কখনও রাতের পর রাত জেগে ডিউটি। কিংবা কখনও ঠাঠা রোদ, কখনও অঝোর বৃষ্টি মাথায় নিয়ে, কখনও হাড়কাঁপানো ঠান্ডায়। ছুটি নেই। মাঝে মাঝে জবাব দেয় শরীর। ভেঙে যায় মন। তবু বাস্তবের মাটিতে দাঁড়িয়ে ভারতীয় রেলকে আক্ষরিক অর্থে ‘চালান’ এঁরাই।
অথচ আগামিকাল ‘বিশ্ব যোগ দিবস’ ঘিরে কেন্দ্রীয় সরকারের কর্মসূচিতে এঁরা ব্রাত্য। মানে, রেলের চালক, সহ-চালক, গার্ড, স্টেশন মাস্টার, কেবিনম্যান, গ্যাংম্যানেরা। যোগাসনের মাধ্যমে শরীর ও মনকে চাঙ্গা রাখার ফরমান জারি হয়েছে শুধুমাত্র রেলের উঁচু তলার অফিসারদের জন্য। কাল দিল্লির রেলভবন-সহ নিজের নিজের
জোনের দফতরে বসে যোগাসনের বিশ্বরেকর্ড-যজ্ঞে সামিল হবেন এই বড়-মেজ বাবুরা। এবং সেটা শুধু এক দিনেই থেমে যাচ্ছে না। ভবিষ্যতেও ওই অফিসারদের নিয়মিত ভাবে যোগাসন জারি রাখার নির্দেশ দিয়েছে রেল মন্ত্রক।
আপাত ভাবে উদ্দেশ্য সাধু। কিন্তু রেলের ‘আম আদমি’রাই যোগ দিবসের ছুটি না পাওয়ায় প্রশ্ন উঠেছে রেলের অন্দরে। মন্ত্রকের অভ্যন্তরীণ সমীক্ষাই বলছে, রেলের চালক, গার্ড, কেবিনম্যান, গ্যাংম্যানরাই সবচেয়ে বেশি মানসিক অবসাদের শিকার। সেই অবসাদের কারণ কখনও অতিরিক্ত কাজের চাপ বা লাগাতার ওভারটাইম, কখনও যথেষ্ট বিশ্রাম না পাওয়া, কখনও পরিবারকে সময় দিতে না পারা। যার চাপে কেউ বেছে নিচ্ছেন আত্মহত্যার পথ, কারও কাজে গুরুতর ভুল ধরা পড়ছে। একাধিক রেল দুর্ঘটনার তদন্তে দেখা গিয়েছে, রেলকর্মীদের ত্রুটিই দুর্ঘটনা ডেকে এনেছে। অনেকে বলছেন, এই কর্মীদের চাপমুক্তি ঘটানো (‘ডি-স্ট্রেস’ করা) যে সবার আগে দরকার, ঘটা করে নিজেদের রিপোর্টেই তা উল্লেখ করেছে রেলের একাধিক কমিটি। অথচ কার্যক্ষেত্রে তাঁদের বাদ রেখেই যোগ দিবসে ‘যোগ’ দিচ্ছে রেল।
কেন যোগাভ্যাসে দেখা যাবে না চালক-গার্ডদের? রেল মন্ত্রকের যুক্তি, দেশ জুড়ে রেলকর্মীরা সবাই যদি যোগব্যায়াম করতে নেমে পড়েন, তা হলে আগামিকাল রেলটা চালাবে
কে? ভারতীয় রেল দিনে দু’কোটি মানুষকে গন্তব্যে পৌঁছে দেয়। তার দায় কে নেবে?
এই যুক্তি মানছেন না অনেকেই। ‘ইন্ডিয়ান রেলওয়ে লোকো রানিংম্যান অর্গানাইজেশন’-এর সভাপতি সঞ্জয় পান্ধির বক্তব্য, বছর কয়েক আগে উত্তরবঙ্গ এক্সপ্রেস বা সাম্প্রতিক হাম্পি এক্সপ্রেসে দুর্ঘটনার পিছনে
দায়ী সংশ্লিষ্ট চালকদের মানসিক অবস্থা। হাম্পি এক্সপ্রেসের চালক দুর্ঘটনার আগে টানা ২১ দিন টানা কাজ করছিলেন। যার মধ্যে ১৯ দিনই তাঁকে রাতে ট্রেন চালাতে হয়েছিল। এক বার এক চালক এতটাই মানসিক অবসাদে ভুগছিলেন যে, তিনি পানিপথের কাছে চলন্ত ট্রেন থেকে ঝাঁপ দেন। একই মানসিক অবস্থা সহকারী চালক, গার্ড বা স্টেশন মাস্টারদের। সঞ্জয়ের বক্তব্য, ‘‘আমরা সবাই জানি, অবসাদ কাটাতে যোগের কোনও বিকল্প নেই। কিন্তু সেটা যাঁদের সত্যিকারের দরকার, তাঁরা সেই সুফল পাচ্ছেন কি না দেখতে হবে। না হলে যোগ দিবস গিমিকই থেকে যাবে।’’
কী বলছে মন্ত্রক? রেল বোর্ডের সদস্য (কর্মিবর্গ) প্রদীপ কুমারের আশ্বাস, ‘‘সবাই এর সুফল পাবেন। তবে ধীরে ধীরে। আগামী ২০১৯-’২০ সালের মধ্যে রেলের সমস্ত কমর্চারীর জন্য যোগাসন বাধ্যতামূলক করাই আমাদের লক্ষ্য।’’