দলের সাধারণ সম্পাদক প্রকাশ কারাট জানিয়ে দিয়েছেন, কংগ্রেসের সঙ্গে জাতীয় বা রাজ্য স্তরে নির্বাচনী সমঝোতায় তাঁরা যাবেন না। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গে সিপিএমের সম্মেলন-পর্ব শুরু হতেই সেখানে ফের চর্চায় ফিরে এসেছে কংগ্রেস-বিতর্ক। যা থেকে ইঙ্গিত মিলছে, আগামী এপ্রিলে বিশাখাপত্তনমের পার্টি কংগ্রেসও এই প্রশ্নে সরগরম হতে পারে।
পশ্চিমবঙ্গে কয়েকটি জেলা এবং তার নীচে জোনাল স্তরের সম্মেলনেও এ বার কংগ্রেসের সঙ্গে ভবিষ্যতে হাত মেলানো হবে কি না, তা-ই নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন সিপিএমের প্রতিনিধিরা। সম্প্রতি দিল্লিতে পলিটব্যুরোর বৈঠকে সিপিএমের রাজ্য নেতৃত্ব যে রিপোর্ট দিয়েছেন, সেখানেও সম্মেলন-পর্বের নির্যাস জানাতে গিয়ে এই বিতর্কের কথা উল্লেখ করা হয়েছে বলে সূত্রের খবর। দার্জিলিঙের জেলা সম্মেলনে যেমন তৃণমূল বা বিজেপির মোকাবিলায় কংগ্রেসের সঙ্গে যাওয়ার ভাবনার প্রবল বিরোধিতা উঠেছে। সিপিএমের পলিটব্যুরোর এক নেতার কথায়, “২০০৯-এ শিলিগুড়ি পুরসভায় বামেদের সমর্থন নিয়ে কংগ্রেসের মেয়র বোর্ড গঠন করেছিলেন। সেই সিদ্ধান্ত নিয়ে যে নিচু তলায় এখনও ক্ষোভ রয়েছে, এ বারের সম্মেলন থেকেই তা স্পষ্ট।” বর্ধমানে জেলা কমিটির বিশেষ বৈঠকেও কংগ্রেসের সঙ্গে ভবিষ্যতে সমঝোতায় যাওয়ার বিরোধিতা করা হয়। দাবি ওঠে, গত দশকে দলের অভিমুখের পর্যালোচনা করতে হবে। বিতর্ক এড়াতে রাজ্য সম্পাদকমণ্ডলীর সদস্য মদন ঘোষ যুক্তি দেন, পার্টি কংগ্রেসে নতুন কী রণকৌশল নেওয়া হবে, তা ঠিক হয়নি। তার আগেই জেলা স্তরে এই আলোচনা অনধিকার চর্চা। জেলার এক প্রাক্তন সাংসদ পাল্টা যুক্তি দেন, কংগ্রেসের হাত ধরার প্রশ্নে কলকাতা থেকেই দলের নেতারা এক এক রকম কথা বলছেন! তাতেই বিভ্রান্তি তৈরি হচ্ছে!
বিভ্রান্তি কাটাতে কারাটরা দলের রণকৌশল নিয়ে প্রাথমিক পর্যালোচনার কাজ জানুয়ারিতেই সারতে চলেছেন। দিল্লিতে পলিটব্যুরো বৈঠকে সম্প্রতি রাজনৈতিক রণকৌশলের দলিলের খসড়া চূড়ান্ত হয়েছে। কিন্তু পলিটব্যুরোর বৈঠকে রাজ্য থেকে পাওয়া রিপোর্টে ঈষৎ চিন্তিত সিপিএমের শীর্ষ নেতৃত্ব। তাঁরা খবর পাচ্ছেন, ৭ বছর আগে নন্দীগ্রামে গুলি চালানোর ভূত এখনও তাড়া করছে কিছু সম্মেলনে! কোথাও কোথাও দাবি উঠছে, নন্দীগ্রাম-কাণ্ডের মতো বামফ্রন্ট জমানার শেষ ১০ বছরে যে ভুল হয়েছে, তার জন্য ক্ষমা চাইতে হবে। তা হলেই মানুষের সহানুভূতি ফিরে পাবে সিপিএম।
সূত্রের খবর, ডিসেম্বরে নকশালবাড়িতে দার্জিলিঙের জেলা সম্মেলনে কৃষক সভার কিছু নেতা প্রস্তাব আনেন, সিঙ্গুর ও নন্দীগ্রাম-কাণ্ডের জন্য মানুষের কাছে দলের ক্ষমা চাওয়া উচিত। দার্জিলিঙের ৮টির মধ্যে শিলিগুড়ি বাদ দিয়ে ৭টি জোনাল কমিটিই প্রস্তাব সমর্থন করে। অশোক ভট্টাচার্যের মতো নেতারা অবশ্য যুক্তি দেন, এ সব বিবাদের নিষ্পত্তি আগেই হয়ে গিয়েছে। তবু লিখিত আকারে ওই প্রস্তাব গ্রহণের দাবি থেকে পিছু হঠতে রাজি হচ্ছিলেন না কিছু প্রতিনিধি। দলের পলিটব্যুরোর সদস্য সূর্যকান্ত মিশ্র ও কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য মহম্মদ সেলিম সম্মেলনে হাজির ছিলেন। শেষে সূর্যবাবু যুক্তি দেন, বামফ্রন্ট সরকারের ৩৪ বছরের রাজত্বেরই পর্যালোচনা হবে। রাজ্য স্তরেই দল আত্মসমালোচনার সিদ্ধান্ত নিয়েছে, আলাদা করে এই নিয়ে প্রস্তাবের প্রয়োজনীয়তা নেই। একই ভাবে বর্ধমান জেলার বৈঠকেও বাম জমানার শেষ পর্বে সরকার ও দলীয় নেতৃত্বের সমালোচনা করে বলা হয়, নিচু স্তরে দলীয় গণতন্ত্র শেষ করে দেওয়া হয়েছে। কিছু নেতার হাতে ক্ষমতা কুক্ষিগত। তৃণমূলের জনপ্রিয়তা কমলেও তাই বামেরা সমর্থন পাচ্ছে না। শুদ্ধকরণ অভিযান হলেও দুর্নীতিগ্রস্ত নেতাদের বিরুদ্ধে সব ক্ষেত্রে ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। এ কে গোপালন ভবনের এক নেতার বক্তব্য, “বিজেপি-কে রুখতে কংগ্রেসের হাত ধরা নিয়ে পার্টি কংগ্রেসে বিতর্ক হবেই। কিন্তু নন্দীগ্রামে গুলি চালানো নিয়ে এখনও যদি ক্ষমা চাওয়ার দাবি ওঠে, রাজ্য নেতৃত্ব তা হলে চাপে পড়বেন।” দলীয় নেতৃত্ব আরও যুক্তি দিচ্ছেন, নন্দীগ্রামের পরে সেই ২০০৮ সালের রাজ্য সম্মেলনের দলিল থেকেই ওই ঘটনার জন্য আত্মসমালোচনা চলছে। এখন নতুন করে বিতর্ক খুঁচিয়ে লাভ নেই।