একটা ফোন। দু’টো খুনের ‘সুপারি’।
চার বছর আগে, ২০১১-র জুন মাসে ফোনটা আসে মুম্বই আন্ডারওয়ার্ল্ডের শ্যুটার সতীশ কালিয়ার কাছে। ফোনের ও প্রান্তে তিনি, ছোটা রাজন। দু’জনকে খুন করতে হবে। সাংবাদিক জ্যোতির্ময় দে এবং হোটেল-রেস্তোরাঁ মালিক বি আর শেট্টি।
বলা মাত্র নির্দেশ পালন। ১১ জুন রাতে বাইকে চেপে বাড়ি ফেরার সময় খুন হয়ে যান জ্যোতির্ময়। কালিয়া জানারও চেষ্টা করেনি, জ্যোতির্ময় কে? কেনই বা তাঁকে মরতে হবে? জ্যোতির্ময়ের পর শেট্টিকে খুনের ছক কষছিল সে। কিন্তু তার আগেই পুলিশের হাতে ধরা পড়ে যায় কালিয়া।
জ্যোতির্ময় দে খুন হওয়ার পরেই মহারাষ্ট্র সরকার নতুন করে সিবিআইকে ছোটা রাজনের নামে ‘রেড কর্নার নোটিস’ জারি করার অনুরোধ জানায়। তার আগেই অবশ্য ৬৩টি মামলায় ছোটা রাজনের নামে রেড কর্নার নোটিস জারি হয়েছিল। কিন্তু জ্যোতির্ময় দে-র খুনের পরে রাজনের খোঁজ পেতে ফের নতুন করে ইন্টারপোলের সঙ্গে যোগাযোগ ও তথ্য আদানপ্রদানে সক্রিয় হয়ে ওঠে সিবিআই। মুম্বইয়ের আন্ডারওয়ার্ল্ড-এ ছোটা রাজনের দলের শিকড় কোথায় কোথায় ছড়িয়ে রয়েছে, তারও খোঁজ শুরু হয়।
তখনই জানা যায়, দাউদ ইব্রাহিমের সঙ্গে সাপে-নেউলে সম্পর্ক হলেও মুম্বইতে ছোটা রাজনের সাম্রাজ্য শেষ হয়ে যায়নি। বিশ্বস্ত অনুচররা তাঁর নির্দেশ পালন করতে এখনও যা খুশি করতে পারে।
সতীশ কালিয়াই যেমন। জেলে বসেও ‘ভাই’-এর নির্দেশ অনুযায়ী শেট্টিকে খুনের জন্য লোক লাগায় সে। ২০১২-র অক্টোবরে আন্ধেরিতে শেট্টির উপরে হামলা হয়। কাঁধে গুলি লাগলেও প্রাণে বেঁচে যান তিনি। জ্যোতির্ময়ের ‘অপরাধ’ ছিল, তিনি রাজনের বয়স বাড়ার পাশাপাশি তাঁর লোকবল কমে যাওয়ার তথ্য প্রকাশ করে দিয়েছিলেন। আর শেট্টি নাকি রাজনের বিরোধী গ্যাং-এর লোকেদের অর্থ দিয়ে সাহায্য করতেন।
মুম্বইয়ের আন্ডারওয়ার্ল্ড-এর এই ‘গ্যাংওয়ার’, দাউদ বনাম ছোটা রাজনের লড়াই-ই গত পাঁচ বছরে বারবার ছোটা রাজনকে খবরের শিরোনামে নিয়ে এসেছে। একই ভাবে সিবিআইয়ের কাছেও ইন্টারপোল মারফত খবর এসেছে, রাজন কখনও অস্ট্রেলিয়ায়, কখনও আবার ব্যাঙ্ককে। কিন্তু বার বার তাঁকে ধরার চেষ্টা ব্যর্থ হয়েছে। আজ সিবিআইয়ের অধিকর্তা অনিল সিন্হা বলেন, ‘‘অনেক দিন ধরেই এই চেষ্টা চলছিল।’’ ১৫ বছর আগে অস্ট্রেলিয়ায় রাজনকে গ্রেফতার করে ভারতে নিয়ে আসার জন্য আদালতের নির্দেশও আদায় করে ফেলেছিল নয়াদিল্লি। তৎক্ষণাৎ ব্যাঙ্ককে পালিয়ে যান রাজন। সেখানে তাঁর উপরে হামলা চালায় দাউদের লোকেরা।
স্বাভাবিক ভাবেই ইন্দোনেশিয়ায় তার গ্রেফতারির পিছনে এই দাউদ-রাজন শত্রুতা কতখানি কারণ, তা নিয়েও জল্পনা শুরু হয়েছে। কারণ ছোটা শাকিলের মতো দাউদের বিশ্বস্ত অনুচরেরা বারবার দাবি করেছে, ছোটা রাজন আসলে ভারতের গোয়েন্দাদের হয়ে কাজ করেন। গোয়েন্দারাও রাজনকে বাঁচাতে পারবে না বলেও কয়েক মাস আগে হুমকি দিয়েছে ছোটা শাকিল। গোয়েন্দা বাহিনীর এক প্রাক্তন শীর্ষ কর্তার মন্তব্য, ‘‘ইন্টারপোলের হাতে ধরা পড়ে আসলে প্রাণে বেঁচে গেলেন ছোটা রাজন।’’
গোয়েন্দা সূত্রের বক্তব্য, ৫৬ বছর বয়সি রাজনের শরীরে এমনিতেই কিডনির অসুখের মতো নানা রোগ বাসা বেঁধেছে। তার ওপর তাঁকে প্রতিনিয়ত খুঁজে চলেছে দাউদের লোকজন। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে কমছে লোকবল। কয়েক মাস আগেই ছোটা রাজনের এক অনুচরকে হাত করে তাঁর গোপন আস্তানার খবর প্রায় জেনে ফেলেছিল দাউদ-বাহিনী। ফলে ভারতের পুলিশ হেফাজতে থাকলে খানিকটা হলেও নিরাপদ বোধ করবেন ছোটা রাজন। অথচ এক সময়ে দাউদেরই ডান হাত ছিলেন রাজন। কিন্তু ১৯৯৩ সালের মুম্বই বিস্ফোরণের পরে দাউদের সঙ্গে তাঁর বিরোধ শুরু হয়। দুবাইয়ে রাজনকে খুন করার চেষ্টা করে দাউদের অনুচরেরা। ফলে দুবাই ছাড়তে বাধ্য হন রাজন। তার পর থেকেই নিজেকে দাউদ-বিরোধী ‘দেশপ্রেমিক ডন’ হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা করেছেন তিনি। তা প্রমাণ করতে সালিম কুরলার মতো মুম্বই বিস্ফোরণে জড়িত অপরাধীদের খুনও করান রাজন। দাউদের অনুচরদের দাবি, তাদের নেটওয়ার্ক সম্পর্কেও ভারতের গোয়েন্দাদের কাছে খবর পাচার করেছেন রাজন। অন্তত বার দশেক দাউদকে খুনের চেষ্টাও করেছেন তিনি। ভারতীয় উপমহাদেশের গণ্ডি ছাড়িয়ে এশিয়া, ইউরোপ, অস্ট্রেলিয়া মহাদেশেও দাউদ-রাজন লড়াই অব্যাহত থেকেছে।
দাউদ-রাজন শত্রুতার ঝলক দেখা গিয়েছিল রামগোপাল বর্মার ‘কোম্পানি’ ছবিতে। তাতে রাজনের ছায়ায় তৈরি চরিত্র চান্দু ভারতের জেলে ফিরলেও শেষ পর্যন্ত তারই লোকের হাতে খুন হয়ে যায় প্রাক্তন বস মালিক। গোয়েন্দা কর্তারা জানাচ্ছেন, রাজন গ্রেফতার হলেও মুম্বইয়ের অপরাধ জগতের লড়াই শেষ হয়ে গেল এমনটা ভাবা সম্ভব নয়। কারণ, দেশ-বিদেশের জেলে বসে সাম্রাজ্য চালানোর মাফিয়া ডনদের কাছে তুচ্ছ ব্যাপার।