ছোটবেলায় বাড়িতে দাদুর বন্ধুদের আড্ডা বসতে দেখেছি। তাসের আড্ডা। তবে সে আড্ডায় খাওয়াদাওয়া, তর্ক আর নানা উষ্টুমধুষ্টুম বিষয় নিয়ে তুমুল হই-হট্টগোল করতেন এক দল ষাটোর্ধ্ব। দাদুর বন্ধুদের মধ্যে ভাল লাগত ক্ষীরোদদাদুকে। তিনি যেখানেই বসতেন, সেখানটায় খানিক বাড়তি আলো থাকত। এমনই ধবধবে দুধ-সাদা আদ্দির পাঞ্জাবি আর ধুতি পরতেন তিনি যে, কেমন যেন উজ্জ্বল হয়ে থাকতো আশপাশ (এযুগে হলে ‘অরা’ বলতো জেন জ়ি)। প্রতি দিন বসতো আড্ডা আর প্রতি দিনই তাঁর এক রকমের কড়কড়ে নতুনের মতো সাদা ধুতি-পাঞ্জাবি। ছিটেফোঁটা ময়লাও নেই। বড় হয়ে যখন ‘ধোপদুরস্ত’ শব্দটির সঙ্গে পরিচয় হল, তখন প্রথম ক্ষীরোদদাদুর কথাই মনে হয়েছিল। মা-বাবাকেও বলতে শুনতাম, “ক্ষীরোদকাকা শৌখিন মানুষ।” তখন তলিয়ে ভাবিনি, কিন্তু এখন বুঝতে পারি, মানুষটি আড্ডার আসরে একটু হলেও বাকিদের থেকে বাড়তি নজর কেড়ে নিতেন কেবল পোশাকের দৌলতে।
আরও একটু বড় বয়সে মামাদের আড্ডার পোশাক দেখে ‘ইমপ্রেস্ড’ হতাম। মামার বাড়ি ঘোরতর কংগ্রেস। তাঁরা আড্ডা দিতে যেতেন পাটভাঙা সাদা, ঘিয়ে কিংবা রঙিন খদ্দরের পাঞ্জাবি পরে। অফিস থেকে বাড়ি ফেরার পরে বেশ তরিবত করেই তৈরি হতেন তাঁরা আড্ডা দেওয়ার জন্য। কোনও দিন অফিসের শার্ট প্যান্ট পরে বেরিয়ে যেতে দেখিনি। স্নান সেরে, গায়ে ট্যালকম পাউডার, ওডিকোলন ছড়িয়ে খদ্দরের পাঞ্জাবি আর সাদা পাজামা গলিয়ে বেরোতেন দুই ভাই। যে ভাবে তৈরি হতেন, সেই সাজে যে কোনও অনুষ্ঠানবাড়িতেও অনয়াসে চলে যাওয়া যায়।
বাবাদের আড্ডার পোশাক ছিল আবার অন্য রকম। পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন। কিন্তু বাড়তি কেতার ব্যাপার নেই। সাধারণ পাজামার উপর শার্ট বা টিশার্ট। খুব বেশি হলে আলিগড়ি পাজামার উপর বাহারহীন হাফহাতা পাঞ্জাবি। কোনও রকম দৃষ্টিসুখের ব্যাপার নেই। বরং খানিকটা ইচ্ছে করেই ‘অ্যান্টি ফ্যাশন’ হওয়া। যেন ওই অতিরিক্ত ‘কেয়ারলেস’ থাকাটাই আসল ফ্যাশন। সে-ও সম্ভবত ছিল ভিড়ের মধ্যে আলাদা হওয়ারই এক অন্য ধরন।
আর এ যুগে? এক ৬০ ছুঁই ছুঁই মানুষকে চিনি, যিনি স্কুলের বন্ধুদের সঙ্গে ক্যাফেতে আড্ডা দিতে যাওয়ার জন্য জামা-কাপড়ের আলমারির সামনে মিনিট আধ ঘন্টা সময় ব্যয় করেন। সঠিক জামার সঙ্গে সঠিক জুতো আর ব্যাগ বাছতে না পারলে খুঁতখুঁত করেন। শীতের আড্ডায় মানানসই জ্যাকেট টেনে বার করেন কাদের সঙ্গে আড্ডা দিতে যাবেন, সে কথা মাথায় রেখে। জেন জ়ি, মিলেনিয়ালদের কথা নয় ছেড়েই দেওয়া গেল। ইনি তো ‘ব্যুমার’। সেই প্রজন্মের মানুষ, যাঁরা তথাকথিত কেয়ারলেস বামপন্থী ফ্যাশন দেখে বড় হয়েছেন।
