সুশাসনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। জিতেছেন বিপুল ভোটে। এ বারে সেই সুশাসন প্রতিষ্ঠা করতে শাসনযন্ত্রের খোলনলচে বদলাতে চলেছেন নরেন্দ্র মোদী। মন্ত্রিসভা গঠনের পরই আমলাতন্ত্রে বড় রদবদল হবে বলে সরকারি সূত্রের খবর।
মোদীর সরকারে নতুন ক্যাবিনেট সচিব কে হবেন, বিদেশ, অর্থ ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের সচিবের পদে রদবদল হবে কি না, তা নিয়েই এখন জোর আলোচনা চলছে রাইসিনা হিলসে। নতুন সরকারের জমানায় জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টার পদটি রাখা হবে কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। মনমোহন সিংহ-সরকারের জমানায় একের পর এক দুর্নীতির অভিযোগে আমলারা সিদ্ধান্ত নিতেই ভয় পাচ্ছিলেন। এ বার প্রশাসনের কাজে গতি আনতে চাইবেন মোদী। গুজরাতে তাঁর বিশ্বস্ত বেশ কিছু আমলাকে মোদী দিল্লিতে নিয়ে আসবেন বলে মনে করা হচ্ছে। একই সঙ্গে মোদী এ-ও মনে করছেন, ক্ষমতায় এসেই বর্তমান বিদেশসচিব, অর্থসচিব, স্বরাষ্ট্রসচিবকে সরিয়ে দেওয়া হলে ভুল বার্তা যেতে পারে।
ইউপিএ-জমানায় নিযুক্ত ১৮ জন রাজ্যপালের ভবিষ্যৎ নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। বিশেষ করে শিবরাজ পাটিল, মার্গারেট আলভা, হংস রাজ ভরদ্বাজের মতো এক সময়ের প্রথম সারির কংগ্রেস নেতারা নিজেরাই রাজ্যপালের পদ থেকে সরে দাঁড়াতে চাইছেন। গুজরাতের রাজ্যপাল কমলা বেনিওয়ালের সঙ্গে মোদীর সরকারের বহু বার বিরোধ বেধেছে। তিনিও সরে দাঁড়ানোর ইচ্ছা প্রকাশ করে কংগ্রেস হাইকম্যান্ডের কাছ থেকে সবুজ সঙ্কেত চেয়েছেন। ভরদ্বাজ, বেনিওয়ালের মেয়াদ শেষের দিকে। কিন্তু বিহারের ডি ওয়াই পাটিল, নাগাল্যান্ডের অশ্বিনী কুমার, ওড়িশার এস সি জামিররা রাজভবনে মাত্র এক বছর কাটিয়েছেন। কেরলে শীলা দীক্ষিত বা সিকিমের শ্রীনিবাস পাটিলের মেয়াদ ছয় মাস কাটেনি। কংগ্রেস শীর্ষনেতৃত্ব তাঁদেরও পদত্যাগ করতে বললে দু’জনকেই অস্বস্তিতে পড়তে হবে। আবার না সরে দাঁড়ালে কেন্দ্রীয় সরকার কখন সরিয়ে দেবে, সেই আতঙ্কে থাকতে হবে।
ভোটের প্রচারে দেশের নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে মজবুত করতে ‘শক্তিশালী রাষ্ট্র’-র কথা বলেছিলেন মোদী। স্বাভাবিক ভাবেই প্রশ্ন উঠেছে, কে হবেন জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা? বাজপেয়ীর জমানাতেই প্রথম জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টার পদ তৈরি হয়। দাপুটে ব্রজেশ মিশ্র সেই পদে থেকে একই সঙ্গে বিদেশ নীতি ও অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার দিকটি দেখাশোনা করতেন। কিন্তু মনমোহন-জমানায় পদটির গুরুত্ব কমে আসে। এ বার কানওয়াল সিব্বল ও শ্যাম সারন ওই পদের দাবিদার। দু’জনেই প্রাক্তন বিদেশসচিব। দৌড়ে রয়েছেন আমেরিকায় রাষ্ট্রদূত জয়শঙ্কর, ‘র’-এর প্রাক্তন প্রধান সঞ্জীব ত্রিপাঠী, কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থার প্রাক্তন প্রধান অজিত দোভালও।
