অন্তর্বর্তী সমঝোতা হল। ভারতীয় পণ্যের উপর শুল্ক কমাল আমেরিকা। কিছু ক্ষেত্র পুরোপুরি শুল্কমুক্তও করে দিল। কিন্তু এর মাসুল গুনতে হল কি দিল্লিকে? আমেরিকার বাজারে আরও বেশি জায়গা পেতে কিছু ক্ষেত্রে নমনীয় হতে হল ভারতকে। যে কৃষিক্ষেত্রকে এত দিন আগলে রাখা হয়েছিল, তা-ও আংশিক খুলে দিতে হল আমেরিকার জন্য। যদিও দিল্লি জানাচ্ছে, কৃষির ‘সংবেদনশীল’ ক্ষেত্রগুলি এখনও সুরক্ষিতই রয়েছে।
নয়াদিল্লির বক্তব্য, সংবেদনশীল কৃষিজাত ও দুগ্ধজাত পণ্যের ক্ষেত্রে ভারতীয় কৃষকদের স্বার্থে কোনও কোপ পড়বে না। যেমন, ভুট্টা, চাল, গম, সয়াবিন, পোলট্রিজাত পণ্য, দুধ, চিজ়, তামাক, ইথানল (জ্বালানি)— এ গুলির ক্ষেত্রে কোনও শুল্কছাড় দেয়নি ভারত। এই ক্ষেত্রগুলিতে শুল্ক যেমন ছিল, তেমনই থাকবে।
যৌথ বিবৃতি অনুযায়ী, বাদাম, তাজা ফল, সয়াবিন তেল, পশুখাদ্য হিসাবে ব্যবহৃত শুকনো খাদ্যশস্য বা ডিডিজিএস (ডিস্টিলার্স ড্রায়েড গ্রেইনস উইথ সলিউবল্স), পশুখাদ্যের লাল জোয়ার এবং ‘অতিরিক্ত পণ্য’-এর জন্য আমেরিকাকে প্রবেশ করতে দেওয়া হচ্ছে ভারতের বাজারে। আপাত ভাবে দেখলে, এই চুক্তিতে ভারতের বিশেষ উদ্বেগের কিছু নেই। কারণ, যে ক্ষেত্রগুলিতে আমেরিকার জন্য দরজা খোলা হয়েছে— তা ভারতে খুব বেশি উৎপাদন হয় না। একাংশের ব্যাখ্যায়, যে কৃষিজ পণ্যগুলির জন্য দরজা খোলা হয়েছে, তা উচ্চবিত্ত পরিবারেই ব্যবহারের চল বেশি। ফলে প্রান্তিক কৃষকদের জন্য তা সেই অর্থে হুমকির কারণ নয় বলে ব্যাখ্যা করছেন অনেকে।
আপাত ভাবে বিষয়টি সহজ-সরল দেখালেও বাস্তবে তেমন না-ও হতে পারে। কারণ, যৌথ বিবৃতিতে উল্লেখিত সেই ‘অতিরিক্ত পণ্য’ (অ্যাডিশনাল প্রোডাক্ট্স)। অন্তর্বর্তী সমঝোতার শুরুতেই এই ‘অতিরিক্ত পণ্য’-র কথা বলা থাকলেও, এ বিষয়ে বিস্তারিত কোনও বর্ণনা করা নেই। ফলে এই ‘অতিরিক্ত পণ্য’ বলতে কী বোঝানো হয়েছে, তা স্পষ্ট নয়।
পশুখাদ্যে লাভ, সয়াবিনে কোপ?
