কাঁটা তুলতে সংসদে রুদ্রমূর্তি দেখিয়ে খোদ প্রধানমন্ত্রীর প্রশংসা কুড়িয়েছিলেন। ৪৮ ঘণ্টার মধ্যেই উলটপুরাণ! নিজের পাশাপাশি দল এবং সরকারকেও তুমুল অস্বস্তিতে ফেলে দিলেন স্মৃতি ইরানি।
স্মৃতি আজ সুধা হয়ে ওঠার বদলে কাঁটা হয়ে গেলেন বিজেপির কাছে! স্মৃতি-কাঁটার নাম রোহিত ভেমুলা।
হায়দরাবাদ বিশ্ববিদ্যালয়ের এই মেধাবী ছাত্রের আত্মহত্যা নিয়ে বিরোধীদের লাগাতার আক্রমণের জবাব দিতে বুধবার সংসদে পাল্টা আক্রমণের নীতি নিয়েছিলেন কেন্দ্রীয় মানবসম্পদ উন্নয়নমন্ত্রী। কিন্তু সে দিন তিনি সংসদে দাঁড়িয়ে যা বলেছিলেন, ক্রমশ দেখা যাচ্ছে তাতে বিস্তর গরমিল! রোহিতের দেহ প্রথম পরীক্ষা করেন যে চিকিৎসক, সেই রাজর্ষি মালপথ গত কালই বলেছিলেন, স্মৃতি ঠিক বলেননি! আর আজ সুদূর হায়দরাবাদ থেকে দিল্লিতে ছুটে এসে রোহিতের মা রাধিকা ভেমুলা আরও তীব্র ভাষায় ছোট পর্দার এক সময়ের জনপ্রিয় মুখকে বিঁধে বললেন, ‘‘স্মৃতি, এটা কোনও সিরিয়াল নয়! এটা বাস্তব জীবন। প্রকৃত সত্যটা সামনে আনুন। তাকে বিকৃত করবেন না।’’
রাধিকা মুখ খোলায় পরিস্থিতি আরও জটিল হল বলেই মনে করছেন বিজেপি নেতারা। কংগ্রেস লুফে নিয়েছে রোহিত ভেমুলার মা ও বন্ধুদের এই আক্রমণকে। দলের নেতা মল্লিকার্জ্জুন খড়্গের কথায়, ‘‘রোহিতের পরিবার স্মৃতির বক্তব্যের সঙ্গে একমত নয়। তার মানে স্মৃতি দেশকে বিপথে চালিত করার চেষ্টা করছেন।’’ স্মৃতিকে বিঁধে বিএসপি নেত্রী মায়াবতী বলেছেন, ‘‘উনি (স্মৃতি) বলেছিলেন, ওঁর জবাবে আমি সন্তুষ্ট না হলে উনি নিজের মাথা কেটে আমার পায়ের কাছে রাখবেন। আমি বলছি, ওঁর জবাবে আমি তুষ্ট নই। এ বার উনি ওঁর মাথাটা দিন! যদিও জানি, উনি এমন কিছুই করবেন না!’’ আর সিপিএম নেতা সীতারাম ইয়েচুরি স্মৃতিকে তীব্র আক্রমণ করে বলেন, ‘‘আপনারা তো ওই বাচ্চা ছেলেটাকে আত্মহত্যার দিকে ঠেলে দিলেন! ওটা প্রায় খুন!’’