আরও পড়ুন:
এঁদের পূর্বসূরিরা ষাট থেকে সত্তরের দশকে এক অদ্ভুত সাজের চল এনেছিলেন। চারপাশ তখন অশান্ত। ও পারে মুক্তিযুদ্ধ এ পারে বামমনস্ক আন্দোলন। সেই সময়েও আড্ডা ছিল পুরোদস্তুর। তবে আড্ডার জন্য ভেবচিন্তে তৈরি হওয়ার চাড় ছিল না। বরং তৈরি না হওয়াটাই ছিল সেকালের ট্রেন্ড। ফ্যাশনের প্রতি তীব্র অবহেলাই ছিল ফ্যাশন। পরিপাটি সাজ পাত্তা পেত না। ফলে জন্ম নিল এক অদ্ভুত ‘ফ্যাশন বিরোধী-ফ্যাশন’। ইস্ত্রি করা শার্ট, দামি পাঞ্জাবি ব্রাত্য। বদলে আড্ডার ‘ইউনিফর্ম’ হয়ে দাঁড়ালো অবিন্যস্ত শার্ট, রং জ্বলে যাওয়া বা সিগারেটের ছাইয়ে ফুটো হয়ে যাওয়া পাঞ্জাবি, ঢোলা পাজামা, কাঁধে শান্তিনিকেতনি ঝোলা আর পায়ে অতি সাধারণ চামড়ার চটি। যিনি যত বড় চিন্তাশীল, তাঁর পোশাক তত বেশি অগোছালো। মোটা ফ্রেমের চশমা আর অবিন্যস্ত চুলের ‘কেয়ারলেস’ সাজের আড়ালেই অনুচ্চারে বলা থাকত রীতির পরোয়া না করার কথা।
যদিও বাঙালি আড্ডা বরাবরই যে অগোছালো, ছিল তা নয়। নবজাগরণের কলকাতায় ঠাকুরবাড়ির চায়ের মজলিশ থেকে শুরু করে কালীপ্রসন্ন সিংহের বৈঠকখানা, কিংবা মধুসূদন দত্তের বাড়িতে যে সব বিদগ্ধ মানুষের বৈঠক জমত, তাতে শৌখিন পোশাকেই সেজেগুজে আসতেন সেকালের প্রতিভাধরেরা। মধুসূদন, ডিরোজ়িয়োর অনুগামীরা পরতেন সাহেবি কেতার পোশাকআশাক। বাকিরা ধোপদুরস্ত পাঞ্জাবি, ধুতি, দামি জুতো, ছড়ি নিয়ে হাজির হতেন আড্ডা দিতে। সেই সব আড্ডা ছিল সাহিত্য, সংস্কৃতির খনি। পোশাক সেখানে বিচার্য না হলেও মননের প্রকাশ ছিল তো বটেই।
বাঙালির আড্ডা নিয়ে কথা হলে চণ্ডীমণ্ডপ, নমাজ শেষের মসজিদ বা বটতলার আড্ডাও চলে আসে। এখন উচ্চবর্গীয় ক্লাবে যা হয়, সে কালের সমমনস্ক মানুষজনকে সেই একই জায়গা আর সেই স্বাধীনতা দিত এলাকার ধর্মীয় স্থানের চত্বর কিংবা গ্রামের কোনও বড় গাছের ছায়াতল।
সময়ের চাকা যত ঘুরেছে, নানা বদলের সঙ্গে বদলেছে আড্ডা দেওয়ার ধরনধারণ। বছর বিশেক আগেও আড্ডা দেওয়ার সেরা ঠাঁই মনে করা হত আভিজাত্যের মোড়কে মোড়া ক্লাবগুলিকে। সেই সব জায়গায় সান্ধ্য আড্ডার সাজগোজের মধ্যে থাকত এক ধরনের ‘কর্পোরেট’ আভিজাত্য বা উচ্চবিত্ত বাঙালিয়ানা। পুরুষদের পরিপাটি বুশ শার্ট বা পোলো টি-শার্ট আর মহিলাদের হালকা সিল্ক বা লিনেন শাড়ি। সে সাজে আড্ডার চেয়েও বেশি থাকত নিজের সামাজিক অবস্থান জানান দেওয়ার চেষ্টা।
