E-Paper

আমার পদবি খান, দেশদ্রোহী নই! বলতে হবে?

কুমার না। কপূর না। সিংহ না। খান। ‘মাই নেম ইজ় খান’। তাই কখনও তাঁকে বলতে হবে, ‘আমার পদবি খান এবং আমি জঙ্গি নই’। কখনও বলতে হবে, ‘আমার পদবি খান এবং আমি দেশদ্রোহী নই’।

জাগরী বন্দ্যোপাধ্যায়

শেষ আপডেট: ০৪ জানুয়ারি ২০২৬ ০৯:৪১
(বাঁ দিকে) শাহরুখ খান এবং মুস্তাফিজুর রহমান (ডান দিকে)।

(বাঁ দিকে) শাহরুখ খান এবং মুস্তাফিজুর রহমান (ডান দিকে)। — ফাইল চিত্র।

স্বভাবসিদ্ধ রসিকতার সুরে শাহরুখ খান এক বার বলেছিলেন, ‘‘আমার যখনই আত্মবিশ্বাস খুব বেড়ে যায়, আমি এক বার করে আমেরিকা চলে যাই।’’ কারণ আমেরিকার বিমানবন্দরে শাহরুখকে লাগাতার তল্লাশির মুখে পড়তে হত তাঁর নামের কারণে। শাহরুখকে আমেরিকা চেনে না এমন নয়। তবুও তিনি সন্দেহভাজন জঙ্গি কি না, জামাকাপড় খুলিয়ে খতিয়ে দেখা হত প্রতি বার।

ইদানীং শাহরুখকে আর আলাদা করে আমেরিকা যেতে হচ্ছে না। তাঁর ‘স্বদেশ’ই বার বার তাঁকে মনে করিয়ে দিচ্ছে, যত বড় তারকাই তিনি হোন না কেন, যে কোনও সময় যে কোনও ছুতোয় যে কোনও রকম কটূক্তি তাঁকে করে বসাই যায়। ‘গদ্দার’ বলে হুমকি দেওয়াই যায়। কারণ তাঁর নাম, শাহরুখ খান।

কুমার না। কপূর না। সিংহ না। খান। ‘মাই নেম ইজ় খান’। তাই কখনও তাঁকে বলতে হবে, ‘আমার পদবি খান এবং আমি জঙ্গি নই’। কখনও বলতে হবে, ‘আমার পদবি খান এবং আমি দেশদ্রোহী নই’।

কেন বলতে হবে? কারণ আইপিএল দলে বাংলাদেশের মুস্তাফিজুর রহমানকে নেওয়াটা এতটাই নাকি ‘গর্হিত’ কাজ যে, সঙ্গীত সোমেরা সরাসরি বলছেন, ‘‘শাহরুখ দেশের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করেছেন। এই ধরনের দেশদ্রোহীদের এই দেশে বেঁচে থাকার অধিকার নেই।’’ বিসিসিআই এত দিন চুপচাপ ছিল। কাকে নেওয়া যাবে বা যাবে না, সে বিষয়ে আগাম কোনও নির্দেশিকা জারি করেনি। এখন গেল গেল রব উঠতেই তারা মুস্তাফিজুরকে সরিয়ে দিতে বলেছে। ফলে কাজটা যে ‘গর্হিত’ই হয়েছিল, সেই ধারণাটা আরও পোক্ত হওয়ার সুযোগ পেয়ে যাচ্ছে। সাধু দেবকীনন্দন ঠাকুর তাই শনিবার অম্লান বদনে বলে দিলেন, ‘‘মিস্টার কেকেআর তো হিন্দুদের সঙ্গে নেইই।’’ কাল থেকে আবার হয়তো কেউ চেঁচাতে থাকবেন, ‘এ দেশে হিন্দু বিরোধীদের বাঁচার অধিকার নেই এবং শাহরুখ খান হলেন সেই হিন্দু-বিরোধী!’