সংসদে স্মৃতি দাবি করছিলেন, রোহিতের মৃত্যুকে কেন্দ্র করে রাজনীতি হয়েছে। তেলেঙ্গনা পুলিশের রিপোর্ট তুলে ধরে স্মৃতি বলেছিলেন, ঝুলন্ত রোহিতকে নীচে নামানোর পর তাঁকে বাঁচানোর কোনও চেষ্টাই করা হয়নি। তাঁর কাছে কোনও চিকিৎসককে ঘেঁষতে দেওয়া হয়নি। হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ারও চেষ্টা হয়নি।
স্মৃতির ওই বয়ান সত্যি নয় বলে গত কালই জানিয়েছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের চিফ মেডিক্যাল অফিসার রাজর্ষি। আজ সেটাকেই হাতিয়ার করে রাধিকা এবং রোহিতের বন্ধুদের বক্তব্য, রাজর্ষির কথাতেই স্পষ্ট, স্মৃতি সংসদে ভুল তথ্য দিয়েছেন, যা অপরাধ। এ জন্য স্মৃতির বিরুদ্ধে কড়া ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য প্রধানমন্ত্রীর কাছে দাবিও জানিয়েছেন তাঁরা। এ দিন রোহিতের মা একই সঙ্গে বিঁধেছেন আর এক কেন্দ্রীয় মন্ত্রী বন্দারু দত্তাত্রেয়কে। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী হায়দরাবাদ গিয়ে বলেছিলেন, রোহিত দেশের সন্তান। অথচ তার কয়েক মাস আগেই কেন্দ্রীয় শ্রমমন্ত্রী বন্দারু দত্তাত্রেয় চিঠি লিখে রোহিত ও তাঁর সঙ্গীদের ‘দেশদ্রোহী’ বলে চিহ্নিত করে তাঁদের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ করতে অনুরোধ করেছিলেন স্মৃতিকে। এ দিন সেই প্রসঙ্গ টেনে রোহিতের ভাই রাজা বলেন, ‘‘প্রধানমন্ত্রী রোহিতকে দেশের সন্তান বলেছেন। আবার সেই প্রধানমন্ত্রীর মন্ত্রিসভার এক মন্ত্রী রোহিতকে দেশদ্রোহী বলে চিহ্নিত করেছেন! আর এক মন্ত্রী তাঁর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে উপাচার্যকে বলছেন!’’ প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে তাঁরই মন্ত্রিসভার সতীর্থদের এই মতপার্থক্য নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন রোহিতের বন্ধুরা। আর রাধিকার প্রশ্ন, ‘‘আমার ছেলের পরিচয় কী? সে কি দেশদ্রোহী না দেশের সন্তান?’’ তিনি বলেন, ‘‘মানবসম্পদ মন্ত্রক চিঠিতে আমার ছেলেকে দেশদ্রোহী হিসেবে ব্যাখ্যা করেছে। আমি জানতে চাই, আমার ছেলে কী ভাবে দেশদ্রোহী হল?’’
স্মৃতির বিরুদ্ধে তথ্য গোপনের অভিযোগও তুলেছেন রোহিতের পরিজনেরা। সংসদে রোহিতের একাধিক চিঠি পড়ে শুনিয়েছিলেন স্মৃতি। কিন্তু আজ রোহিতের ভাই জানান, বিশ্ববিদ্যালয়ে বৈষম্যের কারণে রোহিত যে আত্মহত্যা করতে যাচ্ছেন, তা জানিয়ে তিনি উপাচার্যকে একটি চিঠি দিয়েছিলেন। রাজার প্রশ্ন, ‘‘আত্মহত্যা সংক্রান্ত সেই চিঠিটি একবারও সামনে আনেননি স্মৃতি! কেন ওই চিঠিটি লুকোচ্ছেন, তার জবাব দিতে হবে ওঁকে।’’ রোহিতের বন্ধুদের কথায়, ‘‘বিজেপি বা সঙ্ঘ পরিবার সম্পর্কে রোহিতের কী ভাবনা ছিল, তাও সংসদকে জানানো উচিত ছিল স্মৃতির।’’ বন্ধুদের অভিযোগ, বিজেপি বা সঙ্ঘ পরিবারের যে তীব্র সমালোচনা রোহিত করেছিলেন, তা পরিকল্পিত ভাবেই সংসদে জানাতে চাননি স্মৃতি। পাছে দলের ভাবমূর্তির ক্ষতি হয়!