Advertisement
E-Paper

কাঁটাতারে বন্দি মানুষকে আশ্বাস জোগালেন ডিসি

৪ বছরের শিশু কিংবা ৮৪ বছরের বৃদ্ধ—কাছাড় জেলার নাতানপুর এলাকার সবাই এখন ‘মুক্তি’র অপেক্ষায়। তাদের কেউ কারাদণ্ডে দণ্ডিত নন। আশ্রয় শিবিরেও নেই। তবু আশ্রয় শিবিরের চেয়ে বেশি স্বাধীনতা তাঁরা পাননি।

উত্তম সাহা

শেষ আপডেট: ১৭ ডিসেম্বর ২০১৫ ০৪:২১
বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে শহিদ বারতীয় জওয়ানদের শ্রদ্ধার্ঘ্য। ‘বিজয় দিবসে’ আগরতলার শহিদ মিনারে রাজ্যপাল তথাগত রায়। বুধবার বাপি রায়চৌধুরীর তোলা ছবি।

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে শহিদ বারতীয় জওয়ানদের শ্রদ্ধার্ঘ্য। ‘বিজয় দিবসে’ আগরতলার শহিদ মিনারে রাজ্যপাল তথাগত রায়। বুধবার বাপি রায়চৌধুরীর তোলা ছবি।

৪ বছরের শিশু কিংবা ৮৪ বছরের বৃদ্ধ—কাছাড় জেলার নাতানপুর এলাকার সবাই এখন ‘মুক্তি’র অপেক্ষায়। তাদের কেউ কারাদণ্ডে দণ্ডিত নন। আশ্রয় শিবিরেও নেই। তবু আশ্রয় শিবিরের চেয়ে বেশি স্বাধীনতা তাঁরা পাননি।

ছোট্ট গ্রামটির তিন দিক কাঁটাতার দিয়ে ঘেরা। অন্য দিকে, বাংলাদেশের সঙ্গে নদী-সীমান্ত। ফলে কারাদণ্ড না হলেও গত প্রায় এক দশক ধরে কার্যত নাতানপুরবাসী জেলেই আছেন।

সেই গ্রামেই গত ক’দিন ধরে বইছে খুশির হাওয়া। ১৭৮টি পরিবারের দেড় হাজার মানুষ খুশি, কারণ জেলাশাসক এস বিশ্বনাথন তাঁদের গ্রাম ঘুরে গিয়েছেন। পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে জেলাশাসকের মন্তব্য, ‘‘এতো এক প্রকার জেল-ই। বড়ই অমানবিক।’’ বিনা দোষে তাঁদের ‘জেল খাটতে’ দেবেন না, সেদিনই বলে এসেছিলেন তিনি।

এর মধ্যে দু’তিনটি সরকারি খাস জমি দেখা হয়েছে। নতুন এলাকায় গিয়ে যাতে নাতানপুরবাসীকে ছন্দ হারাতে না হয়, সে জন্য কাঁটাতারের দু’তিন কিলোমিটারের মধ্যেই জমিগুলি দেখা হয়েছে বলে জেলাশাসক জানিয়েছেন। বিশ্বনাথন আশাবাদী, জানুয়ারিতেই তাঁদের কাঁটাতারের বাইরে আনা সম্ভব হবে। সবাইকে আধ-বিঘে করে জমি দেওয়া হবে। সামান্য কাজকর্ম রয়েছে। সেগুলিও শীঘ্রই মিটিয়ে ফেলা হবে।

তাঁর এই বার্তা ক’দিন থেকে নাতানপুরের মানুষের মুখে মুখে। তা নিয়েই চর্চা এখন পুরো এলাকা জুড়ে। কাঁটাতারে বন্দি মানুষগুলি অপেক্ষায়, কবে আবার আগের মত সাধারণ জনস্রোতে মিশে যেতে পারবেন। অন্য ভারতীয়দের মতো মর্যাদার সঙ্গে নিজের দেশে বসবাস করবেন।

অতিরিক্ত জেলাশাসক এ আর শেখ শুক্রবার নাতানপুর পরিদর্শন করে এসেছেন। তিনি জানান, ‘‘সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রসচিব আন্তর্জাতিক সীমান্ত ও এ সংক্রান্ত বিভিন্ন বিষয়ে খোঁজখবর করছেন। ৩১ ডিসেম্বরের মধ্যে নাতানপুর নিয়েও রিপোর্ট চেয়েছেন।’’ সে জন্যই দৌড়ঝাঁপ চলছে। নির্দিষ্ট সময়ের আগেই রিপোর্ট পাঠানো হবে।

