্কের গভীর স্তরে পৌঁছোতে আর ৮০-১২০ ঘণ্টা দেন।
এর পর আসছে সম্পর্ক রক্ষণাবেক্ষণের বার্ষিক হিসাব। এটা আরও বেশি চমকপ্রদ। যাঁদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রয়েছে, তাঁদের এক একজনের সঙ্গে ৩০-৪০ ঘণ্টা ব্যয় করেছেন পঙ্কজ। প্রিয়জনের জন্মদিন, অনুষ্ঠান উদ্যাপন, কারও কাজে তাঁকে সহায়তা করার জন্য দিয়েছেন ১২-১৫ ঘণ্টা। জীবনে নতুন কোনও অধ্যায়ের শুরু, গুরুত্বপূর্ণ কোনও কাজ করেছেন মোটামুটি ৭ ঘণ্টায়। তাঁর দেওয়া হিসাব অনুযায়ী, গত ৬ বছরে বন্ধুদের সঙ্গে কাটিয়েছেন ৩৫৪ ঘণ্টা।
একটা সময়ে তিনি বুঝতে পেরেছিলেন যে, তিনি যাঁদের বন্ধু বলে মনে করেন, তাদের মধ্যে মাত্র ছ’জন তাকে ঠিক ভাবে বোঝেন এবং চেনেন। সেই আবেগের ‘ব্যান্ডউইথ’ মূল্যায়ন করেছেন এক্সেল শিটে।
‘জীবনখাতা’র পাতার পর পাতা ভরিয়ে পঙ্কজের উপলব্ধি, ‘‘গত ছ’ বছর ধরে এই বিষয়টি অনুসরণ করার পরে আমি এমন কিছু বুঝতে পেরেছি, যা একসময় আমি শুনতে অপছন্দ করতাম। যেমন আপনার জীবন থেকে ক্রমাগত মানুষকে সরিয়ে দেওয়া বাধ্যতামূলক। আপনি তাঁদের ঘৃণা করেন বা তাঁরা কিছু ভুল করেছেন বলে নয়। সরিয়ে দেওয়া বা সরে আসার কারণ হল প্রত্যেকটি সম্পর্কের একটি নির্দিষ্ট ক্ষমতা রয়েছে। তার বেশি সেখান থেকে প্রাপ্তির প্রত্যাশা করাই ভুল।’’ পঙ্কজ আরও লেখেন, ‘‘আমি পাঁচ থেকে আটটি গভীর সম্পর্ক এবং ১০-১২টি অর্থপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখতে পারি। মানুষ এ ভাবেই কাজ করে। জীবনে নতুন মানুষ যুক্ত হতে থাকেন। একই ভাবে কাউকে না কাউকে বাইরে ঠেলে দিতে হয়। অথবা সেই সম্পর্ক ক্ষীণ হতে থাকে।’’
আরও পড়ুন:
সব মিলিয়ে পঙ্কজের এখন চার জন ঘনিষ্ঠ বন্ধু। এঁদের তিনি ৮ থেকে ১২ বছর ধরে চেনেন। তাঁদের সঙ্গে প্রায় ৪০০ ঘণ্টা সময় কাটিয়েছেন।
পঙ্কজের টিপ্স, ২৫ বছর বয়সে এসে যদি কারও সঙ্গে দেখা হয়, ভাল লাগে এবং যোগাযোগ রাখতে চান, তাহলে সম্পর্ক ‘রক্ষণাবেক্ষণে’ প্রতি বছর ৫০ ঘণ্টা দেওয়াই যথেষ্ট। দু’জন মানুষের মনের গভীরতা মিলতে মিলতে ৫ বছর লাগে। তার পরেও সেই সম্পর্ক ব্যর্থ হওয়ার সম্ভাবনা প্রায় ৭০ শতাংশ!
তবে পঙ্কজ নিজের ক্ষেত্রে তাঁর ২৩ বছর বয়সের পর বন্ধুতালিকায় নয়া সংযোজন বন্ধ করে দিয়েছেন। লিখেছেন, ‘‘আমি অসামাজিক নই, গণিত এটা সমর্থন করে না। পরিবর্তে, আমি ঘনিষ্ঠ সম্পর্কগুলির উপর, আমার দক্ষতার উপর, আমার স্বাস্থ্যের উপর এবং জীবনের আরও জটিল জিনিসগুলিতে বিনিয়োগ করি।’’