নাগা আন্দোলনের অন্যতম প্রধান পুরুষ এস এস খাপলাং এ দিন মায়ানমারের টাগায়, সন্ধ্যা ৬টা নাগাদ শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। ১৯৪০ সালে মায়ানমারের পাংসাউ পাসের কাছে ওয়াকথাম গ্রামে তাঁর জন্ম। তাই তাঁকে মায়ানমারের নাগা হিসেবে মানত সে দেশের সরকার। সেই সুবাদে এনএসসিএন খাপলাং বাহিনী সে দেশে নিরাপদ আশ্রয় ও স্বশাসিত এলাকার সুবিধে পেয়েছে। ২০১৫ সালে তিনি ভারত সরকারের সঙ্গে সংঘর্ষবিরতি ভঙ্গ করেন। খাপলাং বর্তমানে উত্তর-পূর্বের জঙ্গি সংগঠনগুলির যৌথ মঞ্চ ইউএনএলএফডব্লু-র প্রধান ছিলেন। আলফা স্বাধীনের মুখপাত্র অরুণোদয় অসমের মতে উত্তর-পূর্বে স্বাধীনতা আন্দোলনের অন্যতম জনক ছিলেন খাপলাং। তাঁর মৃত্যু অপূরণীয় ক্ষতি। নাগা জঙ্গি সংগঠনগুলিও তাঁর আত্মার প্রতি শ্রদ্ধা জানায়।
১৯৬৪ সালে ভারত সরকারের দখলদারির বিরুদ্ধে ‘নাগা ডিফেন্স ফোর্স’ তৈরি করেন খাপলাং। পরে হন ‘ইস্টার্ন নাগা রেভেলিউশনারি কাউন্সিলে’র সভাপতি। নাগা আন্দোলনের জনক এ জেড ফিজোর অধীনে ‘এনএনসি’তে যোগ দেন খাপলাং। তিনি, ইসাক চিসি সু ও থুইংলেং মুইভা পরে প্রশিক্ষণ নিতে চিনে যান। কিন্তু ১৯৭৫ সালে এনএনসি ভারত সরকারের সঙ্গে শিলং চুক্তি করলে সেই চুক্তির প্রতিবাদে সু, খাপলাং ও মুইভা দলত্যাগ করে ১৯৮০ সালে ‘এনএসসিএন’ গড়েন। ১৯৮৮ সালের এপ্রিলে খাপলাং পন্থী ও মুইভা পন্থীদের মধ্যে তুমুল সংঘর্ষের পরে এনএসসিএন দু’ভাগ হয়ে যায়। ২০০৯ সালে নিজের গড়া দল থেকেই খাপলাংকে ‘বহিষ্কার’ করে দেন তাঁর দুই অনুগামী খুলে কন্যাক ও কিতোভি জিমোমি। তখন থেকেই পুরোদস্তুর মায়ানমারের টাগায় শিবির করেন খাপলাং। ওই শিবিরেই আশ্রয় নেন আলফা স্বাধীন নেতা পরেশ বরুয়া। পরে কেএলও, এনডিএফবিরও প্রধান ঘাঁটি হয় টাগা। খাপলাং বাহিনী সূত্রে খবর আপাতত ভাইস চেয়ারম্যান খাংঘো কন্যাককে ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের পদে বসানো হয়েছে। জন্মস্থান মায়ানমারের ওয়াংখাম গ্রামে খাপলাংয়ের শেষকৃত্য হবে।
আরও পড়ুন
উরিতে ফের অনুপ্রবেশের চেষ্টা, ভারতীয় সেনার গুলিতে নিকেশ ৫ জঙ্গি
এনএসসিএন আই-এমের এক মাথা ইসাক সু গত বছর মারা গিয়েছেন। মুইভা সংগঠনের নেতৃত্ব দিলেও তিনি আদতে মণিপুরের টাংখুল হওয়ায় নাগাদের একাংশ তাঁকে মন থেকে মানে না। এখন আই-এমের সঙ্গে ভারতের শান্তি চুক্তি হওয়ার পথে। মুইভা খুলে-কিতোভিদের দলে টানলেও খাপলাংরা ২০১৫ সালে সংঘর্ষবিরতি ভঙ্গ করে। এর পর একের পর এক নাশকতা চালিয়েছে তারা। আলফা, এনডিএফবি, কেএলও, মণিপুরের ৭টি সংগঠনকে এক ছাতার তলায় এনে ‘ইউএনএলএফডব্লু’ তৈরি করেছিলেন খাপলাং।
দীর্ঘদিন ধরেই অসুস্থ ছিলেন তিনি। আগে ভর্তি ছিলেন ইয়াঙ্গনের হাসপাতালে। পরে টাগাতেই রাখা হয় তাঁকে। শেষ দিন পর্যন্ত স্বাধীন নাগাভূমির জন্য সরব ছিলেন খাপলাং। খাপলাংয়ের তিন ছেলে ও এক মেয়ে জঙ্গি আন্দোলন থেকে দূরে। তাই তিনি অসুস্থ হওয়ায় যৌথ মঞ্চের রাশ পরেশ বরুয়া হাতে নেওয়ার চেষ্টা চালান। কিন্তু পরেশের কর্তৃত্ব নাগাবাহিনীর দুই প্রধান ইসাক সুমি ও নিকি সুমি মানতে চায়নি বলে দলীয় সূত্রে খবর। খাপলাং মারা যাওয়ার পরে ইউএনএলএফডব্লুর নেতৃত্ব নিয়ে তাই বিবাদ বাধতে চলেছে বলে আসাম রাইফেলসের এক কর্তার মত। শুরু হতে পারে গোষ্ঠীদ্বন্দ্ব। খাপলাংয়ের মায়ানমারে জন্মের সূত্রে মায়ানমার সরকার তাঁর সংগঠনকে আশ্রয় দিলেও তিনি মারা যাওয়ার পরে সে দেশের সেনা ভারতীয় জঙ্গিদের উৎখাত করতে পারে। কারণ খাপলাং না থাকলে ‘তাতমাদাও’ বা বর্মি সেনার সঙ্গে তাঁর চুক্তিও থাকছে না। কাচিন জঙ্গিরাও খাপলাংকে মান্য করত। এখন পরেশকে তারা নাও মানতে পারে। সব মিলিয়ে সতর্ক করা হয়েছে সেনা ও সীমান্তরক্ষীদের। অবশ্য সেনাকর্তাদের মতে, ইউএনএলএফডব্লু গড়ে, উত্তর-পূর্ব ভারতে ছায়াযুদ্ধ চালানো আসলে চিনের মস্তিষ্কপ্রসূত। তাই, মায়ানমারে যৌথ মঞ্চের নেতৃত্বের সংঘাত চিনই সামলাবে। কারণ, সব জঙ্গি সংগঠনের অস্ত্র ও রসদের টিকি বাঁধা চিনের হাতে।