এখন কাছাড়ের কাঁটাতার ঘেরা গ্রাম বললেই সবাই নাতানপুরকে বোঝেন। বন্দি মানুষগুলিও নিজেদের এক গ্রামেরই বলে মনে করেন। কিন্তু ক’বছর আগেও তাঁদের আলাদা গ্রাম ছিল, ছিল আলাদা গ্রাম পঞ্চায়েত। খেলার মাঠ, উপাসনা স্থল, পানীয় জলের বন্দোবস্ত সবই ছিল তাঁদের। এখন কারও কিছু নেই বলে মহাদেবপুর, পিননগর, রংপুর, নাতানপুর—সব মিলেমিশে একাকার। এখন তাঁদের একটিই পরিচয়—নাতানপুরের কাঁটাতার ঘেরা মানুষ।

আন্তর্জাতিক সীমান্ত থেকে দেড়শো মিটার দূরে কাঁটাতারের বেড়া বসানোর সিদ্ধান্ত থেকেই তাঁদের দুর্ভোগের শুরু। ওই দেড়শো মিটার এলাকার মধ্যে কাছাড়ের ১৭৮টি পরিবারের দেড় হাজার মানুষের পূর্বপুরুষের ভিটে। এলাকাবাসীর অভিযোগ, সরকারি তরফে তাঁদের বলা হয়েছিল, সবাইকে বেড়ার বাইরে সম-পরিমাণ জমি দেওয়া হবে। কাঁটাতারে ঘেরা হলেও সমস্যা হবে না। সামান্য দূরে দূরে গেট থাকবে। সারাদিন খোলা থাকবে সেই গেট। রাতেও যে কোনও প্রয়োজনে বিএসএফকে বললেই গেট খুলে দেওয়া হবে। কিন্তু বেড়াবসতেই দেখা যায়, কথায় আর কাজে ফারাক বিস্তর। লোহার এক একটি বিশাল গেট তৈরি হয়েছে এক কিলোমিটারের বেশি দূরত্বে। দিনের বেলাতেও যাওয়া-
আসা বিএসএফ নিয়ন্ত্রিত। রাতে বেরনো বলতে গেলে নিষিদ্ধ। বহু বাড়ির রাস্তা কাঁটাতারের বেড়ার ওপারে চলে যাওয়ায় এখন তাঁদের অন্যের বাড়িঘরের উপর দিয়ে চলাফেরা করতে হয়। বাজার-হাট, শিক্ষা-স্বাস্থ্য সবেতেই সমস্যা। মহাদেবপুর নিম্ন প্রাথমিক বিদ্যালয়টি বেড়ার ভিতরে ছিল। তাও পরে সরিয়ে নেওয়া হয়।

তাই মুক্তির সামান্য আলোর রেখা দেখলে তাঁরা ছটফট করতে শুরু করেন। এর আগেও তাঁদের পুনর্বাসনের স্বপ্ন দেখিয়েছিল জেলা প্রশাসন। জমি বণ্টন সংক্রান্ত জেলা পর্যায়ের সভায় তাঁদের সরকারি খাস জমি দেওয়ার সিদ্ধান্তও হয়েছিল। কিন্তু পুনর্বাসন সমীক্ষার পর সব চুপচাপ।

এ বারও মাঝপথে স্বপ্নভঙ্গ ঘটবে না তো? আশার সঙ্গে আশঙ্কাও ভোগাচ্ছে বন্দি নাতানপুরবাসীকে। এরই মধ্যে কাঁটাতারের বাইরে, ৭৮ নম্বর দাগের খাসজমিতে বসবাসকারীরা আগাম হুঁশিয়ারি দিয়ে রেখেছেন, জেলা প্রশাসন তাঁদের তুলে অন্যদের সেখানে বসাতে চাইলে প্রাণ বাজি রেখে তাঁরা লড়বেন। তাঁরা শুনেছেন, ওই জমিটিতেই
নাকি কাঁটাতারের মানুষগুলিকে পুনর্বাসন দেওয়া হবে। আসলে ওই জমিতে তাঁরাও দীর্ঘদিন ধরে বসবাস করছেন। যখন সরকারের কাছে জমির পাট্টার জন্য দাবি জানাতে প্রস্তুত হচ্ছেন, তখনই তাদের উচ্ছেদের
কথা হচ্ছে।

অতিরিক্ত জেলাশাসক শেখ বলেন, ‘‘কোন জমি দেওয়া হবে, কখন দেওয়া হবে ইত্যাদি সিদ্ধান্ত জেলা প্রশাসন নেবে না। আমরা রিপোর্ট তৈরি করছি। কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকে পাঠানো হবে।
তাঁরাই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবেন।’’

Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy