গত পঞ্চাশ বছর ধরে তিনি নিয়ম করে ভোট দেন। এ বারের বিধানসভা ভোটেও ভোটার তালিকায় তাঁর নাম ছিল। ভোটও দেন তিনি। লোকসভা হোক বা বিধানসভা কিংবা পঞ্চায়েত ভোট—লাইনে দাঁড়িয়ে নিজের গণতান্ত্রিক অধিকার পালনে অশীতিপর ‘ভারতীয় নাগরিক’ সুভদ্রা সরকারের কোনও বিরাম ছিল না। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সেই তাঁকেই ‘বিদেশি’ সন্দেহে হতে হল জেলবন্দি!
ভারতের ভোটার তালিকায় নাম থাকা সত্ত্বেও বিদেশি সন্দেহে সুভদ্রা দেবীকে ডিটেনশন ক্যাম্পে (পড়ুন, জেল) পাঠানো হলো। জীবনের শেষ প্রান্তে এসে ভারত বা অসম সরকারের কাছ থেকে এমন ‘তোফা’ যে পাবেন তা স্বপ্নেও ভাবেননি উত্তর শালমারা মহকুমার অভয়াপুরী বিধানসভা এলাকার লতাবাড়ি গ্রামের বাসিন্দা, প্রয়াত হরেন্দ্র সরকারের স্ত্রী সুভদ্রা সরকার। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে বঙ্গাইগাঁও জেলায় তীব্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়েছে। মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার পর থেকে সর্বানন্দ সোনোয়াল বার বার বলেছেন নিছক সন্দেহের বশে কোনও ভারতীয়কে হেনস্থা করা চলবে না। হিন্দুদের শরণার্থীর অধিকার দেওয়া হবে বলে গত বছর বিজ্ঞপ্তিও প্রকাশ করে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রক। কিন্তু সে বিজ্ঞপ্তি এখনও আইনে পরিণত না হওয়ার মাশুল দিচ্ছেন সুভদ্রাদেবীর মতো অনেকেই।
ওই বৃদ্ধার পরিবার সূত্রে জানা গিয়েছে, ১৯৬৬ সালের ভারতীয় ভোটার তালিকায় তাঁর নাম ওঠে। তার পর থেকে সব বিধানসভা, লোকসভা নির্বাচনে সুভদ্রাদেবী ভোট দিয়েছেন। কিন্তু বছরখানেক আগে সুভদ্রা সরকারের বিরুদ্ধে বিদেশি শণাক্তকরণ আদালত বা ফরেনার্স ট্রাইব্যুনালের অফিস থেকে ডাউটফুল বা ডি-ভোটার হিসেবে নোটিশ জারি করা হয়। নোটিশ হাতে পেয়ে অবাক সুভদ্রাদেবীর পরিবার। তাঁরা ১৯৬৬ সালের ভারতীয় ভোটার তালিকা-সহ ভারতীয় নাগরিকত্বের জন্য প্রয়োজনীয় যাবতীয় নথিপত্র জমা দেন ট্রাইব্যুনালের অফিসে। কিন্তু তারপরেও চলতি বছরের ১০ জুন সেই অফিস থেকে নির্দেশ আসে, চার কপি ফটো-সহ সুভদ্রা সরকারকে অভয়াপুরী থানায় হাজির হতে হবে। গত কাল নাতি প্রহ্লাদ সরকারের সঙ্গে সুভদ্রাদেবী থানায় যান। থানায় হাজির হওয়ার পরেই ওই বৃদ্ধার স্বাস্ব্য পরীক্ষা করা হয়। সেখান থেকে তাঁকে বঙাইগাঁওয়ের এসপি অফিসে পাঠানো হয়। পরিবারকে কার্যত অন্ধকারে রেখেই তাঁকে কোকরাঝাড়ের ডিটেনশন শিবিরে পাঠিয়ে দেওয়া হয়।
তখনও গোয়ালপাড়া জেলা ভাগ হয়নি। বৃদ্ধার পরিবারের লোকেরা আজ দেখান: গোয়ালপাড়া জেলার উত্তর শালমারা মহকুমার নির্বাচনী আধিকারিকের সই থাকা ১৯৬৬ সালের ভোটার তালিকা। সেখানে অভয়াপুরী বিধানসভা আসনের লতাবাড়ি গ্রামের বাসিন্দা প্রয়াত হরেন্দ্র সরকারের ক্রমিক নম্বর ৪৭২ এবং সুভদ্রা সরকারের ক্রমিক নম্বর ৪৭৩। সুভদ্রা সরকারের বয়স ছিল ২৯ বছর। এরপর থেকে সুভদ্রাদেবীর নাম বরাবরই ভোটার তালিকায় উঠেছে। এ বছর বিধানসভা নির্বাচনেও ভোট দিয়েছেন তিনি।
বৈধ নাগরিকদের বিদেশি সাজিয়ে হেনস্থার প্রতিবাদে সারা অসম বেঙ্গলি ছাত্র সংগঠনের বঙ্গাইগাঁও জেলা সমিতির সভাপতি সম্রাট ভাওয়াল বলেন, “৫০ বছর ধরে ভারতীয় ভোটার তালিকায় নাম থাকা বৃদ্ধাকে বিনা যুক্তিতে বিদেশি বলে শিবিরে বন্দি করে রাখা হয়েছে। আমরা এই ঘটনার উচ্চ পর্যায়ের তদন্তের দাবি জানাচ্ছি।”
ঘটনার বিষয়ে বঙাইগাঁওয়ের পুলিশ সুপার কে সঞ্জীব কৃষ্ণ বলেন, “এতে পুলিশের কিছু করার নেই। আদালত সুভদ্রা সরকারকে বিদেশি সন্দেহে ডিটেনশন শিবিরে রাখার নির্দেশ দিয়েছে। ভারতীয় না বিদেশি, তা বিচার করবে আদালত।” পুলিশের মতে, সুভদ্রাদেবীর আইনজীবী সময় মতো প্রমাণপত্র আদালতে জমা না দেওয়ার ফলেই এই বিপত্তি।