শেষ পর্যন্ত বিশ্বকাপে সবচেয়ে বড় অঘটন ঘটল না। ওয়াংখেড়েতে আমেরিকাকে হারিয়েই টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ শুরু করল ভারত। তবে এই প্রত্যাশিত জয়ে ভারত যে ভাবে ব্যাট করল তা অপ্রত্যাশিত ছিল। সূর্যকুমার যাদব বাদে ব্যর্থ ভারতের ব্যাটিং। প্রথমে ব্যাট করে ২০ ওভারে ৯ উইকেট হারিয়ে ১৬১ রান করল ভারত। সূর্য করলেন ৮৪ রান। যদিও সেই রানই আমেরিকার সামনে বড় হয়ে দাঁড়াল। ভারতীয় বোলারদের নিয়ন্ত্রিত বোলিংয়ে খেই হারাল আমেরিকা। তাদের ২৯ রানে হারিয়ে বিশ্বকাপ শুরু করল ভারত। ম্যাচ জিতলেও ভারতকে চিন্তায় রাখল দলের ব্যাটিং।
খেলা শুরুর আগে সঞ্চালিকা মায়ান্তি ল্যাঙ্গার বলছিলেন, “আমরা কি টি২০ ক্রিকেটে প্রথম বার ৩০০ রান দেখব?” অর্থাৎ, ভারতের বিরুদ্ধে আমেরিকাকে ধর্তব্যের মধ্যেই রাখেননি তিনি। ভারতও কি আমেরিকাকে খুব হালকা ভাবে নিয়েছিল। নাকি ওয়াংখেড়ের পিচই বুঝতে পারেননি অভিষেক শর্মারা। নইলে যে পিচে সব বলে শট খেলা কঠিন, সেটাই করতে গেলেন তাঁরা। ফলে যা হওয়ার তাই হল। পর পর উইকেট হারিয়ে নিজেদের চাপে ফেললেন ভারতীয় ব্যাটারেরা। কঠিন সময়ে সূর্য দেখিয়ে দিলেন, তাঁর ফর্মে থাকা ভারতীয় দলের জন্য কতটা প্রয়োজন।
টস হেরে ব্যাট করতে নেমে দ্বিতীয় ওভারেই আউট হন অভিষেক। প্রতি ম্যাচে প্রথম বলে বড় শট মারার চেষ্টা করেন তিনি। কখনও লাগে। কখনও লাগে না। এই ম্যাচে লাগল না। আলি খানের বলে শূন্য রানে ফিরলেন অভিষেক। শেষ ছয় ইনিংসে তিন বার প্রথম বলে শূন্য করলেন অভিষেক। বিশ্বের সেরা টি-টোয়েন্টি ব্যাটারের পক্ষে এই পরিসংখ্যান ভাল নয়।
ঈশান কিশন ও তিলক বর্মা ভাল খেলছিলেন। তবে দৌড়ে রানের বদলে বড় শটের উপরেই নির্ভর করছিলেন তাঁরা। কিন্তু এই পিচে দৌড়ে রান নিতে না পারলে সমস্যা। সেটাই হল। ভারতকে বড় ধাক্কা দিলেন শ্যাডলে ফান শকউইক। পাওয়ার প্লে-র শেষ ওভারের দ্বিতীয় বলে ঈশানকে আউট করলেন তিনি। ১৬ বলে ২০ করেন ভারতীয় ওপেনার। পঞ্চম বলে তিনি ফেরান তিলক বর্মাকে। ১৬ বলে ২৫ করলেন তিলক। পরের বলেই শূন্য রানে ফিরলেন শিবম দুবে। তিন ব্যাটারকেই বলের গতির হেরফেরে পরাস্ত করলেন শকউইক। ৪৫ রানে ১ উইকেট থেকে ৪৫ রানে ৪ উইকেট পড়ে যায় ভারতের।
পাওয়ার প্লে-র পর জুটি গড়ার চেষ্টা করেন অধিনায়ক সূর্য ও রিঙ্কু সিংহ। কিন্তু রান তোলার গতি অনেকটাই কমে যায়। একটা সময় টানা ২৭ বলে কোনও বাউন্ডারি মারতে পারেনি ভারত। রিঙ্কুর ব্যাটে-বলে হচ্ছিল না। ফুলটস বলেও হাত খুলতে পারছিলেন না। অবশেষে ১৪ বলে ৬ রান করে আউট হলেন তিনি। রান পাননি হার্দিক পাণ্ড্যও (৫)। ৭৭ রানে ৬ উইকেট পড়ে গিয়েছিল ভারতের। তখনও প্রায় ৮ ওভার খেলা বাকি।
ওয়াংখেড়ে তখন স্তব্ধ। দর্শকেরা হতাশ হয়ে বসে। ঠিক তখনই ঘরের ছেলে সূর্য বোঝালেন, কঠিন পিচে কী ভাবে খেলতে হয়। এই মাঠকে হাতের তালুর মতো চেনেন তিনি। কঠিন সময়ে দৌড়ে রানের উপর জোর দিলেন তিনি। খারাপ বল পেলে মারছিলেন। পিচ মন্থর হওয়ায় সামনে মারার বদলে স্কোয়্যারে খেলার চেষ্টা করছিলেন বেশি। কাজে লাগল তাঁর পছন্দের সুইপ শট।
তবে তার মাঝেই এক বার ক্যাচ দিয়েছিলেন সূর্য। কঠিন ক্যাচ ফস্কান আলি খান। সেটি কাজে লাগান সূর্য। অক্ষর পটেলের সঙ্গে ৪১ রানের জুটি গড়েন তিনি। অক্ষর ১৪ রানে আউট হওয়ার পর হাত খোলেন সূর্য। কারণ, তিনি ছাড়া আর কোনও ব্যাটার বাকি ছিল না। উইকেটের পিছনে, সামনে একের পর এক বড় শট মারেন তিনি। কেন তাঁকে ৩৬০ ডিগ্রি ক্রিকেটার বলা হয়, তা দেখালেন সূর্য। যেখানে বাকি কেউ দাঁড়াতে পারলেন না, সেখানে দলকে টেনে নিয়ে গেলেন তিনি। শেষ ৫ ওভারে ৬৯ রান হল ভারতের। ২০ ওভারে ৯ উইকেট হারিয়ে ১৬১ রান করল ভারত। ৪৯ বলে ৮৪ রানে অপরাজিত থাকলেন সূর্য। ভারত অধিনায়ক হিসাবে বিশ্বকাপের প্রথম ম্যাচে ভরসা জোগালেন সূর্য।
আমেরিকার বোলারদের মধ্যে নজর কাড়লেন শকউইক। চার ওভারে ২৫ রান দিয়ে ৪ উইকেট নিলেন তিনি। তবে দিনটা খারাপ গেল গত বারের টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে ভারতের বিরুদ্ধে নজরকাড়া সৌরভ নেত্রভলকরের। চার ওভারে ৬৫ রান দিলেন তিনি। যা টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের ইতিহাসে সবচেয়ে খারাপ স্পেল। একটিও উইকেট পাননি এই বাঁহাতি পেসার।
আরও পড়ুন:
ভারতের ইনিংস দেখেই বোঝা যাচ্ছিল, আমেরিকার ব্যাটারেরাও এই পিচে সমস্যায় পড়বেন। হলও তাই। দ্বিতীয় ওভারেই দলের প্রধান ভরসা আন্দ্রিস গৌস ৬ রান করে আউট হলেন। হর্ষিত রানা চোট পেয়ে ছিটকে যাওয়ায় শেষ মুহূর্তে বিশ্বকাপের দলে সুযোগ পেয়েছেন মহম্মদ সিরাজ। প্রথম ম্যাচে খেলতে নেমে শুরুতেই আমেরিকাকে বড় ধাক্কা দিলেন তিনি। পরের ওভারে অধিনায়ক মোনাঙ্ক পটেলকে (০) ফেরালেন অর্শদীপ সিংহ। চতুর্থ ওভারে আবার উইকেট নিলেন সিরাজ। ২ রানের মাথায় আউট হলেন সাইতেজা মুক্কামাল্লা। ১৩ রানে ৩ উইকেট পড়ে যায় আমেরিকার।
সেখান থেকে জুটি বাঁধেন মিলিন্দ কুমার ও সঞ্জয় কৃষ্ণমূর্তি। রান তোলার গতি বেশি না হলেও উইকেটে পড়েছিলেন তাঁরা। মাঝে মাঝে বড় শট খেলছিলেন। অক্ষর ও হার্দিককে নিশানা করেন তাঁরা। ৫৮ রানের সেই জুটি ভাঙেন বরুণ চক্রবর্তী। ঈশানের হাতে ৩৪ রানের মাথায় স্টাম্প আউট হন তিনি। বল ভাল ভাবে ধরতে পারেননি ঈশান। কিন্তু মিলিন্দ ভাবেন বল তাঁর হাত থেকে বেরিয়ে গিয়েছে। ফলে ক্রিজ় ছেড়ে বেরিয়ে আসেন তিনি। আর ঢুকতে পারেননি। ৭১ রানে চতুর্থ উইকেট হারায় আমেরিকা।
শেষ ৬ ওভারে আমেরিকার দরকার ছিল ৭৩ রান। সঞ্জয় ভাল খেলছিলেন। শুভম রঞ্জনে নেমেও হাত খোলেন। জরুরি রানরেট বাড়তে থাকলেও লড়াই থামায়নি আমেরিকা। কিন্তু বড় শট মারা ছাড়া উপায় ছিল না। সেটা করতে গিয়ে ৩১ বলে ৩৭ রানে আউট হলেন সঞ্জয়। ভাল ক্যাচ ধরলেন রিঙ্কু। পরের বলেই হরমীত সিংহকে আউট করলেন অক্ষর। ৯৮ রানে ৬ উইকেট পড়ে আমেরিকার।
শেষ ২৪ বলে আমেরিকার দরকার ছিল ৬২ রান। সেই পরিস্থিতি থেকে জিততে হলে বিধ্বংসী ইনিংস খেলতে হত কাউকে। কিন্তু ৬ উইকেট পড়ে যাওয়ার পর দলে তেমন কোনও ব্যাটারও ছিল না। ফলে যা হওয়ার তাই হল। ২০ ওভারে ৮ উইকেট হারিয়ে ১৩২ রান করল তারা। ভারতীয় বোলারদের মধ্যে সিরাজ ৩, অক্ষর ২ এবং বরুণ ও অর্শদীপ ১ করে উইকেট নিলেন।
ভারতের ইনিংসের সময় সাজঘরে গম্ভীর মুখে বসেছিলেন গৌতম। জলপানের বিরতিতে মাঠে নেমে সূর্যদের পরামর্শও দেন তিনি। শেষ পর্যন্ত দল জিতলেও গম্ভীরের মুখে হাসি ফিরল না। বোঝা গেল, দলের খেলায় খুব একটা খুশি হতে পারেননি প্রধান কোচ।