পিছিয়ে গেল সবুজ। এগিয়ে কমলা-ই!
ভোটের গণনায়? উঁহু, শাসক হিসাবে বাঙালি কাকে বেছে নেবে, সে অঙ্ক আলাদা। বাঙালির আরও এক পছন্দের বিষয়, মিষ্টি নিয়ে তলে তলে চলছে আর এক লড়াই। সেই লড়াইয়ের ফল প্রকাশিত। সবুজকে হারিয়ে অনেকটা এগিয়ে কমলা! দামে এবং ‘আমে’ও!
বাংলা এখন গরম! ভোটের আঁচ তো আছেই, কম যাচ্ছে না মাঝ বৈশাখের তাপও। সেই আবহে বাজারে উঠেছে আম। কাঁচা আর পাকা— দুই-ই। গরমের ‘থিম’ মেনে বাঙালি মিষ্টির দোকানও হয়ে উঠেছে আমময়। ট্রেতে সাজিয়ে বিক্রি হচ্ছে সবুজ রঙের কাঁচা আমের স্বাদের সন্দেশ-রসগোল্লা থেকে শুরু করে পাকা আমের শাঁস ভরা হলদেটে কমলা সন্দেশ-তালশাঁস ইত্যাদি।
পশ্চিমবঙ্গ জুড়ে যখন সবুজ-কমলায় ভাগাভাগি, তখন মিষ্টিপ্রেমী বাঙালির চাহিদা বোঝা মিষ্টির দোকানই বা বাদ যায় কী করে? অতএব শুরু হয়েছে লড়াই। কয়েকটি মিষ্টির দোকান সেই লড়াই উস্কে দিয়েছে রাজনৈতিক দলের প্রতীকের ছাপ দেওয়া মিষ্টি তৈরি করে আবার কিছু মিষ্টির দোকান ভোটের মিষ্টি না বানালেও সবুজ আর কমলা আম সন্দেশ রেখেছে। সেই মিষ্টির দামের ফারাকও চোখে পড়ার মতো।
উত্তর কলকাতার ভীম নাগের মিষ্টির দোকানের কথাই ধরা যাক। লালচে মেরুন লেডিকেনির জন্য বিখ্যাত ভীম নাগে কাঁচা আম এবং পাকা আমের সন্দেশ পাওয়া যাচ্ছে ভোটের মরসুমে। কাঁচা আমের সন্দেশের দাম এক একটি ২৫ টাকা করে। পাকা আমের সন্দেশ ৪০ টাকা। দাম বেশি কেন প্রশ্ন করায় দোকানি জানান, ‘‘ওতে আলফানসো আমের শাঁস ভরা আছে।’’ আলফানসো বাংলার আম নয়, রাজ্যের নিজস্ব পাকা আম বাজারে উঠবে আরও দিন কয়েক পরে। তাই আপাতত ‘বহিরাগত’ আমেই ভরসা রাখছে, জনপ্রিয় মিষ্টির দোকান।
সন্দেশের কথা হলে কলকাতাকে সমানে সমানে টক্কর দেয় হুগলির সন্দেশ। সেই হুগলির মিষ্টিকার চন্দননগরের সূর্য মোদক জানাচ্ছে, দোকানে কাঁচা আমের রসগোল্লা আছে আর আছে পাকা আমের সন্দেশ এবং তালশাঁস। দাম কত? দোকানের মালিক বললেন, ‘‘কাঁচা আমের রসগোল্লা ১৫ টাকাতেই পেয়ে যাবেন। আমের সন্দেশ ২০ টাকা থেকে শুরু। পাকা আমের জলভরা সন্দেশের দাম ৬৫ টাকা।’’ অর্থাৎ, এখানে সবুজ কাঁচা আম ‘সংখ্যালঘু’।
