গত কয়েক বছরে অনেকখানি বদলেছ গিয়েছে উচ্চ শিক্ষার ধ্যান ধারণা। এক সময় গতানুগতিক বিষয় নিয়ে পড়াশোনা না করলে ভবিষ্যতে রোজগার বা সামাজিক প্রতিষ্ঠার পথ খোলা থাকবে না বলে মনে করা হত। করোনা পরবর্তী সময়ে বৃত্তিমূলক শিক্ষার দিকেই ঝুঁকেছে নতুন প্রজন্মের পড়ুয়ারা। তবে এরই পাশাপাশি উচ্চ শিক্ষায় কদর বাড়ছে পারফর্মিং আর্টস-এর! কী কী পড়তে হয় এই বিষয়ে? কেমন সুযোগ মিলতে পারে পারফর্মিং আর্টস নিয়ে পড়াশোনা করে?
সাধারণত দ্বাদশ উত্তীর্ণ হওয়ার পরই এ বিষয় নিয়ে পড়াশোনা শুরু করা যায়। সে ক্ষেত্রে বিজ্ঞান, কলা অথবা বাণিজ্য— যে কোনও বিভাগের পড়ুয়াই বেছে নিতে পারেন এই বিষয়। এ রাজ্যে রবীন্দ্রভারতী এবং বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ে পারফর্মিং আর্টস নিয়ে পড়ানো হয় দীর্ঘ দিন ধরেই। গত কয়েক বছর ধরে প্রেসিডেন্সিতেও এ বিষয়ে পড়ানো হয়ে থাকে।
রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের পারফর্মিং আর্টসের মধ্যে নৃত্য, নাটক, রবীন্দ্রসঙ্গীত, কণ্ঠসঙ্গীত, যন্ত্রসঙ্গীত-সহ নানা বিষয় পড়ানো হয়। ভর্তির ক্ষেত্রে বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব প্রবেশিকায় উত্তীর্ণ হতে হয়। যে কোনও বিভাগেই প্র্যাক্টিক্যাল ক্লাসের উপর বিশেষ জোর দেওয়া হলেও থিয়োরিও পড়তে হয় পড়ুয়াদের।
আবার, বিশ্বভারতীর ক্ষেত্রে ভর্তির প্রক্রিয়াটা খানিক আলাদা। পারফর্মিং আর্টসের কোনও বিষয়ে ভর্তি হতে হলে কমন ইউনিভার্সিটি এন্ট্রান্স টেস্ট (কুয়েট) উত্তীর্ণ হতে হয়। তার পরও প্রয়োজন অনুযায়ী বিশ্ববিদ্যালয় আয়োজিত প্রবেশিকা হয়। সেখানে উত্তীর্ণ হলেই মেধাতালিকার ভিত্তিতে ভর্তি নেওয়া হয়। বিশ্বভারতীর তরফে স্নাতক বা স্নাতকোত্তর যে কোনও কোর্স চলাকালীনই ইন্টার্নশিপ করতে হয় পড়ুয়াদের।
কিছুটা ব্যতিক্রমী পাঠক্রম প্রেসিডেন্সি বিশ্ববিদ্যালয়ে। এই প্রতিষ্ঠানে থিয়োরি এবং প্র্যাক্টিক্যাল আলদা ভাবে পড়ানো হয়। পারফর্মিং আর্টসের মধ্যে মিডিয়ার কী প্রভাব পড়ছে, সিনেমাটোগ্রাফি, পারফর্মিং টেকনোলজির পাশাপাশি শিক্ষার্থীরা কী শিখছে তার উপর ভিত্তি করেই পাঠ দেওয়া হয়। প্রেসিডেন্সির পারফর্মিং আর্টসের বিভাগীয় প্রধান নীলাদ্রি রায় বলেন, “পরফর্মিং আর্টসের বিষয় অনেকটাই বিস্তৃত। ভিসুয়্যাল আর্টস, আর্কিয়োলজি-সহ নানা খুঁটিনাটি দিকই এই বিষয়ের সঙ্গে জড়িত। দেশ-বিদেশের ইতিহাস, দর্শন, নন্দনতত্ত্বের সঙ্গে কী ভাবে পারফর্মিং আর্টস জড়িয়ে রয়েছে তা-ও পড়ানো হয়।” পাশাপাশি তিনি জানান, ফিল্ম স্টাডিজ়, মিউজ়িক থেরাপির মতো বিষয়ে পড়া যায় পারফর্মিং আর্টস পড়ে।
