ভারতকে অ্যাপাচে যুদ্ধ-হেলিকপ্টারের এবং এম-৭৭৭ কামান (সামরিক পরিভাষায়, আল্ট্রালাইট হাউইৎজ়ার)-এর নতুন সংস্করণের যন্ত্রাংশ বিক্রি, রক্ষণাবেক্ষণ এবং সংশ্লিষ্ট সহায়তা পরিষেবা দেওয়ার প্রস্তাব অনুমোদন করল মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সরকার। ৪৮.২২ কোটি ডলারের (প্রায় ৪,৫৬৬ কোটি টাকা) এই সামরিক সহায়তা প্যাকেজ নয়াদিল্লি-ওয়াশিংটন প্রতিরক্ষা সহযোগিতাকে আরও নিবিড় করবে বলে মনে করা হচ্ছে।
মার্কিন ‘ডিফেন্স সিকিউরিটি কো-অপারেশন এজেন্সি’ (ডিএসসিএ) ১৭ জুন ফেডারেল রেজিস্টারে এই নোট প্রকাশ করেছে। ১৮ মে মার্কিন কংগ্রেসে বিদেশ দফতর সংক্রান্ত কমিটি তা আনুষ্ঠানিক অনুমোদন করেছে। ভারতীয় সেনা ব্যবহৃত ওই দুই অস্ত্রের লজিস্টিকস, প্রশিক্ষণ, প্রযুক্তিগত সহায়তা এবং মেরামতি ও রক্ষণাবেক্ষণ সংক্রান্ত বিষয় রয়েছে ওই তালিকায়। আমেরিকার ‘ফরেন মিলিটারি সেলস’ (এফএমএস) কর্মসূচির আওতায় অনুমোদিত এ ধরনের প্যাকেজের উদ্দেশ্য হল, আঞ্চলিক সামরিক ভারসাম্য আনা এবং মিত্র রাষ্ট্রগুলির সঙ্গে কৌশলগত বোঝাপড়া দৃঢ় করা। এ ক্ষেত্রে ট্রাম্প সরকারের অন্যতম ‘নিশানা’ চিন হতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে। প্রকাশিত খবরে দাবি, অ্যাপাচে প্যাকেজের মূল্য ১৯ কোটি ৮২ লক্ষ মার্কিন ডলার। এম-৭৭৭ প্যাকেজের মূল্য প্রায় ২৩ কোটি ডলার।
সেনা সূত্রের খবর, অ্যাপাচে কপ্টারের নতুন সংস্করণ ‘৬৪-ই’ একসঙ্গে ১২৮টি লক্ষ্যবস্তু চিহ্নিত করতে পারে। যুগপৎ আঘাত হানতে পারে ১২টি লক্ষ্যে। হেলফায়ার ক্ষেপণাস্ত্র এবং রকেটের পাশাপাশি অ্যাপাচেতে রয়েছে ৩০ এমএম অটোক্যানন, যা থেকে দু’মিনিটে ১,২০০ রাউন্ড গুলি ছোড়া যায়। প্রয়োজনে মিনিটে ২৮০০ ফুট উচ্চতায় উঠে যেতে পারে আমেরিকায় তৈরি এই যুদ্ধ কপ্টার। ভারতের পাশাপাশি আমেরিকা ও ইজ়রায়েলের বায়ুসেনা ওই হেলিকপ্টার ব্যবহার করে। মার্কিন বোয়িং সংস্থার তৈরি ২২টি অ্যাপাচে-৬৪ অ্যাটাক হেলিকপ্টার কেনার বিষয়ে ২০১০ সালে সিদ্ধান্ত নিয়েছিল তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিংহের সরকার। উদ্দেশ্য ছিল, দীর্ঘ দিন ধরে ব্যবহৃত সোভিয়েত জমানার এমআই-৩৫ অ্যাটাক হেলিকপ্টারগুলি ধাপে ধাপে সরিয়ে ভারতীয় বায়ুসেনাকে দেওয়া হবে অ্যাপাচে। ২০১৯-২০ সালে কয়েকটি অ্যাপাচে এসেছিল ভারতে। পঠানকোটে বায়ুসেনার ১২৫ হেলিকপ্টার স্কোয়াড্রনের পাইলটদের অ্যাপাচে কপ্টারের প্রশিক্ষণও শুরু হয়েছিল। সেগুলির যুদ্ধসক্ষমতায় বায়ুসেনা সন্তুষ্ট হওয়ায় ২০২০ সালে ছ’টি ‘অ্যাপাচে ৬৪-ই হেলিকপ্টার কেনার জন্য আমেরিকার সঙ্গে ৬০ কোটি ডলারের (প্রায় ৫১৭৮ কোটি টাকা) চুক্তি হয়েছিল ভারতের।
আরও পড়ুন:
অন্য দিকে, ২০১৭ সালে ১৪৫টি এম-৭৭৭ হাউইৎজ়ার কেনার জন্য আমেরিকার সঙ্গে প্রায় ৪ হাজার ৭৪৭ কোটি টাকার চুক্তি করেছিল ভারত। তার আগে ১৯৮০-র দশকে শেষ বার হাউইৎজ়ার কিনেছিল ভারত। বফর্সের সেই ১৫৫ এমএম কামান কেনার চুক্তিতে অনিয়মের অভিযোগকে কেন্দ্র করে উত্তাল হয়ে উঠেছিল ভারতের রাজনীতি। সরকার বদলে গিয়েছিল দিল্লিতে। সেই শেষ। তার পর থেকে এ পর্যন্ত ভারতীয় সেনার জন্য আর কোনও হাউইৎজ়ার কেনেনি ভারত সরকার। ইউপিএ সরকারের আমলে ভারতীয় সেনার গোলন্দাজ (আর্টিলারি) বাহিনী পার্বত্য এলাকায় ব্যবহারের জন্য আধুনিক এবং কম ওজনের হাউইৎজ়ার চেয়েছিল। কারণ, লাদাখ এবং অরুণাচল প্রদেশের বিভিন্ন চিন সীমান্তবর্তী দুর্গম এলাকায় বফর্স কামান পাঠানো খুবই কঠিন। টাইটেনিয়াম দিয়ে তৈরি হওয়ায় এম-৭৭৭ কামানগুলির ওজন ৪ টন। সহজেই এগুলিকে আকাশপথে হেলিকপ্টারের সাহায্যে ঝুলিয়ে যে কোনও এলাকায় পৌঁছে দেওয়া যায়। ১৬ হাজার ফুট উচ্চতার সীমান্ত চৌকিতেও এম-৭৭৭ পাঠানো যায় অনায়াসেই। ২৪ কিলোমিটার থেকে ৪০ কিলোমিটার দূরবর্তী স্থানে ভারী গোলাবর্ষণে সক্ষম এই ১৫৫ এমএম কামান।