ভুয়ো ছাত্রের তিনটি নাম! তার বাবার দাবি ছেলে পাগল। এ দিকে ‘পাগল’ ছেলের তিনটি সিমে বিভিন্ন দেশের নম্বর! সন্দেহভাজন চার ‘অপহরণকারী’রও হদিস নেই। সুমন ওরফে আরিফ ওরফে জাভেদকে ধরে গত ২৪ ঘণ্টায় এ ভাবেই কার্যত নাকানি-চোবানি খাচ্ছে শিলচর পুলিশ। এক পাগল যুবক কেন মেডিক্যাল কলেজে ক্লাস করতে ঢুকে গোপন সংকেতে ভিতরের খবর পাচার করবে, কেনই বা ভিন দেশে মোবাইলে যোগাযোগ রাখবে— তার কোনও জবাব এখনও মেলেনি।
শিলচর মেডিক্যাল কলেজে সপ্তাহ খানেক আগে দ্বিতীয় সেমিস্টারের ক্লাস করতে শুরু করেছিল এক যুবক। সহপাঠীদের জানায়, তেজপুর মেডিক্যাল কলেজ থেকে ট্রান্সফার সার্টিফিকেট নিয়ে এসেছে সে। কিন্তু সব বিষয়েই তার অজ্ঞতা দেখে সহপাঠীরাই ওই যুবককে অধ্যক্ষ শিল্পী পালের কাছে নিয়ে যায়। সেখানে নিজেকে ভুয়ো ছাত্র হিসেবে মেনে নিয়ে সে দাবি করে, চার অপহরণকারী তার মাকে অপহরণ করেছে। মুক্তিপণ হিসেবে বলা হয়েছে— মেডিক্যালের ভিতরের খবর সরবরাহ করতে হবে। তার ব্যাগ থেকে বিভিন্ন সংকেত ও সাংকেতিক ভাষায় লেখা কাগজও মেলে। পুলিশ গত কালই তাকে গ্রেফতার করে তদন্ত শুরু করে। পুলিশ সূত্রে খবর, গত কাল মধ্যরাত পর্যন্ত পুলিশকর্মীরা জাভেদকে নিয়ে শিলচরের বিভিন্ন স্থানে ঘোরেন। সে যে চার অপহরণকারীর নাম-ঠিকানা বলেছিল, তাদের মধ্যে একটি ছেলের সন্ধান মিলেছে। সেও বছর তিনেক ধরে সৌদি আরবে কর্মরত।
এ দিন পুলিশ জানায়, কলেজের জাল আইডেন্টিটি কার্ডে ওই যুবক নিজের নাম লিখেছিল সুমন আজিজ লস্কর। গ্রেফতার হওয়ার পরে সে নিজের নাম বলেছিল, আরিফ চৌধুরী। কিন্তু গত রাতে পুলিশ তার বাড়ি খুঁজে পাওয়ার পরে ওই ভুয়ো ছাত্রের বাবা আব্দুল নুর লস্কর দাবি করেন, ছেলের আসল নাম জাভেদ ইকবাল লস্কর।
কাছাড় জেলার কচুদরম থানার বাগডহর গ্রামের বাসিন্দা আব্দুলবাবু দাবি, তাঁর ছেলের মানসিক সমস্যা রয়েছে। ছোটবেলায় মাকে হারানোর পর থেকেই সে অসংলগ্ন আচরণ করে। এলাকারই রামদুলাল উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয় থেকে মাধ্যমিক পাশ করেছিল সে। পরে ভর্তি হয় ওই স্কুলের কলাবিভাগে। বছর দেড়েক আগে সে এক বার নিখোঁজ হয়ে যায়। মাসীর বাড়িতে তার সন্ধান মেলে। পরে এলাকারই এক ফোটোকপির দোকানে কাজ করছিল জাভেদ। কিন্তু সম্প্রতি সে একটি অ্যাপ্রন কিনে আনে। সৎ মা, সৎ বোনদের জানায়, মেডিক্যাল কলেজে চাকরি পেয়েছে। প্রতিদিনই ওই সাদা পোশাক পরে বেরিয়ে যেত জাভেদ। ফিরত বিকেলে। পুলিশ প্রশ্ন করে, ছেলের মোবাইলে কেন বিদেশের নম্বর? কেনই বা সাংকেতিক কাগজ? বাবা উল্টে পুলিশকে বলেন, ‘‘পাগল ছাড়া এমন কাজ কে করবে? ছেলের মাথায় সামান্য সমস্যা আছে। ও নিয়ে বেশি মাথা ঘামিয়ে লাভ নেই।’’
কিন্তু মাথায় ‘সামান্য গোলমাল’ থাকা ছেলে অ্যাপ্রন সংগ্রহ করে, জাল পরিচয়পত্র তৈরি করে সোজা মেডিক্যালে পড়তে চলে যাবে— তা মানতে তদন্তকারী অফিসারদের কষ্ট হচ্ছে। হতদরিদ্র পরিবারের
ছেলের দু’টি মোবাইলে, তিনটি সিম পুরে বিদেশে যোগাযোগ রাখাও স্বাভাবিক ঘটনা নয়।
তবে এ পর্যন্ত জাভেদের বিরুদ্ধে জঙ্গিযোগের কোনও স্পষ্ট প্রমাণ মেলেনি বলেই জানিয়েছেন কাছাড় জেলার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার সুভাষিণী শঙ্করণ। তিনি জানান, মেডিক্যাল বোর্ড বসিয়ে জাভেদের মানসিক অবস্থা পরীক্ষা করা হবে।
তবে কী মানসিক ভারসাম্যহীন জাভেদকে কোনও ষড়যন্ত্রে ব্যবহার করা হচ্ছিল? শঙ্কারণ জানান, কোনও সম্ভাবনাকে তাঁরা বাদ দিচ্ছেন না।
জাল ছাত্র ধরা পড়ায় মেডিক্যাল কলেজে নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। কলেজ কর্তৃপক্ষের বক্তব্য, অনেক দিন থেকেই কলেজের সুরক্ষায় আধা-সামরিক বাহিনীর জওয়ান মোতায়েন করতে প্রশাসনকে অনুরোধ জানানো হয়েছে। কিন্তু সে ব্যবস্থা হয়নি।
এএসপি বলেন, ‘‘কলেজের বাইরের নিরাপত্তার দায়িত্ব পুলিশের হলেও ভিতরের নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিজেদেরই করতে হয়। একটি বেসরকারি নিরাপত্তা সংস্থার সঙ্গে এ নিয়ে মেডিক্যাল কলেজ চুক্তিবদ্ধ। তারাই কলেজের ভিতরে রক্ষী
নিয়োগ করে। অবশ্য তা সত্তেও কলেজে প্রায়ই বিভিন্ন সমস্যা দেখা দিচ্ছে। তাই নিরাপত্তা ব্যবস্থা খতিয়ে দেখবে পুলিশ।’’