পেট্রল-ডিজ়েলের দাম লিটার প্রতি অন্তত ১৫ টাকা করে বাড়ানো উচিত। কিন্তু শিয়রে পশ্চিমবঙ্গ-সহ পাঁচটি বিধানসভা নির্বাচন। তাই আন্তর্জাতিক বাজারে অশোধিত তেলের দাম যতই বাড়ুক, ভোটের আগে পেট্রল-ডিজ়েলের দাম বাড়ানো কঠিন বলে মোদী সরকার মনে করছে। তাই পেট্রল-ডিজ়েলের দাম বাড়াতে হলে ভোট পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে বলে কেন্দ্রীয় সরকারের শীর্ষ সূত্রের বক্তব্য।
পশ্চিম এশিয়ায় অশান্তি শুরুর পরে আন্তর্জাতিক বাজারে অশোধিত তেলের দাম বাড়তে শুরু করেছে। গত দু’সপ্তাহে অশোধিত তেলের দাম প্রায় ৪০ শতাংশ বেড়েছে। ইরানের উপরে ইজ়রায়েল ও আমেরিকার হামলার আগে ভারতে আমদানি হওয়া ব্রেন্ট অশোধিত তেলের দাম ছিল ব্যারেল প্রতি ৭৩ ডলার। শনিবার তা পৌঁছে গিয়েছে ১০৩ ডলার প্রতি ব্যারেলে। অর্থাৎ, অশোধিত তেলের দাম প্রতি ব্যারেলে প্রায় ৩০ ডলার বেড়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, অশোধিত তেলের দাম প্রতি ব্যারেলে ১ ডলার বাড়ার অর্থ, প্রতি লিটার পেট্রলের দাম ৫৫ পয়সা এবং প্রতি লিটার ডিজ়েলের দাম ৫২ পয়সা বেড়ে যাওয়া। গত দু’সপ্তাহে অশোধিত তেলের দাম ৩০ ডলার বেড়েছে। সেই হিসেবে পেট্রল, ডিজ়েলের দাম অন্তত ১৫ টাকা করে বাড়ানো উচিত। কিন্তু রাষ্ট্রায়ত্ত তেল সংস্থাগুলি রান্নার গ্যাসের সিলিন্ডারের দাম ৬০ টাকা করে বাড়ালেও পেট্রল-ডিজ়েলের দাম বাড়ায়নি। কেন্দ্রীয় পেট্রোলিয়াম মন্ত্রকের শীর্ষ স্তর থেকে ‘আশ্বাস’ দেওয়া হয়েছে, পেট্রল-ডিজ়েলের দাম বাড়বে না।কারণ, পেট্রল-ডিজ়েলের দামবাড়লে শুধু গাড়ির মালিকদের পকেটে আঁচ পড়বে তা নয়। গণ পরিবহণের ভাড়া বেড়ে যাবে। জিনিসপত্রের দামেও তার প্রভাব পড়বে। বাজারে মূল্যবৃদ্ধি বাড়বে। এমনিতেই রান্নার গ্যাসের দাম বৃদ্ধির পরেও তার জোগান নিয়ে কেন্দ্রীয় সরকার বিরোধীদের প্রশ্নের মুখে পড়েছে।তাই এখনই পেট্রল-ডিজ়েলের দাম বাড়ানো মুশকিল।
সরকারি সূত্রের ব্যাখ্যা, এর একমাত্র কারণ পশ্চিমবঙ্গ, অসম, কেরল, তামিলনাড়ু ও পুদুচেরির বিধানসভা নির্বাচন। আগামী ২৪ ঘণ্টা থেকে ৭২ ঘণ্টার মধ্যে নির্বাচন কমিশন ভোটের নির্ঘণ্ট ঘোষণা করে দিতে পারে। সব ঠিক মতো চললে এপ্রিলের দ্বিতীয়ার্ধে রাজ্যে রাজ্যে ভোটগ্রহণ হবে। পেট্রল-ডিজ়েলের দাম বাড়াতে হলে অন্তত ইভিএমে শেষ ভোট পড়া পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে। অতীতেও দেখা গিয়েছে, আন্তর্জাতিক বাজারে অশোধিত তেলের দাম বাড়লেও কেন্দ্রীয় সরকার ভোটগ্রহণ পর্যন্ত অপেক্ষা করে তারপরে পেট্রল-ডিজ়েলের দাম বাড়িয়েছে।
পেট্রোলিয়াম মন্ত্রকের কর্তাদের বক্তব্য, খাতায় কলমে পেট্রল-ডিজ়েলের দাম রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থাগুলিই ঠিক করে। বাজারের দাম অনুযায়ী এই দুই জ্বালানির দাম ঠিক হওয়ার কথা। কিন্তু বেশি পরিমাণে তেলের দাম বাড়াতে হলে রাষ্ট্রায়ত্ত তেল সংস্থার শীর্ষ কর্তাদের সরকারের সবুজ সঙ্কেতের জন্য অপেক্ষাকরতে হয়। তা মেলেনি বলেই গত দু’সপ্তাহে পেট্রল-ডিজ়েলেরদামে নড়চড় হয়নি। কলকাতার পেট্রলের দাম লিটার প্রতি১০৫ টাকার ঘরে, ডিজেলের দাম ৯২ টাকার ঘরেই রয়েছে। সরকারি স্তরে রান্নার গ্যাসের দাম বাড়ানোর ছাড়পত্র দেওয়া হয়েছে। যদিও সিলিন্ডার প্রতি ১৩৪ টাকা বাড়ানোর প্রয়োজন থাকলেও মাত্র ৬০ টাকা বাড়ানো হয়েছে। বাকি ৭৪ টাকার বোঝা সরকার নিচ্ছে। যার ফলে কেন্দ্রীয় সরকারকে প্রায় ৩০ হাজার কোটি টাকার বোঝা নিতে হবে।
একই ভাবে পেট্রল-ডিজ়েলের দাম বাড়ানো না হলে রাষ্ট্রায়ত্ত তেল সংস্থাগুলির মুনাফার পরিমাণ কমবে। ফলে কেন্দ্রীয় সরকারকে তারা যে ডিভিডেন্ড দেয়, তা কমে যাবে। অথবা, পেট্রল-ডিজ়েলের দাম বাড়িয়ে কেন্দ্রীয় সরকার করের বোঝা কিছুটা কমিয়ে মানুষকে সুরাহা দিতে পারে। তাতে সরকারের আয় কমে যাবে। যে পন্থাই নেওয়া হোক, কেন্দ্রীয় সরকারকে এর বোঝা বহন করতে হবে।
এই খবরটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
5,148
1,999
429
169
(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)