২০১০ থেকে ২০২৫-এর শেষ-২৬’র শুরু। একটা লম্বা পথ। আক্রোশের, বিদ্বেষের, আক্রমণের মধ্যে দিয়ে হেঁটে চলার পথ। এক আইপিএল থেকে আরেক আইপিএল।

২০১০ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে মুক্তি পেয়েছিল ‘মাই নেম ইজ় খান’। ৯/১১ পরবর্তী পৃথিবীতে মুসলিম আত্মপরিচয় নিয়ে বাঁচাটা কতখানি জটিল হয়ে গিয়েছে, সেই কাহিনি বলতে চেয়েছিল শাহরুখের এই ছবি। বলতে চেয়েছিল, ‘আমার পদবি খান এবং আমি জঙ্গি নই’। আর তারই প্রচারে আমেরিকায় গিয়ে বিমানবন্দরে বিস্তর হয়রানির মুখে পড়লেন তিনি। তাঁর নাম ঠিক জঙ্গিদের নামের মতো যে! পর্দার গল্প আর জীবনের গল্পের ফারাক ঘুচেই গেল প্রায়। তার চেয়েও আশ্চর্যের এই যে, সে ছবি যখন এ দেশে মুক্তির সময় এল, তখন ভারতের মাটিতেই শাহরুখের প্রতি আক্রমণ শুরু হয়ে গিয়েছে। ‘শাহরুখ পাকিস্তান চলে যাও’ ধ্বনিতে মুম্বইয়ের আকাশ-বাতাস কাঁপছে।

অপরাধটা কী? আইপিএল দলে পাকিস্তানের খেলোয়াড় নেওয়ার সপক্ষে কথা বলেছেন শাহরুখ। তৎকালীন অভিন্ন শিবসেনা, মুম্বইয়ের বেতাজ বাদশা বালাসাহেব ঠাকরের শিবসেনা ফতোয়া জারি করল, ক্ষমা না চাইলে ছবি চলতেই দেওয়া হবে না। শেষ পর্যন্ত সেই ফতোয়া প্রত্যাহৃত হলেও মহারাষ্ট্রের একাধিক প্রেক্ষাগৃহে ভাঙচুর, পোস্টার ছেঁড়া ইত্যাদি হয়েছিল। শাহরুখকে অ্যান্টি-ন্যাশনাল বলে দাগিয়ে দেওয়ার রেওয়াজ সেই থেকে শুরু। ‘শাহরুখ জাতীয়তাবাদী নন’, ‘শাহরুখের আনুগত্য ভারতের প্রতি নয়’, ‘শাহরুখের পাকিস্তান চলে যাওয়া উচিত’— এই সব স্লোগানের উৎপত্তি সেই তখনই। তবে তখনও সমাজমাধ্যম ব্যাপারটা এতখানি জাঁকিয়ে বসেনি, ট্রোলসেনানীরা এত বিকশিত হয়নি, স্মার্টফোনের রাজত্ব সে ভাবে শুরু হয়নি। তাই মহারাষ্ট্রের বাইরে ব্যাপারটা খুব বেশি ছড়াতে পারেনি।

বছর পাঁচেক লাগল পরিবেশটা বদলাতে। ২০১৫। শাহরুখ বলেছিলেন, দেশটা বড্ড অসহিষ্ণু হয়ে যাচ্ছে। একা বলেননি। অনেকেই বলছিলেন তখন। এমনকি রতন টাটাও। কিন্তু ‘পদোন্নতি’টা শাহরুখের হয়েছিল। কী রকম পদোন্নতি? ‘অ্যান্টি-ন্যাশনাল’ তো শোনাই ছিল। ‘রাহুল! নাম তো সুনা হোগা’র মতোই। এ বার যোগী আদিত্যনাথ-কৈলাস বিজয়বর্গীয় প্রমুখ বললেন, শাহরুখ তো ‘জঙ্গি! টেররিস্ট!’ আরও দশ বছর এগিয়ে আসার পরে এখন বলা হচ্ছে— শাহরুখ ‘গদ্দার’, শাহরুখ ‘দেশদ্রোহী’, শাহরুখ ‘হিন্দু-বিরোধী’। বিজেপি সাংসদ জগদম্বিকা পাল বলছেন, শাহরুখের ভাবনাচিন্তাগুলো দেশের জন্য মোটে ভাল না।

‘ভাল’ তো নয়ই। কৃষকদের দুর্দশার কথা, হাসপাতালে দুর্নীতির কথা পর্দায় বলেন যে ‘জওয়ান’, তাঁকে নিয়ে অস্বস্তি থাকেই। জাতীয় পুরস্কারও অস্বস্তি দূর করতে পারে না।

শাহরুখ পঠান খান। বয়স ষাট। পঁয়ত্রিশ বছরের বেশি অভিনয়-জীবন। রোম্যান্সের রাজা বলে জনস্বীকৃতি। ঝুলিতে ‘দেশদ্রোহী’ খেতাব। কতটা পথ পেরোলে তবে দেশপ্রেমীহওয়া যায়?

(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

Shahrukh Khan Mustafizur Rahman Identity Surname

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy