তাঁর নতুন গুরুর নাম জানালেন নরেন্দ্র মোদী।
আরএসএসের তাত্ত্বিক নেতা নন। হাল আমলের গেরুয়াধারী বাবাও নন। প্রধানমন্ত্রীর এই নতুন গুরুর নাম গুগল-গুরু। চলতে ফিরতে যে কোনও তথ্য জানতে বা রাস্তা খুঁজতে সকলেই গুগলের শরণাপন্ন। তিনিও যে ব্যতিক্রম নন, তা স্বীকার করে মোদীর যুক্তি, যিনি মার্গদর্শন করান, তিনিই তো গুরু।
বৃহস্পতিবার দেশের আয়কর ও শুল্ক অফিসারদের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী বৈঠকে বসেছিলেন। সেখানে অবশ্য নিজেই গুরুদেব-এর মতোপাঁচ মন্ত্র দিয়েছেন। বলেছেন, আয়করদাতাদের মন থেকে হেনস্থার আতঙ্ক সরাতে হবে। তাঁদের বন্ধু হয়ে, ভালবেসে কর আদায় করতে হবে। সেই পথেই আয়করদাতার সংখ্যাটা দ্বিগুণ করে তুলতে হবে। মোদীর বক্তব্য, তিনি এমন ব্যবস্থা চান, যেখানে যত সহজে কর মেটানো যাবে, ততটাই কঠিন হবে ফাঁকি দেওয়া। কেন এ কথা বলছেন, তা বুঝতে গুগল-গুরুর দরবারে যাওয়ার পরামর্শ দেন মোদী। বলেন, ‘‘গুগল-গুরুর কাছে জানতে চান, এ দেশে কী ভাবে কর মেটানো যায়? ৭ কোটি উত্তর আসবে। এ বার জানতে চান, কী ভাবে কর না মিটিয়ে থাকা যায়? ১২ কোটি জবাব মিলবে।’’
প্রশ্ন অবশ্য উঠছে মোদীর দরবারেই। আয়কর দফতরের এক অফিসার প্রধানমন্ত্রীকে বলেন, তাঁরা নিজেদের ভূমিকা নিয়েই বিভ্রান্ত হয়ে পড়ছেন। কর ফাঁকি দেওয়া কালো টাকার মালিকদের পিছনে ছুটবেন না কি আয়করদাতাদের বন্ধু হবেন! মোদীর জবাব, একটি করতে গিয়ে আর একটিকে বাদ দিলে চলবে না। জোড়া কৌশলেই আয়করদাতার সংখ্যা ১০ কোটিতে নিয়ে যেতে হবে।
মোদী এই লক্ষ্যমাত্রা বেঁধে দেওয়ার পর সকলের মনেই প্রশ্ন উঠেছে, কী ভাবে? ২০১২-১৩ সালের চূড়ান্ত হিসেব অনুযায়ী দেশের মোট ১ কোটি ২০ লক্ষ মানুষ আয়কর মিটিয়ে ছিলেন। রাজস্ব দফতরের সাম্প্রতিক হিসেব অনুযায়ী, গত বছরে দেশের মাত্র ৫.৪৩ কোটি মানুষ আয়কর মিটিয়েছেন। যদিও রিটার্ন ফাইলের চূড়ান্ত হিসেব শেষ হলে দেখা যাবে, আসলে কর বসেছে এর অনেক কম সংখ্যক মানুষের উপর। প্রধানমন্ত্রী আজ ১০ কোটি মানুষকে আয়করের আওতায় আনার কথা বললেও এর ব্যাখ্যা দেননি। ফলে প্রশ্ন উঠেছে, মোদী সরকার কি আয়কর ছাড়ের সীমা কমাতে চাইছে? না কি এখনও যাঁদের কোনও আয়কর দিতে হয় না, তাঁদের উপর স্বল্প হারে কর বসাতে চাইছে? আয়করদাতার সংখ্যা ১০ কোটি করার জন্য সময়সীমাও নির্দিষ্ট করে দেননি মোদী।
