Advertisement
E-Paper

কেতাদুরস্ত পানীয়ের পাশে এখনও সদর্পে গদি দখল করে রয়েছে দুধ চা, রইল শহরের ৫টি ঠেকের ঠিকানা

গুঁড়ো চা, দুধ, চিনি, কখনও বা আদা, এলাচ— দুধ চায়ের প্রেমে মজে শহর কলকাতার। তার কদর কমেনি কোনও প্রজন্মেই। তা সে নতুন যে পানীয়ই ‘ট্রেন্ড’-এ আসুক না কেন! দুধ চায়ের ভাঁড়ে চুমুক দিতে দিতে যে সব জায়গায় জমজমাটি আড্ডা হয়, আনন্দবাজার ডট কম তারই মধ্যে ৫টি ঠিকানার সন্ধান দিচ্ছে।

আনন্দবাজার ডট কম সংবাদদাতা

শেষ আপডেট: ১১ মে ২০২৬ ০৮:৫৯

গ্রাফিক: আনন্দবাজার ডট কম।

কলকাতার অলি-গলিতে এখন ক্যাফে। আর সেখানে কেতাদুরস্ত চা ও কফিপ্রেমীর ভিড় হয় সকাল থেকে রাত। দার্জিলিং ফার্স্ট ফ্লাশ বা সেকেন্ড ফ্লাশ, ক্যাপুচিনো বা আমেরিকানো, কোথাও আবার জাপানি মাচা, বোবা টি অথবা আইস্‌ড টি। কিন্তু এই শৌখিনতার মাঝেও কদর কমেনি ভাঁড়ের দুধ চায়ের। এখনও উত্তর থেকে দক্ষিণ কলকাতার পাড়ার মোড়ে মোড়ে চায়ের দোকানে চা-প্রেমীদের ভিড় জমে সন্ধ্যায়। ষাটোর্ধ্বদের পাশাপাশি ভাঁড়ের দুধ চায়ে চুমুক দিতে দেখা যায় তরুণ-তরুণীদেরও। বিলাসিতার চাকচিক্যের পাশে আজও সগর্বে বেঁচে আছে দুধ চা পানের রেওয়াজ। শহরে এমন বেশ কিছু জমজমাটি ঠেক রয়েছে, যেখানে চায়ের আড্ডায় বসা নতুন প্রজন্মের ছেলেমেয়েদের কাছেও ‘ট্রেন্ড’। দুধ চায়ের ভাঁড়ে চুমুক দিতে দিতে যে সব জায়গায় এমন আড্ডা জমে, আনন্দবাজার ডট কম তারই মধ্যে ৫টি ঠিকানার সন্ধান দিচ্ছে।

মহারানি (দেশপ্রিয় পার্ক)

দক্ষিণ কলকাতার অন্যতম চায়ের দোকান বললে বাড়িয়ে বলা হয় না। সৌরভ গঙ্গোপাধ্যায় থেকে বিদ্যা বালন, যীশু সেনগুপ্ত থেকে… কে আসেননি দোকানে! শুধু তো চা নয়, ভোর থেকে সঙ্গে তৈরি হতে থাকে কচুরি-মিষ্টি। জিলিপি, মালপোয়া, গোলাপ জামুনের চাহিদা থাকে তুঙ্গে। কলেজ পড়ুয়া থেকে উত্তর তিরিশ, ভিড় জমান সমানতালে। সঙ্গে প্রবীণদেরও দেখা মেলে যখন-তখন। ১০ টাকা থেকে শুরু করে ৫০ টাকার চা-ও পাওয়া যায়। কফির দাম ৩০ টাকা। ৪০ বছরের বেশি পুরনো এই দোকানে শনি-রবি-বৃহস্পতিবার বেশি ভিড় হয়। সারি দিয়ে সাজানো টুলে বসে চা আর আড্ডা চলে দিনভর।

সময়: সাড়ে ৬টা থেকে বেলা সাড়ে ১২টা পর্যন্ত, আবার বিকেল সাড়ে ৩টে থেকে রাত সাড়ে ৯টা পর্যন্ত।

রাধুবাবু (রাসবিহারী)

রাজ কপূর যখন কলকাতায় ছিলেন, তখন নাকি এই দোকানে নিয়মিত চা খেতে দেখা যেত তাঁকে! তার পরে কে না এসেছেন! তারকাদের চা খাওয়াতে খাওয়াতে দোকানটিই হয়ে উঠেছে শহর কলকাতার একটি নক্ষত্র। দেখতে দেখতে ৯৪ বছর পার করে ফেলেছে এই দোকান, তবু এতটুকু জৌলুস কমেনি। লেক মার্কেটের গায়ে ছোট্ট দোকানটিতে এখনও ভোর থেকে ভিড় হয়। সেখানে চা-জলখাবার খেয়ে দিন শুরু করেন কত লোকে! দোকানের মালিক সত্যসুন্দর দত্তের কথায়, ‘‘এখনও টলিউডের অনেক শিল্পীই জলখাবার করতে আর চা খেতে আসেন এখানে। লোপা (লোপামুদ্রা মিত্র), জয় (জয় সরকার), শ্রীকান্তদা (শ্রীকান্ত আচার্য), হরদা (হরনাথ চক্রবর্তী), কৌশিক গঙ্গোপাধ্যায়ের মতো আরও অনেকে।’’ যে কোনও চা-ই ১০ টাকায় পাওয়া যায়। তা সে লাল হোক বা দুধ চা। পাতা এবং হাফ-ডাস্ট মিশিয়ে চা বানানো হয়। তবে অন্যান্য দোকানের সঙ্গে রাধুবাবুর চায়ের বড় পার্থক্য হল, এদের দুধ চা একেবারে পাতলা। ঘরোয়া চায়ের স্বাদ রয়েছে এই দোকানে। দোকানের প্রতিষ্ঠাতা রাধাকিশোর দত্তের পরের প্রজন্মই এখন এই দোকানের দায়িত্বে রয়েছেন।

সময়: সকাল ৬টা থেকে ১০টা, বিকেলে সাড়ে ৩টে থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত খোলা। এক দিনও বন্ধ থাকে না।

বলবন্ত সিংহ ধাবা (ভবানীপুর)

চাপ্রেমীদের কাছে হরিশ মুখার্জি রোডের এই দোকানও কম তারকাসুলভ নয়। নিশাচর চা-প্রেমীদের আড্ডার ঠেক বললে অত্যুক্তি হবে না। সারা রাত গরম গরম দুধ চা খেতে ভিড় জমান খরিদ্দারেরা। তা সে গ্রীষ্ম হোক বা শীত, বর্ষা হোক বা বসন্ত। এই দোকানের পরিসর উঠোন পর্যন্ত সীমিত নয়, বরং গোটা রাস্তা জুড়েই চা-প্রেমীদের ভিড় থাকে। কারণ, রাস্তার ধার ঘেঁষে গাড়ি দাঁড় করাতেই দোকান থেকে কর্মচারীরা অর্ডার নিতে চলে আসেন। ফলে গাড়িতে বসে আড্ডা দিতে দিতেও চা খান অনেকে। তাই দোকানের ভিতরে জায়গা আছে কি নেই, তাতে যায় আসে না কিছু। রাতের খাবার খেতে বলবন্ত ধাবায় যান অনেকেই, কিন্তু শেষপাতে চা থাকা চাই-ই চাই।

সময়: রোজ ২৪ ঘণ্টাই এই দোকান খোলা।

ফালতু (চাঁদনি চক)

কলকাতার চায়ের ঠেক হিসাবে তত পুরনো নয় ঠিকই। কিন্তু মধ্য কলকাতায় অফিসের ভিড় যেমন জমে এখানে, তেমনই যাদবপুর-প্রেসিডেন্সির ছাত্র-শিক্ষকেরা কাজের ছুঁতোয় এসে আড্ডা জমান অফিসপাড়ার এই ঠিকানায়। অফিসপাড়া রবিবার প্রায় বন্ধ থাকে। তবে তাতেও ফালতুর ভিড় কমে না। এই দোকানের নামের সঙ্গে তাদের চায়ের মানের কোনও মিল নেই। বরং নামকরণেই অভিনব হয়ে উঠেছে চাঁদনি চকের এই দোকান। ভোর থেকে রাত পর্যন্ত থিকথিকে ভিড় থাকা সত্ত্বেও চায়ের মানের সঙ্গে আপস করা হয় না। ১০ টাকা থেকে শুরু করে ২৫ এবং ৩০ টাকায় মহিষের ঘন দুধের চা মেলে এখানে। মালিক আফতাবের কথায় জানা গেল, এই দোকানের বয়স হয়েছে ১৩ বছর। তারই মধ্যে মধ্য কলকাতার চা-প্রেমীদের মন জিতে নিয়েছে এই দোকান। চায়ের পাশাপাশি মালাই টোস্ট, স্যান্ডউইচ ইত্যাদির চাহিদাও থাকে সারা দিন। যদিও দুধ চায়ের বিক্রির সঙ্গে তাল মেলাতে পারে না, তবু গ্রিন টি ও কফির খরিদ্দারও মেলে সেখানে।

সময়: ভোর ৪টে থেকে রাত ১১টা পর্যন্ত খোলা। এক দিনও বন্ধ থাকে না।

আপ্পা (বাগবাজার)

২০০২ থেকে বাগবাজার মোড়ের চা-প্রেমীদের তৃষ্ণা মেটাচ্ছে এই দোকান। তবে তার সম্পূর্ণ ভোলবদল হয় কোভিড লকডাউনের সময়ে। চটকদার নামকরণও হয় তখন। দোকানের কর্ণধার শুভজিৎ রায়চৌধুরী ওরফে আপ্পা বললেন, ‘‘এত বছর বাবাই এই দোকানের দেখভাল করতেন। কোভিডের সময় থেকে আমিই চালাই দোকান। তখন নানা ধরনের নতুনত্ব আনি।’’ আপ্পার দোকানে চা খাওয়ার পর কাপটাও সাবাড় করতে পারেন আপনি। কারণ বিস্কুট দিয়ে তৈরি মজাদার কাপে পরিবেশন করা হয় চা ও রকমারি পানীয়। তবে সমাজমাধ্যমে আইসক্রিম চা, ওরিয়ো চা, গুড় চা, মাখন চা, নানাবিধ কফির মতো কেতাদুরস্ত পানীয়ের ঝলক ভাইরাল হলেও দুধ চায়ের কদর কমেনি। মূলত ঘন দুধের চায়ের বিক্রিই নাকি বেশি। চাইলে ভাঁড়েও চা খেতে পারেন, আবার নলেনগুড় বা আমের স্বাদের বিস্কুটের কাপেও চুমুক দিতে পারেন। দুধ চায়ের দাম শুরু ১০ টাকা থেকে।

সময়: সকাল ৭টা থেকে দুপুর ১টা, বিকেল ৫টা থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত খোলা থাকে। সপ্তাহে কোনও দিনই বন্ধ করা হয় না দোকান।

যে প্রজন্ম ক্যাফেতে বসে ১০০-৩০০ টাকার প্রিমিয়াম চা ও কফি খেতে অভ্যস্ত, তারাই রাত সাড়ে ১০টায় পাড়ার চায়ের দোকানে গিয়ে ভাঁড়ের দুধ চা খুঁজছে। কেতাদুরস্ত ক্যাফের নিখুঁত আলোও যেমন চাই, তেমনই রাস্তার হ্যালোজেনের নীচে দাঁড়িয়ে রাজনীতি-ফুটবলের আলোচনা বা কুটকচালিও পছন্দ তাঁদের। আর হাতে থাকবে গরম ধোঁয়া ওঠা দুধ চা।

Milk Tea
Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy