শুধুমাত্র সাবান-জল দিয়ে হাত ধোয়ার অভ্যাস আটকে দিতে পারে ভাইরাস, ব্যাক্টিরিয়াজনিত বহু সংক্রমণ। শ্বাসযন্ত্রের কোনও সংক্রমণ বা ইনফ্লুয়েঞ্জার মতো অসুখও সাধারণ হাত ধোয়ার মাধ্যমেই ঠেকানো সম্ভব বলে জানিয়েছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (হু)। যে কারণে ২০০৯ সালে হু-র তরফে ‘হ্যান্ড হাইজিন অ্যান্ড হেলথকেয়ার’-এর নিয়মাবলী প্রকাশ করা হয়েছিল। কোভিড-১৯ পরিস্থিতিতে নির্দিষ্ট সময় অন্তর হাত ধোয়া এবং পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন থাকাকে অভ্যাসে পরিণত করতে বলছেন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ-বিজ্ঞানীরাও। ঘটনাচক্রে, মঙ্গলবারই ছিল ‘হ্যান্ড হাইজিন’ দিবস। হু এ দিনও জানিয়েছে, পরিষ্কার হাত কোভিড-১৯-সহ যে কোনও প্যাথোজেনের সংক্রমণও দূরে রাখতে পারবে।
কিন্তু এই পরিস্থিতিতে আরও একটি বিপরীত চিত্রও উঠে এসেছে। তা হল, হাত ধোয়া, পরিষ্কার থাকাকে মাধ্যম করেই জনসংখ্যার একটা বড় অংশ বর্তমানে ‘জার্মোফোবিয়া’, অর্থাৎ ব্যাক্টিরিয়া, ভাইরাস-সহ যে কোনও প্যাথোজেনজনিত সংক্রমণের আতঙ্কে ভোগা শুরু করেছে বলে জানাচ্ছেন মনোবিদদের একাংশ। তাঁদের বক্তব্য, এই ‘জার্মোফোবিয়া’ (মাইসোফোবিয়া নামেও যা পরিচিত) নতুন কিছু নয়। সাধারণ সময়েই অনেকে বারংবার হাতে জল দেন। যা এক সময় ‘অবসেসিভ কম্পালসিভ ডিসঅর্ডার’-এ (ওসিডি) পরিণত হয়। বর্তমানে সেই সংখ্যাটাই বহু গুণে বেড়ে গিয়েছে। ‘সংক্রমিত হব না তো!’ —এই ভয় তাড়া করছে সকলকে। ফলে সাধারণ স্বাস্থ্য-সচেতনতাও ‘প্যানিক’-এর পর্যায়ে চলে গিয়েছে। সে কারণে ‘জার্মোফোবিয়া’ জনমানসে দীর্ঘস্থায়ী হতে চলেছে কি না, তা নিয়ে চর্চা শুরু হয়েছে চিকিৎসক-মনোবিদদের মধ্যে।
ওড়িশার এস সি বি মেডিক্যাল কলেজের মানসিক চিকিৎসার উৎকর্ষ কেন্দ্র ‘মেন্টাল হেলথ ইনস্টিটিউট’-এর ক্লিনিক্যাল সাইকোলজি বিভাগের প্রধান যশোবন্ত মহাপাত্রের মতে, ‘‘এই সমস্যা সাময়িক বলেই মনে হয়। কারণ, এই পরিস্থিতি আগে কখনও তৈরি হয়নি। ফলে তার সার্বিক প্রভাবও জনমানসের উপরে পড়েনি। করোনা সংক্রমণ থামলে এই আতঙ্কের মাত্রাও কমে যাবে।’’ মনোবিদেরা এ ক্ষেত্রে ‘জার্মোফোবিয়া’-র ইতিহাসের প্রসঙ্গ টেনে আনছেন। ইতিহাস বলছে, ‘জার্মোফোবিয়া’ শব্দটি প্রথম ব্যবহার করেছিলেন আমেরিকার চিকিৎসক-নিউরোলজিস্ট উইলিয়াম এ হ্যামন্ড, ১৮৭৯ সালে। তিনি তাঁর রোগীদের কয়েক জনের মধ্যে বারবার হাত ধোয়ার প্রবণতা ও তার মানসিক প্রভাব নিয়ে পর্যালোচনার পরে ওই শব্দটি ব্যবহার করেন। হায়দরাবাদের ‘ক্লিনিক্যাল সাইকোলজি ইনস্টিটিউট অব মেন্টাল হেলথ’-এর অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক ভাস্কর নায়ডু বলেন, ‘‘সুনামি, ভূমিকম্প বা বন্যা-সহ সব রকম বিপর্যয়ের পরেই সংশ্লিষ্ট অঞ্চলের জনগোষ্ঠীর মধ্যে সেই সংক্রান্ত মানসিক আঘাতের রেশ রয়ে যায়। কোভিড-১৯ সংক্রমণ সারা বিশ্বে ছড়িয়েছে বলে আতঙ্কের মাত্রাও এ ক্ষেত্রে অনেকটাই বেশি। তবে এটা দীর্ঘস্থায়ী হবে বলে মনে হয় না।’’
আরও পড়ুন: কোয়রান্টিন কেন্দ্র দেরিতে, শহরে জাঁকিয়ে বসেছে করোনা?
ইউনিসেফের তথ্য বলছে, নিউমোনিয়া ও ডায়েরিয়ায় বিশ্বে প্রতি বছর প্রায় ১ কোটি ৪০ লক্ষ বাচ্চা মারা যায়। অথচ শুধুমাত্র পরিষ্কার জলে হাত ধোয়ার মাধ্যমে প্রতিদিন গড়ে ৮০০ শিশুমৃত্যু আটকানো যেতে পারে। সে প্রসঙ্গের উল্লেখ করে মনোবিদেরা জানাচ্ছেন, সুস্থ জীবনযাপনের জন্য হাত ধোয়া, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন থাকার ভূমিকা অনস্বীকার্য। কিন্তু তা মাত্রাতিরিক্ত হয়ে গেলে এবং এক সময়ে মানসিক রোগে পরিণত হলে তখনই সমস্যার সূত্রপাত হয়। ‘ইন্ডিয়ান অ্যাসোসিয়েশন অব ক্লিনিক্যাল সাইকোলজিস্টস’-এর (আইএসিপি) সাম্মানিক সেক্রেটারি জেনারেল মনোজ কে বজাজ বলেন, ‘‘বর্তমান পরিস্থিতি দেখে মনে হচ্ছে, সংক্রমণ থামার পরেও জনসংখ্যার একটা বড় অংশ এই আতঙ্কে ভুগবেন। অভিভাবকেরাও বাচ্চাদের হাত ধোয়া, পরিচ্ছন্নতার উপরে জোর দেবেন। সবই ঠিক আছে। কিন্তু এ ক্ষেত্রে সতর্কতাও প্রয়োজন। এ জন্য ওসিডি রোগীর সংখ্যা যেন বেড়ে না যায়।’’ কোভিড-১৯ সংক্রান্ত মানসিক বিপর্যয়ের কাউন্সেলিংয়ের জন্য আইএসিপি গঠিত বিশেষ ‘ডিজাস্টার ম্যানেজমেন্ট টাস্ক ফোর্স’-এর সদস্য তথা কলকাতায় মানসিক চিকিৎসার উৎকর্ষ কেন্দ্র ‘ইনস্টিটিউট অব সাইকায়াট্রি’-র ‘ক্লিনিক্যাল সাইকোলজি’ বিভাগের অধ্যাপক প্রশান্তকুমার রায় বলেন, ‘‘সংক্রমণ এড়াতে, নিজেকে সুরক্ষিত রাখতে ন্যূনতম একটা ভয়, সচেতনতা থাকা ভাল। কিন্তু ভয়ের মাত্রা বেশি হয়ে যদি কারও স্বাভাবিক জীবনযাপন ব্যাহত করে, কেউ যদি সেই সংক্রমণের চিন্তা থেকে বেরোতে না পারেন অথবা সামাজিক সম্পর্কের ক্ষেত্রেও বাধা সৃষ্টি হয়, তা হলে সেটা মানসিক রোগ হিসেবেই গণ্য হবে। সেটা নিঃসন্দেহে চিন্তার।’’
আরও পড়ুন: সংক্রমণ বাড়ছে স্বাস্থ্যকর্মীদের, সর্বত্রই ধাক্কা খাচ্ছে পরিষেবা
(অভূতপূর্ব পরিস্থিতি। স্বভাবতই আপনি নানান ঘটনার সাক্ষী। শেয়ার করুন আমাদের। ঘটনার বিবরণ, ছবি, ভিডিয়ো আমাদের ইমেলে পাঠিয়ে দিন, feedback@abpdigital.in ঠিকানায়। কোন এলাকা, কোন দিন, কোন সময়ের ঘটনা তা জানাতে ভুলবেন না। আপনার নাম এবং ফোন নম্বর অবশ্যই দেবেন। আপনার পাঠানো খবরটি বিবেচিত হলে তা প্রকাশ করা হবে আমাদের ওয়েবসাইটে।)