এক দুর্গায় রক্ষে নেই, এখানে তো দুর্গা শতাধিক! আর সকলের মাথার উপরে আছেন জিম করবেটের পাড়ার বাঙালি মেয়ে! দুই হাতে দশ দিক সামলাচ্ছেন তিনি। প্রায় হাজার বর্গ কিলোমিটার অরণ্যকে চোরা শিকারিদের থেকে আড়াল করে রাখতে হচ্ছে তাঁকে। এ দিকে, কখনও রাষ্ট্রপতি, কখনও প্রধানমন্ত্রী, কখনও ভুটানের রাজা আবার কখনও ৩৫ দেশের রাষ্ট্রদূত তাঁর অতিথি হচ্ছেন। পাশাপাশি চলছে নিয়মিত প্রশিক্ষণ, কর্মশালা। সেই সঙ্গে প্রশাসনিক কাজের জটিলতা, বিভিন্ন আইনি যুদ্ধ এবং জনসংযোগ রক্ষার ভারও
হাসিমুখে সামলাচ্ছেন ‘শ্রীমতী কাজিরাঙা’ সোনালী ঘোষ।
সেনাকর্তা বাবা আদতে পশ্চিমবঙ্গের বালির মানুষ হলে কী হবে, তিন পুরুষের প্রবাসী তাঁরা। কাজের সূত্রে ঘুরতে হয়েছে দেশজুড়ে। উত্তরাখণ্ডে তাঁর বাড়ির আশপাশে ছিল পাহাড়-জঙ্গল। বাড়ির অদূরে ফরেস্ট ইনস্টিটিউট। পাশেই মুসৌরিতে ভারতীয় প্রশাসনিক সেবার প্রশিক্ষণ কেন্দ্র। তাই জঙ্গল ও রাষ্ট্রযন্ত্র— দুইই সোনালীকে টেনেছিল সেই ছোটবেলা থেকে। তিনি ফরেস্ট্রি অ্যান্ড ওয়াইল্ডলাইফ সায়েন্সে এমএসসি, ন্যাশনাল ল স্কুলের পরিবেশ আইন ও সিস্টেমস্ ম্যানেজমেন্টে স্নাতকোত্তর ডিপ্লোমা, ভারত-ভুটান সীমান্তে বাঘের চারণভূমি নির্মাণে রিমোট সেন্সিং প্রযুক্তির ব্যবহার নিয়ে ডক্টরেট।
তবে, অসমের কাজিরাঙা জাতীয় উদ্যান ও বিশ্ব ঐতিহ্যক্ষেত্রের ১১৮ বছরের ইতিহাসে তিনিই যে প্রথম মহিলা ফিল্ড ডিরেক্টর হওয়ার নজির গড়বেন, তা ভাবতে পারেননি ২০০০-২০০৩ আইএফএস ব্যাচের ‘টপার’ সোনালী। ২০০২ সালে এই কাজিরাঙাতেই প্রবেশনার হিসেবে কাজ করেছিলেন তিনি। তাই ডিরেক্টর হয়ে সেখানে ফেরা তাঁর কাছে ঘরে ফেরার মতোই ছিল। কিন্ত অতিথি হওয়া আর গৃহকর্ত্রী হওয়ায় বিস্তর ফারাক। হাজার বর্গ কিলোমিটারের সংসারের ভার হাতে পেয়ে শুধু নিজেই নজির গড়েননি সোনালী, বরং তাঁর নেতৃত্বে দেওয়াল ভেঙে
কাজিরাঙায় বনরক্ষা, বনটহলে পুরুষদের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে পা মিলিয়েছেন রাইফেলধারী নারীবাহিনীও।
সোনালী বলেন, তিন মাসের কঠোর প্রশিক্ষণে জঙ্গল পোস্টিংয়ের কষ্ট সহ্য করার জন্য মানসিক এবং শারীরিক ভাবে শক্তিশালী করা হয়েছে বনরক্ষী মহিলাদের। কাজিরাঙার ২৩৩টি চোরাশিকার বিরোধী শিবির একেবারেই পুরুষদের থাকার জন্য তৈরি ছিল। কিন্তু মেয়েদের রাখতে হলে শৌচাগার এবং রান্নার ব্যবস্থা করা ছিল আবশ্যক। তাই জঙ্গলে শুধুই মহিলাদের জন্য শিবির স্থাপন করা হয়। যা রাজ্যের ইতিহাসে প্রথম। পুরুষ সহকর্মী এবং ঊর্ধ্বতনদের সন্দেহ ছিল, মেয়েরা বনে কাজ করতে পারবে কি? কিন্তু মহিলা বাহিনী রাতদিন বনটহল দিয়ে, বন্যার সময় প্রাণীর গতিবিধ সুরক্ষিত করে, গাড়ির গতি নিয়ন্ত্রণ করে, প্রাণীদের উদ্ধার করে, আশপাশের গ্রামে জনসংযোগ বাড়িয়ে দেখিয়েছে, তারা সব কিছুর মোকাবিলা করতে প্রস্তুত।
প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী কাজিরাঙা সফরের মহিলা বনকর্মীদের সঙ্গে কথা বলে মুগ্ধ হয়ে তাঁদের নাম দেন ‘বনদুর্গা’। এখন সেই নামেই তাঁদের পরিচয়।
সোনালীর দাবি, পুরুষতান্ত্রিকতার পাঁচিল ভাঙা বনদুর্গারা আশপাশের গ্রামের মানুষের সঙ্গে আন্তরিক সম্পর্ক তৈরিতে অনেক বেশি কার্যকর হয়েছেন। ফলে সেই সব পরিবারকেও সংরক্ষণে উৎসাহিত করা সম্ভব হয়েছে। সেখানকার তরুণীরাও এখন বনদুর্গা হওয়ার স্বপ্ন দেখেন।
কাজিরাঙায় পর্যটকদের একমাত্র আকর্ষণ ছিল সাফারি। সোনালী সেই তালিকায় যোগ করেছেন জঙ্গল ট্রেকিং, বার্ড ওয়াচিং, কার্বি গ্রাম ঘিরে সাইক্লিং, ব্রহ্মপুত্রের উত্তর পারে নদী পর্যটন, চা বাগান পর্যটন। কাজিরাঙার আশপাশের কার্বি ও মিসিং গ্রামের মানুষদের সংরক্ষণ ও হস্তশিল্প উদ্যোগের অংশ
করেছেন তিনি।
আইএএস চন্দ্রভূষণ কুমার ও ১৩ বছরের মেয়েকে নিয়ে তাঁর সংসার হলেও স্বামী ও মেয়েকে ছুটিছাটা বাদে কাছে পাওয়া হয় না। সোনালীর মতে, মেয়েদের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হল, কাজ এবং পরিবারের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখা। কিন্তু যদি কর্মস্থলে সঠিক সুযোগ-সুবিধা, ভাল স্কুল, ক্রেশের ব্যবস্থা করা যায়, তবে মেয়েরা পুরুষদের থেকেও বেশি দক্ষতার সঙ্গে কাজ করতে পারেন।
একশো দুর্গার কারও আঙুলে নেলপালিশ, কারও কব্জিতে চুড়ি, কারও স্মার্ট ওয়াচ। কিন্তু তর্জনি সতর্ক এসএলআর-এর ট্রিগার-বন্ধনীতে। সকালে সাফারি গেটে টিকিট পরীক্ষা, জিপসির সামনে বসে নিরাপত্তা ডিউটি, কোনও প্রাণী তাড়া করলে রাইফেলের আওয়াজ করে তাদের তাড়ানো, বিকেলে হেঁটে বা হাতির পিঠে চড়ে জঙ্গল টহল। বন্দনা দাস, প্রিয়াঙ্কা বরা, পূরবী চেতিয়া, বিপাশা নাথ, ববিতা কুর্মি, চান চান দেবী, আবিদা পরভিন, বিভা সোনোয়ালরা বাড়িকে মিস করেন বটে, কিন্তু প্রতিদিন নতুন অভিজ্ঞতা, নতুন রোমাঞ্চ তাঁদের অরণ্যের দিনরাত্রির সঙ্গে ধীরে ধীরে অভ্যস্ত করে তুলেছে।
সোনালী সতর্ক করেন, সাধারণ চোখে বনদুর্গাদের উচ্ছল তরুণী মনে হতেই পারে। কিন্তু দরকার পড়লে ওঁদের ভিতর থেকেই বেরিয়ে আসতে পারেন স্বয়ং চণ্ডী!
এই খবরটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
5,148
1,999
429
169
(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)