E-Paper

বৈসরন হামলা ভেঙে দিয়েছে স্থানীয় ব্যবসায়ীদের শিরদাঁড়া

বেজার মুখে বসে টাট্টু ঘোড়ার মালিক গুলাম মহম্মদ। এ সময়ে সওয়ারি নিয়ে দিনে অন্তত ১০-১২ বার উপত্যকায় যেতেন-আসতেন তিনি। আর আজ ১০ দিন হয়ে গেল এক জন সওয়ারিও জোটেনি গুলামের।

সাবির ইবন ইউসুফ

শেষ আপডেট: ২০ এপ্রিল ২০২৬ ০৬:২৯
সওয়ারির অপেক্ষায়। রবিবার পহেলগামে।

সওয়ারির অপেক্ষায়। রবিবার পহেলগামে। — ফাইল চিত্র।

পর্যটনের মরসুম শুরু হয়ে গিয়েছে উপত্যকায়। কিন্তু বিশাল এই হোটেলের ১০৮টি ঘরের একটিও ভাড়া হয়নি। “এ ভাবে কত দিন চালাব... তাই প্রায় সবাইকে ছাঁটাই করতে হয়েছে— রাঁধুনি, সাফাইকর্মী, গাইড...,” হতাশা চুঁইয়ে পড়ে উডল্যান্ড হোটেলের মালিক মুশতাকগনির গলায়।

একটু দূরে বেজার মুখে বসে টাট্টু ঘোড়ার মালিক গুলাম মহম্মদ। এ সময়ে সওয়ারি নিয়ে দিনে অন্তত ১০-১২ বার উপত্যকায় যেতেন-আসতেন তিনি। আর আজ ১০ দিন হয়ে গেল এক জন সওয়ারিও জোটেনি গুলামের। এ ভাবে চললে টাট্টু ঘোড়াটার দানাপানি আর ক’দিন জোটাতে পারবেন, জানেন না তিনি।

“আগে শ্রীনগর বিমানবন্দর থেকে পর্যটক নিয়ে আসতাম। তার পরে বেতাব উপত্যকা বা লিডার নদীতে ঘুরতে নিয়ে যেতাম তাঁদের। এখন সপ্তাহের পরে সপ্তাহ কোনও বুকিং নেই,” বলছিলেন ১৫ বছরের অভিজ্ঞ ট্যাক্সিচালক বশির আহমেদ।

নানা টুকিটাকি জিনিস ভর্তি দোকানটায় গত বছরও লেগে থাকত পর্যটকদের ভিড়। কেউ আখরোট কাঠের মূর্তি কিনতেন, কেউ বা জাফরান। আজ সে সব শিল্পসামগ্রীতে ধুলোর আস্তরণ। যে দু’-এক জন পর্যটক আসছেন, কেনাকাটা নয়, বরং সে দিনের সেই হামলা সম্বন্ধেই জানতে বেশি আগ্রহী তাঁরা।

২০২৫-এর ২২ এপ্রিলের পর থেকে এক ভুতুড়ে নীরবতায় আচ্ছন্ন পহেলগাম। “বৈসরন হামলার পরে এখানে সব কিছু ভেঙে পড়েছে,” বললেন স্থানীয় হোটেল সংগঠনের প্রতিনিধি আবদুল আলা। তাঁর কাছ থেকেই জানতে পারলাম, গত এপ্রিলে প্রাথমিক ধাক্কার পরে পর্যটন ব্যবসা কিছুটা ঘুরে দাঁড়িয়েছিল, কিন্তু নভেম্বরে দিল্লির লাল কেল্লায় গাড়ি বিস্ফোরণ ছবিটা পুরোদস্তুর পাল্টে দিল। “নিরাপত্তার বিষয়ে আমরা পর্যটকদের আর কিছুতেই আশ্বস্ত করতে পারছি না,” খেদোক্তি আবদুলের।

পহেলগাম থেকে সাত কিলোমিটার দূরে বৈসরন উপত্যকা। সে দিন ২৫ জন পর্যটক ও এক স্থানীয় টাট্টু ঘোড়া মালিকের রক্তে ভিজে গিয়েছিল সবুজ ঘাসের গালিচা। সদ্য বিয়ে হওয়া তরুণী স্বামীর নিথর দেহের পাশে স্থানুবৎ বসে রয়েছেন, সেই ছবি ভারতের মানুষ সহজে ভুলবেন না। সেই আতঙ্ক এখনও তাড়া করে বেড়ায় পর্যটকদের, আর তার মাসুল গুনতে হয় স্থানীয় মানুষদের, যাঁদেররুটি-রুজি প্রায় সম্পূর্ণ ভাবেই পর্যটনের উপরে নির্ভরশীল।

এক সময়ে যে হোটেলগুলি অতিথিতে উপচে পড়ত, সেগুলির ফাঁকা ঘরে যেন নৈঃশব্দের প্রতিধ্বনি। ট্যাক্সি স্ট্যান্ডগুলো জনশূন্য, গাড়ির সংখ্যাও চোখে পড়ার মতো কম। ঘোড়াওয়ালারা হতাশ চোখে তাকিয়ে রয়েছে টাট্টুগুলোর দিকে, ঘাস খাওয়া ছাড়া আপাতত কোনওই কাজ নেই অবলা প্রাণীগুলোর। ব্যবসায়ীরা এখন টাকার হিসাব না করে ক্ষতির হিসাব কষছেন। আর ঘোর অনিশ্চয়তার অতলে তলিয়ে যাচ্ছেন এই সব ব্যবসায়ীর উপরে নির্ভরশীল পরিবারের অন্য মানুষগুলো।

“যে উপত্যকায় এসে মুগ্ধ হয়ে যেতেন পর্যটকেরা, এখন সেই ঘাসভূমিকে তাঁরা অভিশপ্ত মনে করেন,” বলছিলেন গুলাম মহম্মদ। স্থানীয়েরা জানাচ্ছেন, এলাকায় অতিরিক্ত বাহিনী মোতায়েন হয়েছে, টাট্টু ঘোড়াওয়ালা ও গাইডদের জন্য কিউআর-কোড যাচাইয়ের পদ্ধতিও চালু করা হয়েছে। তবু পর্যটকদের নিরাপত্তা সম্পর্কে আশ্বস্ত করা যাচ্ছে কই! স্থানীয় অর্থনীতি এ ভাবে মুখ থুবড়ে পড়ায় পহেলগামের অনেক পরিবার বাড়ির ছেলের বিয়ে পিছিয়ে দিয়েছে, সন্তানদের বেসরকারি স্কুল থেকে সরিয়ে সরকারি স্কুলে ভর্তি করিয়েছে, এমনকি, ঋণ নিতেও বাধ্য হয়েছে। টাট্টু বা গাড়ি বিক্রি করে, হোটেলে তালা ঝুলিয়ে দিচ্ছেন অনেক স্থানীয় ব্যবসায়ীই। কিন্তু বিকল্প জীবিকার সন্ধানই বা কোথায়!

সে দিন বৈসরন উপত্যকায় সন্ত্রাসবাদী হামলা শুধু ২৬ জনের প্রাণই কাড়েনি, ভেঙে দিয়ে গিয়েছে এখানকার মানুষের শিরদাঁড়া, কেড়ে নিয়েছে তাঁদের রুটি-রুজি।

(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

Pahalgam Pahalgam Incident

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy