একদিকে নরেন্দ্র মোদী সরকার বলছে, এ বার রেকর্ড পরিমাণ গম উঠবে খেত থেকে। আবার সেই সরকারই বিদেশ থেকে সস্তায় গম আমদানি করতে শুল্ক তুলে নিয়েছে।
হঠাৎ করে এই সিদ্ধান্তের পিছনে দুর্নীতির গন্ধ পাচ্ছেন বিরোধীরা। অভিযোগ উঠেছে, সরকারের ঘনিষ্ঠ শিল্পপতি ও বহুজাতিক সংস্থাগুলির একাংশকে ফায়দা পাইয়ে দিতেই শুল্ক তুলে নেওয়া হয়েছে। ঝড় উঠেছে শাসক শিবিরের অন্দরমহলেও। সঙ্ঘ-পরিবারের কৃষক সংগঠন, ভারতীয় কিষাণ সঙ্ঘ মোদীকে চিঠি লিখে এই সিদ্ধান্তের পিছনে কী উদ্দেশ্য রয়েছে, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। এমনকী, প্রশ্ন সরকারের ভিতরেও। কৃষি মন্ত্রকের কর্তাদের অনেকের ক্ষোভ, তাঁদের অন্ধকারে রেখে সিদ্ধান্ত নিয়েছে অর্থ মন্ত্রক, বাণিজ্য মন্ত্রক ও খাদ্য মন্ত্রক।
এত দিন গম আমদানিতে ১০ শতাংশ শুল্ক চাপত। সংসদের শীতকালীন অধিবেশনের মধ্যেই সেই শুল্ক কমিয়ে শূন্যে নামিয়ে আনে সরকার। ভারতীয় কিষাণ সঙ্ঘের জাতীয় সচিব বদ্রীনারায়ণ চৌধুরী বলেন, ‘‘সিদ্ধান্তের সময় ও উদ্দেশ্য— দু’টি নিয়েই আমাদের সন্দেহ রয়েছে। শীতের ফসল উঠতে দু-তিন মাস বাকি। আদৌ গমের ঘাটতি হবে কি না, তা-ই স্পষ্ট নয়।’’
সঙ্ঘ-পরিবারের সন্দেহই খোলসা করে বলছেন বিরোধীরা। বিরোধীদের অভিযোগে উঠে এসেছে মোদীর ঘনিষ্ঠতম শিল্পপতি বলে পরিচিত গৌতম আদানির একটি সংস্থার নাম। সিপিএমের কৃষক সভার সাধারণ সম্পাদক হান্নান মোল্লা বলেন, ‘‘আদানি-উইলমার, রিলায়েন্স, আইটিসি, কারগিলের মতো গোষ্ঠীগুলি লাভবান হবে। আমেরিকা, অস্ট্রেলিয়া, ফ্রান্স, রাশিয়া, ইউক্রেনের মতো দেশগুলি থেকে সস্তায় গম নিয়ে মুনাফা কুড়োবে কৃষি-পণ্য ব্যবসায়ীরা।’’
ইতিমধ্যেই আমদানিকারী সংস্থাগুলি এপ্রিল থেকে ৩০ লক্ষ টন গম আমদানি করেছে বা আমদানির চুক্তি সই করেছে। শুল্ক তুলে নেওয়ায় আমদানি ৫০ লক্ষ টন ছুঁতে পারে। এক দশকে এত গম আমদানি হয়নি। অথচ ২০০৬ থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত গম আমদানিতে কোনও শুল্কই ছিল না। গত বছর অগস্টে বিশ্বের বাজারে গমের দাম অনেক কমে যাওয়ায় ১০ শতাংশ আমদানি শুল্ক বসানো হয়। দু’মাস পরে তা ২৫ শতাংশ করা হয়। এতে সাধারণ মানুষকেই বেশি দাম গুণতে হচ্ছে বলে দাবি করছিলেন কৃষিপণ্য সংস্থাগুলির কর্ণধাররা। শুল্ক তুলে নেওয়ার দাবি করছিলেন তাঁরা। সেপ্টেম্বরে আমদানি শুল্কের হার ২৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১০ শতাংশ করা হয়। এ বার তা একেবারে তুলে নেওয়া হল।
কৃষি মন্ত্রকের একটি সূত্রের বক্তব্য, গত বছর যে সময় আমদানি শুল্ক বসানো শুরু হয়, তখন বিশ্ব বাজারে গমের মূল্য যা ছিল, এখন দাম তার থেকেও কম। গম আমদানি হলে তা দেশে কুইন্ট্যাল প্রতি কৃষকদের ন্যূনতম সহায়ক মূল্যের তুলনায় ৫০ থেকে ২০০ টাকা সস্তা পড়বে। তা সত্ত্বেও আমদানি শুল্ক কেন তুলে নেওয়া হল, সেই প্রশ্ন তুলছেন বিরোধীরা।
ব্যবসায়ী ও শিল্প সংস্থাগুলি রাজনীতির লড়াইয়ে জড়াতে চাইছে না। তাঁদের যুক্তি, ব্যবসায়ীরা বরাবরই শুল্ক কমানো-বাড়ানোর দাবি তুলে থাকেন। এর সঙ্গে দুর্নীতির সম্পর্ক নেই। সরকারের হয়ে সিদ্ধান্তের পক্ষে মুখ খুলছেন খাদ্যমন্ত্রী রামবিলাস পাসোয়ান। তাঁর যুক্তি, ‘‘দেশে গমের অভাব নেই। কিন্তু গত কয়েক সপ্তাহে বাজারে গমের দাম বাড়তে শুরু করেছিল। তা কমাতেই আমদানি শুল্ক তোলার সিদ্ধান্ত।’’ কিন্তু পঞ্জাবের কৃষক নেতা অজমেঢ় সিংহের যুক্তি, ‘‘দাম বাড়ছে মজুতদারদের জন্য।’’ কৃষক সংগঠনগুলির বক্তব্য, সরকারের ন্যূনতম সহায়ক মূল্য কুইন্ট্যাল প্রতি ১৬২৫ টাকা। তবে নোট বাতিলের পরে ৮০০-৯০০ টাকাতেই গম বেচতে হচ্ছে। সস্তার গম এলে ফসল জলের দরে বেচা ছাড়া উপায় থাকবে না কৃষকদের।