Advertisement
E-Paper

কমিশনকে তোপ দাগা নতুন নয়

যুদ্ধের বাজনা পশ্চিমবঙ্গে। সরকারি অফিসারদের বদলি নিয়ে নির্বাচন কমিশনের নির্দেশকে সরাসরি চ্যালেঞ্জ করেছেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে রাজনৈতিক দলের, বিশেষত রাজ্যে ক্ষমতাসীন দলের বিরোধ নতুন নয়। এক সময় মুখ্যমন্ত্রী জ্যোতি বসুর সঙ্গে তৎকালীন নির্বাচন কমিশনার টি এন শেষনের এ হেন যুদ্ধ দেখেছেন পশ্চিমবঙ্গবাসী। শেষনের কাজে ক্ষিপ্ত জ্যোতিবাবু তাঁকে ‘মেগালোম্যানিয়াক’ আখ্যা দিয়েছিলেন!

নিজস্ব সংবাদদাতা

শেষ আপডেট: ০৮ এপ্রিল ২০১৪ ০৩:২৯

যুদ্ধের বাজনা পশ্চিমবঙ্গে। সরকারি অফিসারদের বদলি নিয়ে নির্বাচন কমিশনের নির্দেশকে সরাসরি চ্যালেঞ্জ করেছেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়।

নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে রাজনৈতিক দলের, বিশেষত রাজ্যে ক্ষমতাসীন দলের বিরোধ নতুন নয়। এক সময় মুখ্যমন্ত্রী জ্যোতি বসুর সঙ্গে তৎকালীন নির্বাচন কমিশনার টি এন শেষনের এ হেন যুদ্ধ দেখেছেন পশ্চিমবঙ্গবাসী। শেষনের কাজে ক্ষিপ্ত জ্যোতিবাবু তাঁকে ‘মেগালোম্যানিয়াক’ আখ্যা দিয়েছিলেন! বিহারের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী লালুপ্রসাদ যাদবের সঙ্গেও কমিশনের বিরোধ তুঙ্গে উঠেছিল। অফিসার বদল, আধা সামরিক বাহিনী মোতায়েন নিয়ে ভোটের মুখে লালুকে কার্যত কাঁদিয়ে ছেড়েছিল কমিশন। তারও পরে নরেন্দ্র মোদীকে আদালতে পর্যন্ত টেনে নিয়ে গিয়েছিলেন তৎকালীন মুখ্য নির্বাচনী কমিশনার জে এম লিংডো।

দীর্ঘ এই তালিকায় শেষতম সংযোজন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তবে তিনি যে ভাবে ডিএম-এসপিদের সরানো নিয়ে কমিশনের নির্দেশ মানবেন না বলে ঘোষণা করেছেন, তা অভূতপূর্ব বলেই মনে করছেন সংবিধান-বিশেষজ্ঞ সুভাষ কাশ্যপ। কমিশনের সঙ্গে বিরোধে জড়ালেও এর আগে সকলেই তাদের নির্দেশ মানতে বাধ্য হয়েছিলেন বলেও মনে করিয়ে দিয়েছেন অনেকে।

শেষনের সঙ্গে জ্যোতিবাবু তথা সিপিএমের বিরোধে কমিশনকেই সমর্থন করেছিল তৎকালীন বিরোধী দল কংগ্রেস। যে দলের নেত্রী ছিলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। এখন তিনি শাসকের আসনে। কমিশনের বিরুদ্ধে সরব। আর কমিশনের সিদ্ধান্ত নিয়ে উল্লসিত অধুনা বিরোধী সিপিএম।

ইতিহাস বলছে, কমিশনের সঙ্গে সংঘাত বাড়লে ভোটে শাসক দলই লাভবান হয়। বিহারে লালুপ্রসাদের দল, পশ্চিমবঙ্গে সিপিএম কিংবা গুজরাতে বিজেপি সকলের ক্ষেত্রেই এই ঘটনা ঘটেছে। ফলে এ বার কমিশনের বিরুদ্ধে দলনেত্রী সরব হতেই তৃণমূল নেতৃত্বের দাবি, “বিরোধীরা আজ কমিশনের ভূমিকায় উল্লসিত হচ্ছেন। কিন্তু ভোটের ফলে তাঁদের মুখ বন্ধ হয়ে যাবে।”

নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে শাসক দলগুলির এই সংঘাতের ইতিহাস শুরু মূলত এক দক্ষিণীর হাত ধরে। নব্বইয়ের দশকের গোড়ায় টি এন শেষন নির্বাচন কমিশনের মাথায় বসার পরেই পূর্ণ শক্তিতে নিয়ে আত্মপ্রকাশ করে কমিশন। যার প্রথম শিকার হন যাদব-প্রধান লালুপ্রসাদ। বিহারের নির্বাচন মানেই নৈরাজ্য, সন্ত্রাস আর বুথ দখল আপাত পরিচিত সেই ছবিটিই বদলে দিতে চেয়েছিলেন শেষন। বিহারে সে বার একাধিক দফায় ভোট গ্রহণ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল কমিশন। এমনকী, প্রথম দফার নির্বাচনে ১৪ জনের মৃত্যু হওয়ায় দ্বিতীয় ও তৃতীয় দফার ভোটও পিছিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন শেষন। হিংসা ঠেকাতে ভোটের মাঝখানেই বিরোধী দলগুলির সঙ্গে বৈঠক করেন তিনি। একই সঙ্গে লালু-ঘনিষ্ঠ আমলাদের যথেচ্ছ বদলি করে দেওয়ার নির্দেশ দেন। শুধু তাই নয়, শেষন স্পষ্ট জানিয়ে দেন, বিহার পুলিশ নয়, ভোট হবে আধা সামরিক বাহিনীর উপস্থিতিতে।

কমিশনের বিরুদ্ধে কড়া ব্যবস্থা নেওয়ার দাবিতে পথে নামার হুমকি দিয়েছিলেন লালু। কিন্তু মচকাননি শেষন। শেষ পর্যন্ত তাঁর ইচ্ছে মতোই বিহারে ভোট হয়। ভোটের ফলে শেষ হাসি অবশ্য হেসেছিলেন লালুপ্রসাদ। ঘনিষ্ঠ মহলে তিনি দাবি করেছিলেন, কমিশনের অতি-সক্রিয়তার ফলে যাদব ভোট একজোট হয়েছে। একই ভাবে পশ্চিমবঙ্গেও বামেদের সঙ্গে একাধিক বার বিভিন্ন প্রশ্নে সংঘাত বেধেছিল শেষন, এম এস গিল বা উপ-নির্বাচন কমিশনার কে জে রাওয়ের। কিন্তু কমিশনের কড়া নজরদারিতে ভোট হওয়া সত্ত্বেও সে সময় নির্বাচনে ফল গিয়েছিল বামেদের অনুকূলেই।

২০০২ সালে ফেব্রুয়ারি মাসে গুজরাত দাঙ্গার কয়েক মাসের মধ্যেই সরকার ভেঙে দিয়ে ভোটে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন নরেন্দ্র মোদী। কিন্তু বিধানসভার মেয়াদ শেষ হওয়ার ছ’মাস আগে ভোট করানোর ওই দাবি খারিজ করে দেন তৎকালীন নির্বাচন কমিশনার জে এম লিংডো। বিষয়টি গড়ায় আদালত পর্যন্ত। শেষ পর্যন্ত সুপ্রিম কোর্ট নির্বাচন কমিশনের পক্ষেই রায় দেয়। নির্দিষ্ট সময়ে হওয়া নির্বাচনে সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে ক্ষমতায় ফেরেন মোদী।

প্রশ্ন উঠেছে, নির্বাচনের কমিশনের সঙ্গে সঙ্ঘাতে জড়িয়ে কি শেষে ফায়দা তুলবে তৃণমূলই? ইতিমধ্যেই আমলাদের ওই বদলি তিনি মানবেন না বলে হুমকি দিয়ে রেখেছেন মমতা। প্রয়োজনে তিনি গ্রেফতার হতেও প্রস্তুত বলে জানিয়েছেন। একই সঙ্গে তেমনটা হলে তৃণমূলকেই ভোট দেওয়ার ডাক দিয়ে মমতা বলেছেন, “আমাকে যদি গ্রেফতার করা হয়, যদি জেলে যাই, সবাই জোড়া ফুলে ভোট দেবেন।” দল মনে করছে, কমিশনের সিদ্ধান্ত না মানার কথা বলে তৃণমূলের কেন্দ্র-বিরোধী অবস্থানকেই তুলে ধরতে চান করছেন মমতা। তৃণমূল নেতাদের মতে, নেত্রীর এই জেহাদে একজোট হবেন দলীয় কর্মীরা। দলের ফল আরও ভাল হবে রাজ্যে।

সত্যিই কি হবে ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি! উত্তর দেবে সময়ই।

rjd tmc election commission
Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy