সত্তরের দশকের ‘শোলে’ ছবিতে ঘোড়া ছুটিয়ে ‘গব্বর’ আমজাদকে ধরেছিলেন ‘ঠাকুর’ সঞ্জীব কুমার।
সেলুলয়েডের রামগড়ের পর এ বার দ্বারভাঙা। চার দশক পর সিনেমার সেই গল্প যেন বাস্তব হল!
কোশী নদীর তীরে প্রত্যন্ত তিলকেশ্বর। দিনেও পুলিশ ঢুকতে ভয় পায়। সড়ক বলে কিছু নেই। গাড়ি ঢোকার প্রশ্নই নেই। তাই দুর্ধর্ষ ‘ডন’ রামা সিংহকে পাকড়াও করতে জেলার সিনিয়র পুলিশ সুপার মনু মহারাজ বেছে নিয়েছিলেন পায়ে হাঁটা পথই।
অনেকটা যেন অমিতাভ বচ্চন, ধর্মেন্দ্র, আমজাদ খানের সুপারহিট সিনেমার চিত্রনাট্য।
তিলকেশ্বরের পাশ দিয়ে বইছে কোশী, কমলা নদী। প্রতি বছর বন্যায় ডোবে গ্রামের পর গ্রাম। বেশিরভাগই কৃষিজমি, মাঝে ছোট ছোট জনবসতি। বাকি জায়গাটা জনবিরল, নির্জন। সেখানেই ডেরা বেঁধেছিল বছর পঁয়ষট্টির রামা সিংহ। সঙ্গে সশস্ত্র শাগরেদরা। ডাকাতি, অপহরণ, তোলাবাজি, খুন সব কিছুতেই দক্ষ রামা। তার ভয়ে তটস্থ ছিল আশপাশের গ্রাম। বাচ্চারা না ঘুমালে হয়তো সেখানকার মায়েরা বলতেন, ‘বেটা সো যা, নেহিতো রামা আ জায়েগা!” ‘শোলে’র রামগড়ে যেমন হতো।
তিলকেশ্বরে পুলিশ শেষ কবে ঢুকেছিল, তা ঠিকমতো মনে করতে পারেন না স্থানীয় বৃদ্ধরাও। সেখানে কার্যত সমান্তরাল প্রশাসন রামার। বিশাল বাহিনী ছাড়া ওই এলাকায় ঢুকতে চাননি পুরনো পুলিশকর্তারা। তাঁদের উল্টো রাস্তায় এগোলেন জেলায় সদ্য এসএসপি-র দায়িত্বে আসা মনু মহারাজ। রুপোলি পর্দার পুলিশকর্তা ‘ঠাকুর বলদেব সিংহে’র মতো।
মানুষের নালিশ শুনতে নিয়মিত ‘জনতা দরবার’ করেন মনু মহারাজও। কয়েক দিন আগে সেখানে হাজির হন তিলকেশ্বরের এক কৃষক। হাতজোড় করে এসএসপি-কে বলেন, “আমাদের বাঁচান। কালঘাম ফেলে চাষ করি। লাভের টাকা রামা কেড়ে নিয়ে যায়। না দিলেই খুন।” ডাকাত-সর্দারকে গ্রেফতার করার সিদ্ধান্ত তখনই নেন মনু মহারাজ।
রাস্তা নেই। পাথুরে জমিতে গাড়ি চলে না, মোটরসাইকেলও। দিন দু’য়েক আগে সাদা পোশাকের ১০ জন অফিসারকে সঙ্গে নিয়ে তিলকেশ্বর রওনা দেন মনু মহারাজ। সদর দফতর থেকে পাঁচ ঘণ্টার রাস্তা পেরিয়ে সহরসার মাহেষী দিয়ে রামার ‘সাম্রাজ্যে’ ঢোকেন সকলে। ঘড়ির কাটায় তখন বিকেল ৪টে। পুলিশ সূত্রের খবর, গোপনে খবর পৌঁছে যায় রামার কানে। লুকানো ঘাঁটি থেকে বেরিয়ে পুলিশের উপর হামলা চালায় ডাকাত-সর্দার। দু’পক্ষে কিছু ক্ষণ সংঘর্ষের পর রামার তিন শাগরেদকে ধরে ফেলে পুলিশ। বেগতিক দেখে আরও দুই সঙ্গীকে নিয়ে ঘোড়ায় পালাতে শুরু করে রামা। ধৃত ডাকাতদের ঘোড়া নিয়ে রামাকে ধাওয়া করেন পুলিশকর্তা মনু। তাঁর হাতে উদ্যত স্বয়ংক্রিয় রাইফেল।
কোশীর কোলে তখন সূর্য অস্ত যাচ্ছে।
খেতের মধ্যে দিয়ে সজোরে ঘোড়া ছোটাচ্ছিল রামা। দু’-তিন কিলোমিটার যাওয়ার পর শূন্যে গুলি ছোড়েন মনু মহারাজ। চিৎকার করে বলেন, “শেষ বার বলছি, দাঁড়িয়ে যাও। না হলে গুলি করব।” পালানোর পথ নেই দেখে লাগাম টেনে ঘোড়া থামিয়ে দেয় একাধিক মামলায় অভিযুক্ত রামা। তার মাথায় রাইফেল ঠেকিয়ে হাতকড়া পরান মনু মহারাজ।
টকটকে লাল চোখে পুলিশকর্তার দিকে তাকিয়ে রামা বলে, ‘ভাবতে পারিনি কখনও এ দিন দেখতে হবে। কিন্তু আমাকে লোহার গারদ কত দিন আটকে রাখতে পারবে!”
কী বলছেন আজকের ‘ঠাকুর’ মনু মহারাজ? পুলিশকর্তার সংক্ষিপ্ত মন্তব্য, “মানুষ আমাদের ভরসায় থাকেন। লোহার গারদ কতটা শক্ত তা এ বার রামাদের বোঝাতে হবে।”