অন্তবর্তী সমঝোতায় জ্বালানি ক্ষেত্রে ইথানলের উপরে আমেরিকাকে কোনও প্রবেশাধিকার দেয়নি ভারত। তবে ডিডিজিএস বা শুকনো খাদ্যশস্যের জন্য দরজা খুলে দেওয়া হয়েছে। মূলত ভুট্টা বা অন্য শস্য থেকে ইথানল জ্বালানি তৈরির পর কাঁচামালের অবশিষ্টাংশ থেকে এটি তৈরি হয়। এর মধ্যে থাকে প্রোটিন। এই ডিডিজিএস সাধারণত গবাদি পশুর খাবার হিসাবে ব্যবহার হয়। তবে ভারতে পোলট্রি (হাঁস-মুরগি), গবাদি পশু এবং মৎস্য প্রতিপালনে এই খাবারের ব্যবহারের চল বেশি নেই। এ দেশে সাধারণত সয়াবিন, তুলোরবীজ, চিনাবাদাম, সরষের বীজ বা ধানের কুঁড়ো থেকে তেল বার করার পরের অবশিষ্টাংশ ‘ডিঅয়েল্ড কেক’ (ডিওসি) ব্যবহার হয় এ সব ক্ষেত্রে।
সয়াবিন থেকে তৈরি ডিওসি-তে প্রোটিনের হার অনেকটা বেশি। তবে তা ডিডিজিএস-এর তুলনায় ব্যয়বহুল। এ দেশে বর্তমানে ৪৬ শতাংশ প্রোটিনযুক্ত সয়াবিন ডিওসি প্রতি কেজি ৪৩-৪৪ টাকায় বিক্রি হয়। অন্য দিকে, চাল থেকে পাওয়া ৪২ শতাংশ প্রোটিনযুক্ত ডিডিজিএস এর দাম প্রতি কেজি ৩০ টাকার আশপাশে। আবার ২৭ শতাংশ প্রোটিনযুক্ত ভুট্টার ডিডিজিএস-এর দাম আরও কম, কেজি পিছু প্রায় ২৪-২৪.৫০ টাকা। আমেরিকা থেকে আমদানি করা হলে এই পণ্য আরও সস্তা হবে বলে মনে করা হচ্ছে।
তবে এই বাণিজ্যিক দর কষাকষিতে ক্ষতির মুখে পড়তে পারেন ভারতের সয়াবিন চাষিরা। প্রতি ১০০ কেজি সয়াবিন প্রক্রিয়াজাত করার পরে তা থেকে ১৮ কেজি তেল এবং প্রায় ৮২ কেজি ডিওসি পাওয়া যায়। আমেরিকা থেকে ডিডিজিএস ভারতে এলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতির মুখে পড়তে পারেন দেশের সয়াবিন চাষিরা। কারণ, শুধু ডিডিজিএস-ই নয়, স্বল্প শুল্কে আমেরিকার সয়াবিন তেলকেও এ দেশে প্রবেশাধিকার দেওয়া হচ্ছে। ভারতে প্রায় ১ কোটি ৩০ লক্ষ হেক্টর জমিতে সয়াবিন চাষ হয়। যার সিংহভাগই হয় মধ্যপ্রদেশ, মহারাষ্ট্র এবং রাজস্থানে। আমেরিকার পণ্য এ দেশে প্রবেশ করলে ভারতের এই সয়াবিন চাষিরা ধাক্কা খেতে পারেন।
ভারত কী কী ছাড়ল
মার্কিন শুল্ক কমানোর পরিবর্তে আমেরিকার বেশ কিছু শর্ত মানতে হয়েছে ভারতকে। আমেরিকার কাছ থেকে আগামী পাঁচ বছরে ৫০ হাজার কোটি ডলারের (ভারতীয় মুদ্রায় ৪৫ লক্ষ কোটি টাকার বেশি) পণ্য আমদানি করতে সম্মত হয়েছে নয়াদিল্লি। আমেরিকার সকল বাণিজ্যিক পণ্য এবং বিভিন্ন খাদ্য ও কৃষিপণ্যের উপর থেকে ভারত হয় শুল্ক সম্পূর্ণ প্রত্যাহার করে নেবে, নয়তো তার পরিমাণ কমাবে। ভারতের বাজারে মার্কিন চিকিৎসা সরঞ্জামের ব্যবসায় বেশ কিছু বাধা ছিল। সেগুলির মোকাবিলা করতে রাজি হয়েছে দিল্লি। মার্কিন তথ্য ও যোগাযোগ পণ্যের (আইসিটি) বাণিজ্যে সীমাবদ্ধ আমদানি লাইসেন্সিং পদ্ধতির জন্য এত দিন যে দেরি হত, ভারত তা-ও সরিয়ে নেবে।
আমেরিকা থেকে যে ৪৫ লক্ষ কোটি টাকার মার্কিন পণ্য ভারতকে কিনতে হবে, তার মধ্যে খনিজ তেল, গ্যাস, রান্নার কয়লা, বিমান, বিমানের যন্ত্রাংশ, দামি দামি ধাতু এবং প্রযুক্তিগত পণ্য। এ ছাড়া, ডেটা সেন্টারের কাজে লাগে, এমন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ভিত্তিক পণ্যও আমেরিকার কাছ থেকে কিনতে হবে ভারতকে।
আমেরিকা কী কী ছাড়ল
অন্তর্বর্তী বাণিজ্য-সমঝোতা কার্যকর হলে ভারতীয় পণ্যে আমদানি শুল্কের পরিমাণ কমিয়ে ১৮ শতাংশ করবে। এর ফলে ভারতের বস্ত্র, চামড়া, জুতো, প্লাস্টিক, রবার, গৃহসজ্জা, রাসায়নিক, বিভিন্ন যন্ত্রাংশ এবং দেশীয় হস্তশিল্পের জন্য আমেরিকার দরজা খুলে যাবে। শুধু তা-ই নয়, বিভিন্ন ভারতীয় পণ্যের উপর কোনও শুল্ক নেবে না আমেরিকা। এই তালিকায় রয়েছে বিভিন্ন ওষুধ, হিরে এবং মূল্যবান পাথর এবং বিমানের যন্ত্রাংশ। প্রধানমন্ত্রী জানিয়েছেন, ভারত-মার্কিন দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য-সমঝোতা দেশের কৃষক, উদ্যোগপতি, ক্ষুদ্রশিল্প, মৎস্যজীবীদের কাছে নতুন সম্ভাবনার দরজা খুলে দেবে।
আমেরিকার বাজারে ৫০ শতাংশ শুল্কের কারণে ভারতের বস্ত্রশিল্পের উপর বিরূপ প্রভাব পড়তে শুরু করেছিল। কারণ, এশিয়ার দেশগুলির মধ্যে বস্ত্রশিল্পের ভারতের দুই প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী বাংলাদেশ এবং ভিয়েতনাম। উভয় দেশেরই মার্কিন শুল্কের হার ভারতের তুলনায় কম। ফলে আমেরিকার বাজারে কিছুটা ধাক্কা খেতে হচ্ছিল ভারতীয় বস্ত্রকে। অন্তর্বর্তী বাণিজ্য সমঝোতায় তা কিছুটা হলেও কমবে বলে মনে করা হচ্ছে। কেন্দ্রের দাবি, এর ফলে ভারতীয় বস্ত্রশিল্পের জন্য আমেরিকায় ১১,৮০০ কোটি ডলারের বাজার খুলে যাবে।
সমঝোতা নিয়ে রাজনীতি
ভারত এবং আমেরিকার বাণিজ্য-সমঝোতা নিয়ে ইতিমধ্যে কেন্দ্রকে খোঁচা দিয়েছে কংগ্রেস। তাদের দাবি, এটি কোনও সমঝোতাই নয়। আসলে আমেরিকার কাছে ‘আত্মসমর্পণ’ করা হয়েছে বলে দাবি কংগ্রেস শিবিরের। দিল্লিতে সাংবাদিক বৈঠক ডেকে কংগ্রেস নেতা পবন খেরা বলেন, “ভারতের আদর্শ এবং গত ৭৫ বছর ধরে দেশ যে নীতির উপর দাঁড়িয়ে ছিল, এই সমঝোতা তার প্রতি বিশ্বাসঘাতকতা করেছে। এই সমঝোতায় দেশের স্বার্থের কথা বিবেচনা করা হয়নি। সম্পূর্ণ ভাবে (আমেরিকার কাছে) সঁপে দেওয়া হয়েছে।”
কংগ্রেসের আরও দাবি, “এই সমঝোতার মাধ্যমে ভারতকে একটি ডাম্পিং গ্রাউন্ডে পরিণত করা হয়েছে। এটিকে কোনও চুক্তি বলা যায় না। কারণ চুক্তি হয় সমানে সমানে এবং সেখানে মুখোমুখি বসে আলোচনা করা হয়। মাথায় বন্দুক ঠেকিয়ে কোনও চুক্তি হতে পারে না। এটা ব্ল্যাকমেল। এটা আত্মসমর্পণ।”
যদিও কংগ্রেসের এই যুক্তিকে পুরোপুরি উড়িয়ে দিয়েছে বিজেপি শিবির। কেন্দ্রীয় সরকারের বক্তব্যকেই বার বার প্রচার করছে তারা বিজেপির দাবি, দেশের কৃষি এবং দুগ্ধ ক্ষেত্রে সম্পূর্ণ ভাবে সুরক্ষিত রয়েছে। দেশবাসীর মনে ‘সন্দেহ এবং বিভ্রান্তি’ ছড়ানোর জন্যই কংগ্রেস এই ভাবে বিষয়টির প্রচার করছে বলে পাল্টা দাবি বিজেপির।