স্নাতকের পর স্নাতকোত্তরের সুযোগ তো থাকেই। তবে, রাজ্যের বাইরে জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়, জামিয়া মিলিয়া ইসলামিয়া-সহ নানা প্রতিষ্ঠানে এ বিষয়ে উচ্চশিক্ষার সুযোগ পাওয়া যায়। দেশের বাইরে গিয়েও পিএইচডি- গবেষণার সুযোগ পাওয়া যায়।
পেশাগত সুযোগ সুবিধা
গবেষণার পরিসর এই বিষয়ের ক্ষেত্রে অনেকটাই বেশি। আগে শুধু মাত্র নাচ অথবা নাটকে সীমাবদ্ধ থাকলেও এখন ইন্টারডিসিপ্লিনারি পাঠ্যক্রমের ফলে তার বিস্তার হয়েছে, ফলত গবেষণার ক্ষেত্রগুলিও আরও বৃদ্ধি হয়েছে। যেমন, সাহিত্যের সঙ্গে কী ভাবে পার্ফরমিং আর্টসের যোগ রয়েছে, কেউ যদি ইংরেজি থিয়েটার নিয়ে গবেষণা করেন সে ক্ষেত্রে ইংরেজি থিয়েটার এবং সাহিত্য কী ভাবে এক অপরের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে তা পড়তে হয়। ভারতীয় সঙ্গীতের মিউজিয়োলজি-র সঙ্গে গনিতের কী সম্পর্ক রয়েছে তা পড়তে হয়।
নীলাদ্রি বলছেন, ‘‘রাজ্যের বাইরে যেমন ধ্রুপদী সঙ্গীত বা ক্ল্যাসিক্যাল মিউজিককে প্রাধান্য দেওয়া হয়, তেমনই বাংলায় প্রাধান্য পায় লোকসঙ্গীত। ভারতীয় সঙ্গীতের ইতিহাস, পাশ্চাত্য সঙ্গীতের উন্নতি কোন কোন নিরিখে হতে পারে, এই সমস্ত ঐতিহ্যবাহী ধারার পাশাপাশি সমকালীন ধারণার পাঠও খুব প্রয়োজন।” তিনি মনে করেন, ইন্টারডিসিল্পিনারি যে ক্ষেত্রগুলি রয়েছে বিশ্ব সঙ্গীতের নিরিখে সেগুলি না জানলে পরবর্তী সময় গ্লোবাল এডুকেশনে পা রাখা মুশকিল হতে পারে।
পারফর্মিং আর্ট এমনই একটি বিষয় যেখানে স্বাধীন চর্চা, গবেষণা, অধ্যাপনা ছাড়া খুব একটা সুযোগ নেই। তবে স্বাধীন ভাবে এগোতে চাইলে গবেষণা করে অথবা নিজের প্রতিষ্ঠান তৈরি করে তা হলে এগোনো সম্ভব। বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের পারফর্মিং আর্টসের অধ্যক্ষ শ্রুতি বন্দোপাধ্যায় বলেন, ‘‘অন্য বিষয়ের মতো পারফর্মিং আর্টস-এও মনোযোগ খুব জরুরি। আমি নিজে পদার্থবিদ্যা নিয়ে পড়াশোনা করে নাচ নিয়ে পড়াশোনা করেছি। প্রাথমিক ভাবে বুঝতে পারিনি নাচ নিয়ে পড়তে আমার ভাল লাগবে। পরে ভাল লেগেছে।’’
প্রতি বছরই বিশ্বভারতী, রবীন্দ্রভারতী বা প্রেসিডেন্সি থেকে বহু পড়ুয়া পারফর্মিং আর্টস নিয়ে পড়ে নিজ নিজ ক্ষেত্রে স্বীকৃত পেয়েছেন। সুতরাং এই বিষয় নিয়ে পড়ার ভবিষ্যৎ যে একদমই নেই তা ভেবে নেওয়ার চাইতে লক্ষ্য তৈরি করে পড়লে এগোনো সম্ভব বলেই মনে করছেন শিক্ষা মহলের একাংশ।