তবে প্রধানমন্ত্রী যুক্তি দিয়েছেন, আয়কর বাবদ এখন যে রাজস্ব আদায় হয়, তার ৯২ শতাংশ কর চাকুরিজীবীদের বেতন থেকে বা আয়ের উৎস থেকে আগেই কেটে নেওয়া হয়। মাত্র ৮ শতাংশ কর পরে আয়ের পরীক্ষানিরীক্ষার পর আদায় হয়। তার জন্য ৪২ হাজার আয়কর অফিসারের বিরাট বাহিনী রয়েছে। তবে কৃষি থেকে আয়ের উপর কর বসানোর যে ভাবনা নেই, তা স্পষ্ট করে দিয়েছেন অর্থ মন্ত্রকের প্রতিমন্ত্রী জয়ন্ত সিন্হা। তাঁর ব্যাখ্যা, দেশে প্রায় ২৫ কোটি পরিবার রয়েছে। তার মধ্যে ১৫ কোটির আয় কৃষি থেকে আসে। তাদের বাদ দিলেও আরও ১০ কোটি পরিবার রয়েছে। যাদের করের আওতায় নিয়ে আসা সম্ভব।
পরিচিত ছক ভেঙে বেরিয়ে এ বছর আয়কর ও শুল্ক অফিসারদের একত্রে ‘রাজস্ব জ্ঞানসঙ্গম’ নামের সম্মেলনে ডাকা হয়েছিল। এই ধরনের সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রীর উপস্থিতিও এ বারই প্রথম। সেখানেও ছক ভেঙে মোদী আগে বক্তৃতার পথে হাঁটেননি। উল্টে অফিসারদের বলেছেন, প্রশ্ন করুন, ‘আউট অফ বক্স’ পরামর্শ দিন। মোদীর নির্দেশেই সম্মেলনে সংবাদমাধ্যমের প্রবেশাধিকার ছিল না। অফিসাররা যাতে মন খুলে কথা বলতে পারেন, সেই সুযোগই দিতে চেয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। আজ ১৫ জন অফিসার মোদীকে প্রশ্ন করেছেন, পরামর্শও দিয়েছেন। এঁদের অনেকেই কমবয়সী। একজন বলেছেন, করদাতাদের সুবিধার জন্য আইন তৈরি হোক। কারও অনুযোগ, করদাতাদের সঙ্গে ই-মেলে যোগাযোগ হচ্ছে। অথচ কর বিভাগে নিজেদের মধ্যে যোগাযোগ করতে আদ্দিকালের মতো চিঠি চালাচালি চলছে। প্রধানমন্ত্রী এক ঘণ্টার বক্তৃতায় বলেছেন, অফিসাররা সমস্যা জানেন। সমাধান খুঁজে বের করার ক্ষমতাও রয়েছে। আসল হল ‘জ্ঞানসঙ্গম’ থেকে নিজেদের ‘কর্মসঙ্গম’-এ নিয়ে যাওয়া। অর্থাৎ, সমাধান বের করে কাজে নেমে পড়া। কিন্তু হঠাৎ কেন কর নিয়ে সক্রিয় মোদী? অর্থ মন্ত্রকের কর্তাদের ব্যাখ্যা, সরকার রাজস্ব ঘাটতি মেটাতে প্রতি বছর বেশি পরিমাণে রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা বেঁধে দেয়। লক্ষ্যমাত্রা ছুঁতে অতিসক্রিয় অফিসাররা কর ফাঁকি ধরতে ব্যস্ত হয়ে পড়েন। ফল মামলা-মোকদ্দমা।
২০১৪-’১৫-র হিসেব বলছে, প্রায় সাড়ে ছয় লক্ষ কোটি রাজস্ব আয়কর মামলায় আটকে রয়েছে। এই ব্যবস্থাটাই ভাঙতে চাইছেন মোদী। আজ তাই ট্যাক্স-গুরুর মতো মোদীর উপদেশ, দেশের মানুষ অসৎ নয়। অধিকাংশই কর ফাঁকি দিতে চায় না। তবে কর জমার প্রক্রিয়া সহজ করতে হবে।