হুগলির মিষ্টির কথা উঠলে রিষড়ার ফেলু মোদকের কথাও চলে আসে। এ দোকানের মুচমুচে রসালো গজা জনপ্রিয়। ভোটের বাজারে কাঁচা এবং পাকা আমের সন্দেশ তো বটেই, ভোটের মিষ্টির অর্ডারও পেয়েছে তারা। রাজ্যের সাধারণ মানুষ যেখানে কে জিতবে, তা নিয়ে অনিশ্চিত, তখন আগেভাগে সাফল্য বুঝে মিষ্টির অর্ডার কোন দল দিল? প্রশ্ন করায় উত্তর এড়িয়ে গেলেন দোকানের মালিক। তবে আম সন্দেশের দাম জানাতে কার্পণ্য করেননি। তিনি বলেছেন, ‘‘কাঁচা আমের রসগোল্লা তিন রকম দামের রয়েছে ১৫-২০-২৫। পাকা আমের সন্দেশ পাবেন ২০ টাকা থেকে ১০০ টাকা পর্যন্ত দামে।’’ কেন দাম বেশি? প্রশ্নে তিনি জানিয়েছেন, কী ভাবে বানানো হচ্ছে, তার উপরেই নির্ভর করে মিষ্টির দাম।
তবে সবুজ-কমলার মধ্যে সুন্দর ভারসাম্য বজায় রেখেছে কলকাতার বলরাম মল্লিক রাধারমণ মল্লিকের মিষ্টির দোকান। তারা আবার শুধু রঙে থামেনি। ভোটের বাজারে দলের প্রতীক দেওয়া মিষ্টিও বানিয়েছে। তৃণমূলের জোড়াফুল, বিজেপির পদ্ম, সিপিএমের কাস্তে-হাতুড়ি-তারা আর কংগ্রেসের হাত ছাপের মিষ্টি। এর মধ্যে জোড়াফুলের ছাপের মিষ্টির রং সবুজ, স্বাদ কাঁচা আমের। বিজেপির পদ্মছাপ মিষ্টি কমলা রঙের। সেটি কমলালেবু কিংবা পাকা আমের স্বাদের। দাম কত? দোকানের কর্মীরা জানিয়েছেন, সব দলের প্রতীক দেওয়া সন্দেশই ২৫০টাকা করে দাম। তবে সিপিএমের সাদা ছানার সন্দেশ আর কংগ্রেসের গুড়ের সন্দেশের তুলনায় সবুজ আর কমলা সন্দেশ বানানো হয়েছে বেশি পরিমাণে। কারণ, ‘খেলা’ তো সেখানেই।
ভোটের বাজারে ছাপ সন্দেশের অর্ডার এসেছিল গাঙ্গুরামের কাছেও। কিন্তু তারা বিতর্ক এড়িয়েছে। সরাসরি বলেছে, ‘‘ছাপ দেওয়া সন্দেশ হবে না। যে কোনও রঙের সন্দেশ চাইলে দিয়ে দেব।’’ কাঁচা এবং পাকা আমের মিষ্টি রয়েছে তাদেরও। কাঁচা আমের রসগোল্লার টিন ২০টির দাম ২৫০ টাকা। অর্থাৎ, এক একটির দাম সাড়ে ১২ টাকা করে। এক একটি পাকা আলফানসো আমের সন্দেশ কিনতে হলে দিতে হবে ৩০ টাকা।
ভোট উপলক্ষে দল দেখে মিষ্টি বানিয়েছে কলকাতার রসগোল্লার আদিক্ষেত্র কেসি দাসও। এখানেও সবুজ, কমলা আছে। তার সঙ্গে রয়েছে লালও। অবশ্য কোনওটিই আম নয়। প্রচারে এসে কেসি দাসে মিষ্টি খেতে এসেছিলেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। তাঁর নামে ভোটের বাজারে ‘মোদিশ্রী’ মিষ্টি বানিয়েছে কেসি দাস। যা আসলে জাফরানের সুগন্ধে ভরা কমলা রঙের রসগোল্লা। তবে একা মোদী নন, ‘দিদি’-ও থাকছেন মিষ্টির ট্রে-তে, তাঁর দলের ‘জয় বাংলা’ স্লোগান নিয়ে। শাসকদলের ‘থিম’-এ তৈরি হয়েছে সবুজ রঙের গন্ধরাজ রসগোল্লা। এদের পাশে ‘লাল সেলাম’ মিষ্টিও থাকবে ট্রে-তে। লালচে রঙের সেই রসগোল্লা তৈরি হবে লাল গোলাপের আভা আর গন্ধ নিয়ে।
পশ্চিমবঙ্গে কোন দল ক্ষমতায় আসবে, তা সময় বলবে। কিন্তু বাঙালির কাছে মিষ্টি যে সবার উপরে, আমের লড়াই তা বলেই দিচ্ছে!