E-Paper

তড়িঘড়ি কেন আপস ভারতের, প্রশ্নে বাণিজ্যচুক্তি

কংগ্রেস-সহ বিরোধী শিবির প্রশ্ন তুলল, আমেরিকার সুপ্রিম কোর্টের রায়ের জন্য অপেক্ষা না করে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী তড়িঘড়ি কেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে ফোনে কথা বলে অন্তর্বর্তী বাণিজ্য চুক্তিতে রাজি হয়ে গেলেন?

নিজস্ব সংবাদদাতা

শেষ আপডেট: ২২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ০৬:৪৫
(বাঁ দিকে) নরেন্দ্র মোদী এবং ডোনাল্ড ট্রাম্প (ডান দিকে)।

(বাঁ দিকে) নরেন্দ্র মোদী এবং ডোনাল্ড ট্রাম্প (ডান দিকে)। গ্রাফিক: আনন্দবাজার ডট কম।

আমেরিকার সুপ্রিম কোর্ট যে ভারতের মতো দেশের উপরে ডোনাল্ড ট্রাম্পের চড়া শুল্কের নির্দেশ খারিজ করে দিতে পারে, সেই সম্ভাবনা আগে থেকেই ছিল। ট্রাম্প ভারতের উপরে ৫০ শতাংশ শুল্ক-জরিমানার চাপ দিয়ে বাণিজ্য চুক্তিতে নানা সুবিধা আদায় করে নিয়েছেন। কিছু কৃষি পণ্যের জন্য বাজার খুলতে বাধ্য করেছেন। আমেরিকার থেকে ভারত ৫০ হাজার কোটি ডলারের পণ্যও কিনতে রাজি হয়ে গিয়েছে। তার বদলে ট্রাম্প ভারতের উপরে শুল্কের বোঝা ৫০ শতাংশ থেকে ১৮ শতাংশ করেন।

এখন আমেরিকার সুপ্রিম কোর্ট ট্রাম্পের শুল্কই খারিজ করে দেওয়ার পরে আজ কংগ্রেস-সহ বিরোধী শিবির প্রশ্ন তুলল, আমেরিকার সুপ্রিম কোর্টের রায়ের জন্য অপেক্ষা না করে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী তড়িঘড়ি কেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে ফোনে কথা বলে অন্তর্বর্তী বাণিজ্য চুক্তিতে রাজি হয়ে গেলেন? কংগ্রেস দাবি তুলেছে, মোদী সরকার আমেরিকার সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তি স্থগিত রেখে নতুন করে দর কষাকষি শুরু করুক। কারণ, সুপ্রিম কোর্ট চড়া শুল্ক খারিজ করে দেওয়ার পরে ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসন নিজেই সব দেশের উপরে ১০ শতাংশ করে শুল্ক চাপান, পরে আবার তা ১৫ শতাংশ করেন। ফলে অন্তর্বর্তী বাণিজ্য চুক্তিতে ঐকমত্য হওয়ার পরে আমেরিকা ভারতীয় পণ্যে শুল্ক কমিয়ে যা ১৮ শতাংশ করতে রাজি হয়েছিল, তা শনিবার রাত পর্যন্ত হিসাবে কমে ১৫ শতাংশ হবে।

বাণিজ্য মন্ত্রক আজ জানিয়েছে, ওই রায়ের পরে পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে ভারতের অবস্থান কী হবে, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। তার আগেই মোদী সরকারকে ফের অস্বস্তিতে ফেলে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, ‘‘চুক্তিতে আর কোনও বদল হবে না। আমরা ভারতে আমেরিকার পণ্য পাঠানোর সময় আর কোনও শুল্ক মেটাব না। ভারত আমেরিকায় পণ্য রফতানির জন্য আমাদের শুল্ক দেবে। আগে যা চলছিল, এখন তার ঠিক উল্টো হবে।’’ বিরোধীদের দাবি, ট্রাম্পের বক্তব্য থেকেই স্পষ্ট, তিনি প্রথমে চড়া শুল্ক চাপিয়ে তারপরে তা কিছুটা কমিয়ে ভারতের সঙ্গে দর কষাকষি করেছেন। এখন সুপ্রিম কোর্ট তাঁর সিদ্ধান্ত খারিজ করে দিলেও আমেরিকার কাজ হাসিল হয়ে গিয়েছে।

লোকসভার বিরোধী দলনেতা রাহুল গান্ধী সংসদে অভিযোগ তুলেছিলেন, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী আমেরিকার এপস্টিন ফাইল ও শিল্পপতি আদানিকে আমেরিকার বিচার বিভাগের সমনের জোড়া চাপে আপস করে ফেলেছেন। আজ তাঁর কটাক্ষ, ‘‘প্রধানমন্ত্রী আপস করে ফেলেছেন। ওঁর বিশ্বাসঘাতকতা স্পষ্ট হয়ে গিয়েছে। উনি নতুন করে দর কষাকষি করতে পারবেন না। আবার আত্মসমর্পণ করে ফেলবেন।’’ কংগ্রেস সভাপতি মল্লিকার্জুন খড়্গের প্রশ্ন, ‘‘কেন আমেরিকার সুপ্রিম কোর্টের রায়ের অপেক্ষা না করে মোদী সরকার তড়িঘড়ি বাণিজ্য চুক্তির ফাঁদে পড়ে গেল? কেন আমেরিকাকে বিপুল ছাড় দেওয়া হল? কৃষির বাজার খুলে দেওয়া হল কেন? কেন রাশিয়া থেকে সস্তায় তেল আমদানি না করার শর্তে মোদী সরকার রাজি হল? কার চাপ ছিল? এপস্টিন ফাইলের?”

গত ১ ফেব্রুয়ারি কেন্দ্রীয় অর্থমন্ত্রী নির্মলা সীতারামন আমেরিকার চড়া শুল্কের ধাক্কা সামলানোর লক্ষ্য নিয়েই তৈরি বাজেট সংসদে পেশ করেছিলেন। তার পরের দিনই হঠাৎ প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর সঙ্গে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের ফোনে কথা হয়। আমেরিকা ঘোষণা করে দেয়, বাণিজ্য চুক্তি নিয়ে ঐকমত্য হয়ে গিয়েছে। ভারত রাশিয়া থেকে তেল কেনা বন্ধ করছে বলে ৫০ শতাংশ শুল্ক-জরিমানা কমিয়ে ১৮ শতাংশ হচ্ছে। এক সপ্তাহ পরে যৌথ বিবৃতি জারি করে বলা হয়, অন্তর্বর্তী বাণিজ্য চুক্তির কাঠামো ঠিক হয়েছে। আগামী মাসে প্রথম দফার অন্তর্বর্তী বাণিজ্য চুক্তিতে সই হতে পারে। ভারতের দাবি ছিল, আমেরিকা ১৮ শতাংশ শুল্কে রাজি হয়েছে। তার ফলে বাংলাদেশের মতো প্রতিযোগী দেশগুলির তুলনায় ভারতের উপরে কম শুল্ক চাপবে। এখন আমেরিকার সুপ্রিম কোর্ট তা খারিজ করে দেওয়ার পরে সব দেশের উপরেই ১৫ শতাংশ শুল্ক চাপিয়েছেন ট্রাম্প। বিরোধীদের প্রশ্ন, তা হলে আর বাড়তি সুবিধা কোথায় মিলল?

কংগ্রেসের প্রধান মুখপাত্র জয়রাম রমেশের মতে, আচমকা ২ ফেব্রুয়ারি কেন মোদী ট্রাম্পের সঙ্গে যোগাযোগ করতে গিয়েছিলেন? সে দিন কী হয়েছিল, যা থেকে নজর সরাতে তাঁকে বাণিজ্য চুক্তি নিয়ে রফায় রাজি হতে হল? কংগ্রেসের মতে, রাহুল প্রাক্তন সেনাপ্রধান মনোজ নরবণের অপ্রকাশিত বই থেকে দেখিয়েছিলেন, মোদী চিনের সেনার অনুপ্রবেশের সামনে আত্মসমর্পণ করেন। তাই তাঁর সেখান থেকে নজর সরানো প্রয়োজন ছিল। রমেশ বলেন, ‘‘নরেন্দ্র মোদী নিজের ভঙ্গুর ভাবমূর্তি রক্ষায় এত মরিয়া না হয়ে আর ১৮ দিন অপেক্ষা করলে আমেরিকার সুপ্রিম কোর্টের রায় এসে যেত। দেশের সার্বভৌমত্ব, কৃষকদের স্বার্থ রক্ষা পেত।’’

উদ্ধব ঠাকরের শিবসেনার নেত্রী প্রিয়ঙ্কা চতুর্বেদীর অভিযোগ, এখন চিনের উপরেও ১৫ শতাংশ শুল্ক চাপবে। চিন কিন্তু নিজের অধিকার বিসর্জন দেয়নি। তাই চিন রাশিয়া থেকে সস্তায় তেল কিনছে। এ দিকে মোদী সরকারের ‘জিনিয়াস’ বাণিজ্যমন্ত্রী রাশিয়া থেকে তেল কেনার অধিকার ছেড়ে দিয়ে এসেছেন।

ঘরেও চাপের মুখে পড়েছে মোদী সরকার। এনডিএ-র শরিক শিবসেনা(শিন্দে)-র সাংসদ মিলিন্দ দেওরা দাবি তুলেছেন, এত দিন ভারতের আমদানিকারীরা যে চড়া শুল্ক মিটিয়েছেন, আমেরিকার আদালতের রায়ের পরে তা তাঁদের ফেরত পাইয়ে দিতে বাণিজ্য মন্ত্রক উদ্যোগী হোক।

(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

PM Narendra Modi Donald Trump USA US-India India-US Relationship

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy