এরই নাম রাজনীতি!
বিহার বিপর্যয়ের পরেও দলে নরেন্দ্র মোদী-অমিত শাহদের নিয়ন্ত্রণ অটুট রয়েছে বুঝতে পেরে কৌশলগত ভাবে কিছুটা পিছিয়েই এলেন প্রবীণ বিজেপি নেতা লালকৃষ্ণ আডবাণী। দিন কয়েক আগেই দলের শীর্ষ নেতৃত্বের বিরুদ্ধ সরব হলেও আজ আমদাবাদে গিয়ে কিন্তু হঠাৎই নরেন্দ্র মোদী সরকারের কাজের প্রশংসা করেন তিনি। আডবাণীর বক্তব্য, উন্নয়নের লক্ষ্যে সরকার সঠিক দিশাতেই চলছে। সময় লাগলেও সাফল্য ঠিকই আসবে। স্বাভাবিক ভাবেই বিক্ষুব্ধ শিবিরের এই প্রশংসায় স্বস্তিতে মোদী-অমিত শাহেরা।
অথচ বিহারে দলের বিপর্যয়ের পরে এই আডবাণীই আর এক প্রবীণ নেতা মুরলীমনোহর জোশী এবং আরও কয়েক জনকে সঙ্গে নিয়ে নাম না করেও কাঠগড়ায় তুলেছিলেন মোদী-শাহদের। আজ আডবাণীর মন্তব্যের পরে দল মনে করছে, এর ফলে প্রবীণদের সঙ্গে বর্তমান নেতৃত্বের যে দূরত্ব সৃষ্টি হয়েছিল, তা অন্তত প্রকাশ্যে কিছুটা হলেও কমবে। বিহার বিপর্যয়ের পরে দলে কর্তৃত্বের দুর্বলতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠায় এই বিক্ষুব্ধ অংশকে সঙ্ঘ পরিবারের মাধ্যমে বার্তা দিতে সক্রিয় হন মোদী-শাহেরা। আডবাণীর সুর নরম করার পিছনে সেটাও একটা কারণ বলে মনে করছেন অনেকে।
আজ কী বলেছেন আডবাণী?
আজ আমদাবাদের খানপুর কেন্দ্রে পুরনির্বাচনের ভোট দিতে এসেছিলেন প্রাক্তন উপ-প্রধানমন্ত্রী। সেখানে ‘আচ্ছে দিন’ নিয়ে একটি প্রশ্নের উত্তরে আডবাণী বলেন, ‘‘আমি মনে করি চাকা ঘুরতে সময় লাগে। আর যে হেতু সরকার সঠিক দিশায় এগোচ্ছে, আমার মনে হয় এর ফল ভালই হবে।’’
বিহারে বিজেপির শোচনীয় ফলের তিন দিনের মাথায় আডবাণী-জোশী-সহ প্রবীণদের পক্ষ থেকে যশবন্ত সিন্হা একটি বিবৃতি দিয়ে কার্যত মোদী-অমিতের একাধিপত্যকেই চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়েছিলেন। আডবাণীদের অভিযোগ ছিল, এক বছর ধরে স্বৈরাচারীর মতো দল চালানোর কারণেই বিহারে এই ফল হয়েছে। বিহারে হারের ক্ষত তখনও দগদগে। তার মধ্যেই প্রবীণ শিবিরের ওই বক্তব্যে চূড়ান্ত অস্বস্তিতে পড়ে পাল্টা বিবৃতি দিয়ে মুখ খুলে নিতিন গডকড়ী-রাজনাথ সিংহেরা জানিয়ে দেন, বিহার বিপর্যয়ের দায় গোটা দলের। কোনও ব্যক্তি বিশেষের নয়। এই বক্তব্য আসলে বিহারে প্রচারের মুখ মোদী-শাহকে আড়াল করার জন্যই বলে ফের সরব হন আডবাণীরা। বলেন, ‘‘জিতলে যাঁরা কৃতিত্ব দাবি করতেন, আজ তাঁরাই দায় ঝেড়ে ফেলার চেষ্টা করছেন!’’ প্রবীণরা যে বর্তমান নেতৃত্বের পাশে নেই, তা স্পষ্ট হয়ে যায় ওই বিবৃতিতে। এর পরেই সঙ্ঘ পরিবারের মাধ্যমে প্রবীণ নেতাদের নরম করতে তৎপর হন মোদী-অমিতরা। সূত্রের খবর, সঙ্ঘ-ঘনিষ্ঠ নেতা রামলাল একে একে প্রবীণ নেতাদের সঙ্গে কথা বলেন। অনেকেই মনে করছেন, সেই দৌত্য যে সফল হয়েছে, তার প্রমাণ আডবাণীর এই নরম সুর।
অবশ্য রাজনীতিতে এ ভাবে সুর চড়িয়েও পিছিয়ে আসা নতুন কিছু নয়। পশ্চিমবঙ্গে বামেদের ভরাডুবির পর প্রকাশ কারাটের নেতৃত্ব নিয়ে দলের ঘরোয়া আলোচনায় সীতারাম ইয়েচুরি সরব ছিলেন। কিন্তু পলিটব্যুরো ও কেন্দীয় কমিটিতে কারাটের পক্ষে সমর্থন বেশি থাকায় এ নিয়ে মুখ বন্ধ রাখাই শ্রেয় বলে মনে করেছিলেন তিনি। এ ক্ষেত্রেও তাই হয়েছে।
এর মধ্যেই বিক্ষুব্ধ শিবিরকে কাছে টানারও চেষ্টা শুরু হয়েছে। বিজেপির তরফে এ মাসের মধ্যেই ‘দিওয়ালি মিলন’ অনুষ্ঠানের ব্যবস্থা করা হয়েছে। দলের বিভিন্ন স্তরের ছোট-বড় একাধিক নেতা সেখানে থাকবেন। ডাকা হচ্ছে সাংবাদিকদেরও। তাঁদের সঙ্গেও আলাদা করে দেখা করবেন মোদী। এর মধ্যে যশবন্ত সিন্হার পুত্র তথা কেন্দ্রীয় মন্ত্রী জয়ন্ত সিন্হার বাড়িতে একটি ‘দিওয়ালি মিলন’ অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছিল। তবে তা শেষ মুহূর্তে বাতিল হয়ে যায়। পিছিয়ে নেই আডবাণীও। নিজের ও স্ত্রী কমলা আডবাণীর জন্মদিন উপলক্ষে চলতি সপ্তাহে একটি ঘরোয়া অনুষ্ঠানের আয়োজন করছেন তিনি। যেখানে প্রধানমন্ত্রী-সহ দলের সমস্ত শীর্ষ নেতাকে আমন্ত্রণ জানাচ্ছেন। বিহার-তিক্ততার রেশ কাটিয়ে সম্পর্ক ভাল করার ইঙ্গিত দিতে এখন সক্রিয় দু’পক্ষই।