পশ্চিমবঙ্গের ‘লক্ষ্মীর ভান্ডার’ হোক বা মহারাষ্ট্রের ‘লড়কি বহিন’— মহিলাদের হাতে বিনা শর্তে নগদ টাকা তুলে দেওয়ার মতো খয়রাতি প্রকল্প দীর্ঘদিন চালানো নিয়ে সতর্কবার্তা দিল আর্থিক সমীক্ষা।
রবিবারের বাজেটের আগে কেন্দ্রীয় অর্থমন্ত্রী নির্মলা সীতারামন বৃহস্পতিবার সংসদে আর্থিক সমীক্ষা পেশ করেছেন। তাতে বলা হয়েছে, মহিলাদের হাতে টাকা তুলে দেওয়ার কিছু তাৎক্ষণিক সুবিধা রয়েছে। রোজগারের ক্ষেত্রে কিছুটা সাহায্য হয়। কিন্তু যে হারে বিনা শর্তে নগদ অনুদান প্রকল্পের মাত্রা বাড়ছে, একের পর এক রাজ্যে এই ধরনের প্রকল্প চালু হচ্ছে, তাতে রাজ্যগুলির কোষাগারের অবস্থা করুণ হচ্ছে। জনমোহিনী রাজনীতি করতে গিয়ে পরিকাঠামোর মতো যে সব ক্ষেত্রে খরচ করলে আর্থিক বৃদ্ধি বাড়তে পারে, সেখানে ব্যয় কমছে। হাতে টাকা পেয়ে যাওয়ায় মহিলাদের কাজের বাজারে অংশগ্রহণও কমে যাচ্ছে। কেউ নিজেদের রোজগারের জন্য তৈরি করা, দক্ষতা বাড়ানোর চেষ্টা করছে না। দীর্ঘ মেয়াদে তা বেশি লাভজনক হত।
আজ কেন্দ্রীয় সরকারের মুখ্য আর্থিক উপদেষ্টা ভি অনন্ত নাগেশ্বরন এর থেকেও বড় সমস্যার কথা জানিয়েছেন। তাঁর বক্তব্য, ভারত সরকারের বন্ড বা ঋণপত্র এখন আন্তর্জাতিক সূচকের সঙ্গে যুক্ত। ফলে লগ্নিকারীরা এখন কেন্দ্রীয় সরকারের সঙ্গে রাজ্য সরকারের কোষাগারের অবস্থাও খতিয়ে দেখছেন। ফলে রাজ্যগুলির আর্থিক সমস্যা এখন আর রাজ্যের সীমানায় আটকে নেই। এর ফলে দেশের ঋণ নেওয়ার খরচ বাড়ছে। ভারতের বন্ডে বেশি সুদ গুনতে হচ্ছে।
পশ্চিমবঙ্গে বিধানসভা নির্বাচনের আগে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকার লক্ষ্মীর ভান্ডার প্রকল্পে টাকার অঙ্ক বাড়াবে বলে রাজনৈতিক শিবিরের অনুমান। সম্প্রতি বিহারে নীতীশ
কুমারের নেতৃত্বে জেডিইউ-বিজেপি জোট সরকারের ক্ষমতায় ফেরার প্রধান চাবিকাঠি ছিল ভোটের আগে মহিলাদের হাতে বিনা শর্তে ১০ হাজার টাকা তুলে দেওয়া। অসমে বিধানসভা নির্বাচনের মুখে সে রাজ্যের বিজেপি সরকারের মুখ্যমন্ত্রী হিমন্তবিশ্ব শর্মাও মহিলাদের হাতে ‘বিহুর উপহার’ হিসেবে ৮ হাজার টাকা তুলে দিচ্ছেন। এক সময় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী একে ‘রেউড়ি’ বা তিল-গুড়ের মিষ্টি বলে কটাক্ষ করলেও আজ বিজেপি শাসিত রাজ্যগুলি সেই পথই ধরেছে। কেন্দ্রের মোদী সরকারের আর্থিক সমীক্ষা সে দিকেই আঙুল তুলেছে।
আর্থিক সমীক্ষা অনুযায়ী, চলতি অর্থবছর বা ২০২৫-২৬-এ রাজ্যগুলিতে মহিলা ভাতা প্রকল্পের খরচ ১.৭ লক্ষ কোটি টাকায় পৌঁছে দিয়েছে। মহিলাদের ভাতা দেওয়া রাজ্যের সংখ্যা তিন বছরে পাঁচ গুণ বেড়েছে। এর মধ্যে অর্ধেক রাজ্যে রাজস্ব ঘাটতি রয়েছে। নগদ টাকা বিলি করতে গিয়ে রাজ্যের জিডিপি-র ০.৯ থেকে ১.২৫ শতাংশ পর্যন্ত খরচ হচ্ছে। কোনও রাজ্যে মোট বাজেটের ৮ শতাংশের বেশি নগদ বিলিতেই খরচ হচ্ছে। সেই তুলনায় কর্মসংস্থান, বৃত্তিমূলক প্রশিক্ষণ, মানব উন্নয়নে খরচ না হলে আর্থিক বৃদ্ধিতে এর প্রভাব পড়বে। সামগ্রিক ভাবে রাজ্যগুলির রাজকোষ ঘাটতি, রাজস্ব ঘাটতি দুই-ই বাড়ছে। যার অর্থ, ধার করে বেতন, ভর্তুকি, ভাতার খরচ করা হচ্ছে।
সরাসরি মহিলা ভাতা প্রকল্পের বিরোধিতা না করে মুখ্য আর্থিক উপদেষ্টা এই ধরনের প্রকল্পের নকশা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তাঁর মতে, মেক্সিকোয় প্রগেসা, ব্রাজ়িলে বলসা ফ্যামিলিয়া নামে একই ধরনের প্রকল্প চলছে। কিন্তু সেখানে স্কুলে হাজিরা, স্বাস্থ্য পরীক্ষার মতো নানা শর্ত রয়েছে। কত দিন পর্যন্ত টাকা মিলবে, তা-ও বলা হয়েছে। ফলে দীর্ঘমেয়াদে আর্থিক বোঝা থাকছে না। অথচ মানব সম্পদ উন্নয়ন হচ্ছে।
এই খবরটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
5,148
1,999
429
169
(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)