নিজের ঘরেই হয়তো সমস্যা সমাধানের সুযোগ ছিল। কিন্তু তাকে কাজে লাগানো গেল না।
ইরাকে অপহৃত ৪০ জন ভারতীয় শ্রমিককে উদ্ধারের জন্য যখন সৌদি আরব থেকে ইজরায়েলের মতো বিভিন্ন দেশের সাহায্য নেওয়ার কথা ভাবছে নয়াদিল্লি, তখন ফৌজি অফিসারদের মধ্যে এই হতাশাই তৈরি হয়েছে। সাদ্দাম হুসেনের জমানায় তাঁর সেনাবাহিনীকে প্রশিক্ষণ দিয়েছিল ভারতীয় সেনা। ভারতীয় সেনার একটি ‘মিলিটারি ট্রেনিং টিম’ বহু বছর ধরে ইরাকে মোতায়েন ছিল। সাদ্দাম হুসেনের সেই সেনাবাহিনীর অনেকেই এখন জঙ্গি সংগঠন আইএসআইএস-এর হয়ে লড়াই করছে। এই জঙ্গিরাই ভারতের ৪০ জন শ্রমিককে অপহরণ করে রেখেছে। জঙ্গি সংগঠনের সঙ্গে ইরাক সরকারের লড়াইয়ে আটকে পড়েছেন ভারতীয় নার্সরাও।
সামরিক বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, পুরনো সেই যোগাযোগকে কাজে লাগিয়ে এখন অপহৃত শ্রমিকদের উদ্ধারের চেষ্টা করা যেত। কিন্তু গত দশ বছরের ভুল নীতির ফলেই তাতে বাধা পড়ল।
কোথায় ভুল নীতি? বিদেশের যে কোনও ভারতীয় দূতাবাসে এক বা একাধিক সামরিক অফিসার নিযুক্ত থাকেন। কূটনৈতিক ভাষায় যাদের বলা হয় ডিফেন্স অ্যাটাশে। তাঁরাই সেই দেশের সামরিক বাহিনীর সঙ্গে যোগাযোগ রাখেন।
কিন্তু ইরাকে ভারতীয় দূতাবাসে গত দশ বছর ধরে কোনও ডিফেন্স অ্যাটাশে বা সামরিক অফিসার নেই। সেনাবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত লেফটেন্যান্ট জেনারেল প্রকাশ কাটোচের বক্তব্য, “ডিফেন্স অ্যাটাশেদের নিয়োগের বিষয়টি গত দশ বছ ধরে অবহেলিত হয়েছে। পশ্চিম এশিয়ার গুরুত্ব এবং সেখানে ভারতীয়দের উপস্থিতি সত্ত্বেও ইরাকের ভারতীয় দূতাবাসের কোনও সামরিক শাখা নেই।”
কেন এই হাল? বিদেশ মন্ত্রক সূত্রের বক্তব্য, ২০০৩ সালে আমেরিকা ইরাকে সামরিক অভিযান শুরু করে। একের পর এক নাশকতার ঘটনায় ইরাকে ভারতীয় দূতাবাসে কর্মী সংখ্যা কমিয়ে দেওয়া হয়। ২০০৪ থেকে ২০১১ সাল পর্যন্ত ইরাকে কোনও ভারতীয় রাষ্ট্রদূতই ছিলেন না। তার পর সুরেশ রেড্ডিকে নিয়োগ করা হয়। কিন্তু কোনও ডিফেন্স অ্যাটেশে নিয়োগ করা হয়নি।
লেফটেন্যান্ট জেনারেল কাটোচ বলেন, “এসবের আগে পর্যন্ত ইরাকি সেনার সঙ্গে ভারতীয় সেনার দারুণ সম্পর্ক ছিল। বহু বছর ধরে ভারতীয় সেনার প্রশিক্ষণ দল ইরাকে নিযুক্ত ছিল।” শুধু ইরাকি সেনা নয়, সাদ্দামের জমানায় যুদ্ধবিমানের পাইলটদেরও মিগ-২১ চালানোর প্রশিক্ষণ দিয়েছিলেন ভারতীয় বায়ুসেনার পাইলটরা।
কাটোচের মতো পোড় খাওয়া ফৌজি অফিসারদের বক্তব্য, সাদ্দামের সেনাবাহিনীর অনেকেই এখন জঙ্গি সংগঠন আইএসআইএস (ইসলামিক স্টেট অফ ইরাক অ্যান্ড আল-শাম)-এর হয়ে লড়াই করছেন। একই ভাবে সাদ্দামের বাথ পার্টির বহু নেতাও এখন এই জঙ্গি সংগঠনের সঙ্গে কাজ করছে। দু’টি শিবিরই সুন্নি সম্প্রদায়ের হলেও তাদের মতাদর্শ আলাদা। কিন্তু তাদের লক্ষ্য এক-প্রধানমন্ত্রী নুরি অল-মালিকির শিয়া প্রধান সরকারের পতন। সাদ্দামের জমানায় ভারতের সঙ্গে ইরাকের কূটনৈতিক সম্পর্ক খুবই ভাল ছিল। সেই যোগসূত্রকেও এখন কাজে লাগানো যেতে পারে বলে সামরিক বিশেষজ্ঞদের মত।
আইএসআইএস সংগঠনটি ইরাকে আল-কায়দারই উত্তরসূরি। ইরাক ও সিরিয়ায় তাদের প্রায় ১১ হাজার জঙ্গি লড়াই করছে। জঙ্গি সংগঠনের প্রধান আবু বকর আল-বাগদাদি নিজেকে ওসামা বিন লাদেনের ‘প্রকৃত উত্তরসূরি’ হিসেবে ঘোষণা করেছেন। তারা মসুলে হামলা চালানোর পরেই ভারতীয় গুপ্তচর সংস্থা র’ কেন্দ্রীয় সরকারকে সতর্ক করেছিল, ইরাকে কর্মরত ভারতীয়রা বিপদে পড়তে পারেন।
গোয়েন্দা কর্তাদের বক্তব্য, ইরাকে বহু দিন ধরেই বেশ কিছু ভারতীয় সংস্থা কাজ করছে। ইরাকের বিদ্যুৎ মন্ত্রকের বরাতে সে দেশের আল-আনবার প্রদেশে একটি গ্যাস বিদ্যুৎ প্রকল্প তৈরি করেছে ভারতীয় সংস্থা। আর একটি সংস্থা আবার নসিরিয়াতে আর একটি প্রকল্পের বরাত পেয়েছে। সেখানে বহু ভারতীয় কাজ করছেন।
সামরিক বিশেষজ্ঞদের মত, সকলের নিরাপত্তার কথা ভেবে আরও আগে থেকেই তৎপর হওয়া উচিত ছিল নয়াদিল্লির।