মোদীর ঘনিষ্ঠ মহল মনে করছে, জাতীয় নিরাপত্তার উপদেষ্টার পদটি থাকলে অনেক সময়ই বিভ্রান্তি তৈরি হয়। ওই পদে কূটনীতিকদের বসানো হলে বিদেশি নিরাপত্তার দিকটি গুরুত্ব পায়। মার খায় অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা। মনমোহন জমানার শুরুতে প্রথমে কূটনীতিক জে এন দীক্ষিতকে জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা করা হয়েছিল। কিন্তু অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার বিষয়ে বিশেষ উপদেষ্টার দায়িত্ব দেওয়া হয় এম কে নারায়ণনকে। দু’জনের মধ্যে প্রায়ই মতপার্থক্য হত। দীক্ষিতের মৃত্যুর পরে নারায়ণনই ওই পদে আসেন। পরবর্তী কালে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গেও জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টার বিরোধ বেধেছে। মোদীর ঘনিষ্ঠ মহলের একাংশ তাই এই পদটি তুলে দেওয়ারই পক্ষে।
নতুন ক্যাবিনেট সচিব কে হবেন, তা নিয়েও জোর আলোচনা চলছে। কেন্দ্রীয় সরকারের শীর্ষ আমলার এই পদে রয়েছেন অজিত কুমার শেঠ। আগামী ১৩ জুন তাঁর মেয়াদ শেষ হচ্ছে। মনমোহন সিংহ প্রধানমন্ত্রী হয়েই কমল পাণ্ডেকে ক্যাবিনেট সচিবের পদ থেকে সরিয়ে দিয়েছিলেন। মোদী অবশ্য তেমন কিছু করবেন বলে মনে করা হচ্ছে না। ক্যাবিনেট সচিব ছাড়াও টেলিযোগাযোগ, নগরোন্নয়নের মতো বিভিন্ন মন্ত্রকের গুরুত্বপূর্ণ এক ডজন পদও আগামী দু’মাসের মধ্যে খালি হতে চলেছে। মোদী এঁদের মেয়াদ শেষ হওয়ার জন্যই অপেক্ষা করতে পারেন। তার পরে কে আসবেন ক্যাবিনেট সচিবের পদে? প্রবীণতম আমলা সুতনু বেহুড়িয়া ওই পদের প্রধান দাবিদার। তিনি এখন ইস্পাত সচিব। কিন্তু প্রবীণতম আমলাকেই ক্যাবিনেট সচিব করতে হবে, এমন নিয়ম নেই। মোদীর ঘনিষ্ঠ মহলের খবর, উত্তরপ্রদেশের মুখ্যসচিব জাভেদ উসমানি দৌড়ে এগিয়ে। কারণ যুক্তফ্রন্ট সরকার, বাজপেয়ী ও মনমোহন-সরকারের জমানা মিলিয়ে সাত বছর প্রধানমন্ত্রীর দফতরে বিভিন্ন পদে কাজের অভিজ্ঞতা রয়েছে উসমানির। অন্যান্যদের মধ্যে কর্পোরেট বিষয়ক সচিব নাভেদ মাসুদ, জলসম্পদ সচিব অলোক রাওয়াতও দৌড়ে রয়েছেন।
ঢেলে সাজা হবে প্রধানমন্ত্রীর সচিবালয়ও। প্রধানমন্ত্রীর দফতরের প্রিন্সিপ্যাল সেক্রেটারি কে হবেন, তা নিয়েও জল্পনা তুঙ্গে। প্রাক্তন কৃষিসচিব পি কে মিশ্র দৌড়ে এগিয়ে। তিনি গুজরাতের মুখ্যমন্ত্রীর সচিব হিসেবে কাজ করেছিলেন। প্রাক্তন অর্থসচিব অশোক চাওলা, বাজপেয়ী জমানায় ক্যাবিনেট সচিব প্রভাত কুমারের নামও রয়েছে। বর্তমানে মোদীর প্রধান সচিব কে কৈলাসনাথন, দিল্লিতে নিযুক্ত গুজরাতের রেসিডেন্ট কমিশনার ভরত লালও প্রধানমন্ত্রীর দফতরের গুরুত্বপূর্ণ পদে আসতে পারেন।
সংবিধান অনুযায়ী, মন্ত্রিসভা গঠনের পরেই কেন্দ্রকে অ্যাটর্নি জেনারেল ও সলিসিটর জেনারেল নিয়োগ করতে হবে। অ্যাটর্নি জেনারেলের দৌড়ে রয়েছেন মুকুল রোহতগি ও হরিশ সালভে। রোহতগি সুপ্রিম কোর্টে বাবরি মসজিদ মামলায় বিজেপি ও বাজপেয়ী সরকারের হয়ে লড়েছিলেন। সলিসিটর জেনারেল পদের প্রধান দাবিদার রণজিৎ কুমার। যিনি গোধরা, বেস্ট বেকারি মামলায় গুজরাত সরকারের হয়ে সুপ্রিম কোর্টে মামলা লড়েছেন। গুজরাতের অ্যাডভোকেট জেনারেল কমল ত্রিবেদীও ওই পদে আসতে পারেন।