এখন যদিও সেই আড্ডার ঠিকানা বদলেছে। ড্রয়িংরুম বা ক্লাবের চৌকাঠ পেরিয়ে বাঙালি এখন পুরোদস্তুর ক্যাফেমুখী। আশ্চর্যের বিষয় হল, এই নব্য ক্যাফে সংস্কৃতিতে বাঙালির সাজগোজ আবার তার সেই পুরনো শৌখিনতাকে নতুন মোড়কে ফিরে পেয়েছে। এখনকার আড্ডার সাজের ব্যাকরণ হল— ‘এফর্টলেসলি স্টাইলিশ’। যেমনটা একেবারে শুরুর দিকে ছিল। পোশাক সাহেবি না বাঙালি, সেটা গুরুত্বপূর্ণ নয়। পোশাককে কী ভাবে বহন করছ, পোশাকের মধ্যে দিয়ে কী বলতে চাইছ, সেটাই আসল। মজার ব্যাপার হল, সেই ট্রেন্ডে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করছেন ১৮ থেকে ৬৮— সকলেই। ওভারসাইজ়ড’ শার্ট, লিনেন কো-অর্ড সেট, বোহো-চিক কুর্তা, কিউলটস-এ নিজেকে হারিয়ে ফেলছেন না ৫৮-র মানুষটি। বরং নতুন আড্ডার নতুন ধারার পোশাকে নিজেকে আবিষ্কার করছেন নতুন করে।
আসলে আড্ডা মানে তো আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজেকে চিনে তার পর বাইরের পৃথিবীর চোখে আবার নিজেকে যাচাই করে দেখে নেওয়া। সেখানে নিজেকে একটু সাজিয়ে-গুছিয়ে পেশ করার ইচ্ছে তো থাকবেই। তাই প্রয়োজন মতো সেই সাজ বদলে ফেলতেও দ্বিধা না থাকারই কথা।
এই খবরটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
5,148
1,999
429
169
- একটা সময় পয়লা বৈশাখ মানেই ছিল দিনের শুরুতে নতুন জামা পরে পরিবারের বড়দের প্রণাম করা, দুপুরে বাড়িতে ঘরোয়া ভাবেই খাওয়াদাওয়ার বিশেষ আয়োজন আর সন্ধ্যাবেলা বাড়িতে ভাই-বোন, আত্মীয়স্বজনের জমায়েত।
- এখন বাঙালির কাছে পয়লা বৈশাখ মানে সারাদিনের কাজকর্ম সেরে কোনও এক বাঙালি রেস্তরাঁয় খেতে যাওয়া। বড়দের প্রণাম করাটাও এখন ফোনে ফোনেই সেরে ফেলা হয়। অনেকের তো সেইটুকুও সময় হয় না!
- বৈশাখী সাজে সেরা হতে চান? শাড়ির সঙ্গে কী ভাবে বাঁধবেন চুল, না কি পুরো চুলটাই খোলা রাখবেন? কেশসজ্জার সহজ কৌশল জেনে নিন।
-
১১:১৫
শাড়িই তাঁর চিরসঙ্গী, তবে নববর্ষে সাজে নতুন স্বাদও খুঁজে আনলেন পাওলি দাম -
১০:৫৭
পুণ্যাহের সঙ্গে পুণ্য, বাংলার নতুন বছরের প্রথম দিনে বেড়িয়ে আসতে পারেন তিন ধর্মস্থান থেকে -
১০:০৪
ব্যাচেলরের পয়লা বোশেখ! কী ভাবে দিনটি কাটাচ্ছে ফেলুদা, জটায়ু আর ব্যোমকেশ-সঙ্গী অজিত? -
০৯:৩০
বসুশ্রীতে উত্তমকুমার গাইছেন, রাস্তার ভিড়ে দাঁড়িয়ে ট্রাম! পয়লা বৈশাখের স্মৃতিকথায় তারকারা -
০৮:৫৯
হালখাতার হাল কী? ডিজিটাল হিসাব আর ইএমআইয়ের ফাঁদে কি হারাল শৈশবের নিমকি-শরবতের স্বাদ?